এপস্টিনের অতীত সম্পর্কে না জানা আমাদের ‘মারাত্মক ভুল’ ছিল, ‘ক্ষমা’ চাচ্ছি: চমস্কির স্ত্রী
প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কির স্ত্রী ভ্যালেরিয়া চমস্কি জানিয়েছেন, তিনি এবং তার স্বামী চমস্কি কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের অতীত সম্পর্কে পুরোপুরি খোঁজখবর না নিয়ে 'মারাত্মক ভুল' করেছিলেন এবং এ ক্ষেত্রে তারা 'অসাবধান' ছিলেন।
শনিবার প্রকাশিত এক দীর্ঘ বিবৃতিতে ভ্যালেরিয়া বলেন, এপস্টিন তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছিলেন।
মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) নতুন করে কিছু নথি প্রকাশের পর ৯৭ বছর বয়সী নোয়াম চমস্কির সঙ্গে এপস্টিনের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় আসে। এসব নথিতে দেখা যায়, ২০১৯ সালে যৌন পাচারের অভিযোগে তদন্তের মুখে পড়ার সময় এপস্টিন কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবেন, সে বিষয়ে চমস্কির কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন।
এপস্টিন তার এক সহযোগীকে পাঠানো ইমেইলে চমস্কির স্বাক্ষরিত একটি বার্তা শেয়ার করেছিলেন। সেখানে লেখা ছিল, 'আমি দেখেছি গণমাধ্যমে এবং জনসমক্ষে আপনার সঙ্গে কী ভয়াবহ আচরণ করা হচ্ছে। বলতে খুব খারাপ লাগছে, তবে আমার মনে হয় এর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো একে উপেক্ষা করা।'
বার্তায় নোয়াম চমস্কি আরও লেখেন, 'শকুনেরা যা চায় তা হলো আপনার প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া, যা বিষাক্ত আক্রমণের সুযোগ করে দেয়। এর বেশিরভাগই আসে প্রচারপিপাসু বা একরোখা মানুষদের কাছ থেকে।' তিনি যোগ করেন, 'নারীদের নির্যাতন নিয়ে যে হিস্টিরিয়া তৈরি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এটি এখন আরও সত্য। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কোনো অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যেন খুনের চেয়েও বড় অপরাধ।'
২০০৮ সালে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও এপস্টিনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রাখা বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে নোয়াম চমস্কিও ছিলেন। এ কারণে এই বিতর্কিত অর্থলগ্নিদাতার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৮ সালে মিয়ামি হেরাল্ডে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এপস্টিনের বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নির্যাতন এবং ২০০৮ সালে তার অস্বাভাবিকভাবে লঘু সাজা পাওয়ার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। ভ্যালেরিয়া চমস্কি জানান, তারা ওই প্রতিবেদনটি পড়েছিলেন। তবে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে এপস্টিনের দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত তার অপরাধের মাত্রা সম্পর্কে তারা অবগত ছিলেন না।
ভ্যালেরিয়া বলেন, 'তার অতীত সম্পর্কে পুরোপুরি খোঁজখবর না নেওয়াটা আমাদের অসাবধানতা ছিল। এটি একটি মারাত্মক ভুল ছিল এবং সেই বিচারিক ব্যর্থতার জন্য আমি আমাদের দুজনের হয়ে ক্ষমা চাইছি।' তিনি জানান, স্ট্রোকের আগে নোয়াম চমস্কিও তাকে জানিয়েছিলেন যে তিনি একইভাবে বিষয়টি দেখছেন। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে চমস্কি মারাত্মক স্ট্রোকে আক্রান্ত হন।
তিনি আরও বলেন, 'যাকে আমরা উপকারী বন্ধু ভেবেছিলাম, তিনি গোপনে এমন অপরাধমূলক, অমানবিক ও বিকৃত জীবনযাপন করতেন—এটা বুঝতে পারা আমাদের দুজনের জন্যই অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল।'
