বৈশ্বিক দুর্নীতি সূচকে ইতিহাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে গেছে যুক্তরাষ্ট্র
স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরকারি খাতে দুর্নীতির ধারণা পরিমাপকারী একটি শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক সূচকে যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে নেমে এসেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে (করাপশন পারসেপশনস ইনডেক্স—সিপিআই) বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর গণতান্ত্রিক এই দেশটি গত বছর এক ধাপ পিছিয়ে ১৮২টি দেশের মধ্যে ২৯তম স্থানে নেমে আসে। ২০১২ সালে নতুন পদ্ধতিতে এই সূচকটি পুনরায় চালু হওয়ার পর থেকে এটিই দেশটির সর্বনিম্ন অবস্থান। উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে প্রথম এই সূচকটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
নতুন এই অবস্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাহামাসের সঙ্গে যৌথ অবস্থানে রয়েছে এবং লিথুয়ানিয়া (২৮), বার্বাডোজ (২৪) ও উরুগুয়ের (১৭) মতো দেশগুলোর কাছে পরাজিত হয়েছে (অর্থাৎ এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও কম দুর্নীতিগ্রস্ত)।
গত এক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের র্যাঙ্কিং ধারাবাহিকভাবে নিচের দিকে নামছে। গত বছর এটি আরও একটি বড় ধাক্কা খায়, যখন ট্রাম্প প্রশাসন কর্পোরেটদের বিদেশি ঘুষ প্রদানের তদন্ত স্থগিত করে এবং বিদেশি এজেন্ট নিবন্ধন আইনের প্রয়োগ সীমিত করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারি খাতের দুর্নীতি দমনে ফেডারেল সরকারের সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।
হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেছেন এবং যাদের তিনি নিজের শত্রু বলে মনে করেন, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সরকারি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করেছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে (সিপিআই) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক স্কোরও ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকে দেশটির ক্রমাগত নিম্নমুখী অবস্থানকে আরও দীর্ঘায়িত করেছে। ১০০-এর স্কেলে (যেখানে ১০০ মানে অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং ০ মানে অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত) যুক্তরাষ্ট্রের স্কোর এবার দাঁড়িয়েছে ৬৪-তে।
মঙ্গলবার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইরা মার্তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি নিয়ে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। এই নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।'
এক বিবৃতিতে দুর্নীতিবিরোধী কাজ করা অলাভজনক জোট ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে আরও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, 'যদিও ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এখনো পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি, তবুও স্বাধীন মতপ্রকাশকে লক্ষ্য করে নেওয়া পদক্ষেপ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার মতো পদক্ষেপগুলো গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।'
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'সিপিআইয়ের ফলাফলের বাইরেও ফরেন করাপ্ট প্র্যাকটিসেস অ্যাক্টের প্রয়োগ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা এবং এর বাস্তবায়ন দুর্বল করার সিদ্ধান্তগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়িক চর্চার প্রতি সহনশীলতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে বিদেশে নাগরিক সমাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার ফলে বৈশ্বিক দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়েছে।'
গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে দুর্নীতির বিস্তার
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে দুর্নীতির অবনতির প্রতিফলন দেখা গেছে অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশেও। কানাডা ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে পারফরম্যান্সে 'উদ্বেগজনক পতন' লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দশকজুড়ে চলা অবনতির পর যুক্তরাজ্যও ইতিহাসের সর্বনিম্ন দুর্নীতি ধারণা সূচক স্কোর অর্জন করেছে—৭০। তবে স্কোর কমে গেলেও সূচকে দেশটির অবস্থান ২০তম স্থানেই অপরিবর্তিত রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের যুক্তরাজ্য শাখার প্রধান নির্বাহী ড্যানিয়েল ব্রুস এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করা একটি ভিডিওতে বলেন, 'আমাদের রাজনীতিতে দুর্নীতির মূল কারণগুলো আমরা মোকাবিলা করছি না।'
তিনি যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলোর 'মেগা ডোনার' এবং 'বিতর্কিত সরকারি নিয়োগ'-এর দিকে ইঙ্গিত করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি সাবেক সরকারি মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনকে ঘিরে চলমান একটি ফৌজদারি তদন্তের কথা উল্লেখ করেন।
বর্তমান ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের অধীনে পিটার ম্যান্ডেলসন স্বল্প সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বর্তমানে তিনি পুলিশের একটি তদন্তের আওতায় রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রয়াত অর্থলগ্নিকারক ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের কাছে বাজারের সংবেদনশীল তথ্য সরবরাহ করেছিলেন। এই কেলেঙ্কারি প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারকে সংকটে ফেলে দিয়েছে।
ড্যানিয়েল ব্রুস যুক্তরাজ্যের সরকারকে রাজনীতি থেকে 'বড় অর্থের কলুষিত প্রভাব' দূর করতে আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
দুর্নীতি ধারণা সূচকে বৈশ্বিক গড় স্কোরও বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিয়েছে। এই গড় স্কোর নেমে এসেছে ৪২-এ, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন এবং এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো এই সূচকে গড় স্কোর কমেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, 'বিশ্বের অধিকাংশ দেশই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।'
৮৯ স্কোর নিয়ে টানা অষ্টম বছরের মতো সূচকের শীর্ষে রয়েছে ডেনমার্ক। ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের সরকারি খাতকে যথাক্রমে বিশ্বের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সবচেয়ে স্বচ্ছ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
যেহেতু এই সূচকটি মূলত সরকারি খাতে দুর্নীতির ওপর আলোকপাত করে, তাই উচ্চ স্কোর মানেই যে সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি কম—তা অবশ্যই নয়।
উদাহরণ হিসেবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, সূচকে উচ্চ অবস্থানে থাকা সুইজারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের বেসরকারি খাত 'কালো অর্থের লেনদেন সহজ করার ক্ষেত্রে' নজরদারির মুখে পড়েছে।