ভ্যালেরিয়া চমস্কি নোয়াম চমস্কির দ্বিতীয় স্ত্রী। তাদের বিয়ে হয় ২০১৪ সালে। তিনি বলেন, ২০১৯ সালে এপস্টিনের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার নিয়ে চমস্কির পরামর্শকে 'প্রেক্ষাপট' বিবেচনায় দেখতে হবে।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'এপস্টিন নোয়ামকে বলেছিলেন যে তাকে অন্যায়ভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। নোয়াম গণমাধ্যমের সঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্কে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলেছিলেন।' তার ভাষ্য অনুযায়ী, এপস্টিন নিজের মামলা সম্পর্কে একটি বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করেছিলেন, যা চমস্কি সরল বিশ্বাসে মেনে নিয়েছিলেন।
ভ্যালেরিয়া বলেন, 'এখন এটা পরিষ্কার যে এসবই সাজানো ছিল। অন্তত এপস্টিনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নোয়ামের মতো কাউকে ব্যবহার করে তার সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজের সুনাম মেরামত করা।' তিনি আরও বলেন, 'নোয়ামের সমালোচনা কখনোই নারী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিল না; বরং তিনি সর্বদা লিঙ্গ সমতা ও নারী অধিকারকে সমর্থন করেছেন।'
তার মতে, এপস্টিন 'ক্যানসেল কালচার'-এর বিরুদ্ধে চমস্কির প্রকাশ্য অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে এর শিকার হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
গত বছর হাউস ওভারসাইট কমিটির প্রকাশিত আরেকটি বার্তায় দেখা যায়, চমস্কি বলেছিলেন যে এপস্টিনের সঙ্গে 'নিয়মিত যোগাযোগ' রাখা ছিল তার জন্য 'সবচেয়ে মূল্যবান অভিজ্ঞতা'। বার্তাটি আদতে কাউকে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। বিচার বিভাগের প্রকাশিত অন্যান্য নথিতে দেখা যায়, এপস্টিন চমস্কির সঙ্গে পুরুষাঙ্গসংক্রান্ত কৌতুক শেয়ার করছেন এবং চমস্কি 'ক্যারিবিয়ান দ্বীপ সম্পর্কে কল্পনা' করছেন।
ভ্যালেরিয়া চমস্কি জানান, তারা নিউইয়র্ক সিটিতে এপস্টিনের টাউনহাউসে এবং নিউ মেক্সিকোতে তার খামারবাড়িতে নৈশভোজে অংশ নিয়েছিলেন। পাশাপাশি নিউইয়র্ক ও প্যারিসে এপস্টিনের অ্যাপার্টমেন্টে থেকেছেন এবং তার সঙ্গে একাধিক একাডেমিক সমাবেশেও যোগ দেন। তবে তিনি বলেন, তারা 'কখনো তার দ্বীপে যাননি বা সেখানে কী ঘটত সে সম্পর্কে কিছুই জানতেন না'।
ভ্যালেরিয়া জানান, ২০১৫ সালে নোয়াম চমস্কির সঙ্গে এপস্টিনের পরিচয় হয়। ২০০৮ সালে প্রথবারম এপস্টিন যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন, সে তথ্য তারা জানতেন না। তিনি বলেন, এপস্টিন নিজেকে বিজ্ঞানে আগ্রহী একজন সমাজসেবী হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।
ভ্যালেরিয়ার ভাষ্য, 'নিজেকে এভাবে উপস্থাপন করে এপস্টিন নোয়ামের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়। অজান্তেই আমরা একটি ছদ্মবেশী শত্রুর জন্য দরজা খুলে দিয়েছিলাম।' তিনি বলেন, 'এপস্টিন উপহার পাঠিয়ে এবং নোয়াম যেসব বিষয়ে কাজ করছিলেন সেসব নিয়ে আলোচনা করে তাকে ঘিরে ফেলতে শুরু করেন। আমরা দুঃখিত যে, বুঝতে পারিনি এটি ছিল আমাদের ফাঁদে ফেলার এবং নোয়াম যেসব আদর্শের পক্ষে কাজ করেন তা ক্ষুণ্ণ করার একটি কৌশল।'
চমস্কি ও এপস্টিনের মধ্যে দুটি আর্থিক লেনদেনের ব্যাখ্যাও দেন ভ্যালেরিয়া চমস্কি। তার মতে, একবার চমস্কির তৈরি করা একটি ভাষাতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জের অংশ হিসেবে এপস্টিন নোয়াম চমস্কিকে ২০ হাজার ডলারের একটি চেক পাঠিয়েছিলেন। পাশাপাশি নোয়াম চমস্কির অবসরকালীন তহবিলে অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর ২ লাখ ৭০ হাজার ডলার পুনরুদ্ধার করতেও তিনি সহায়তা করেন। ভ্যালেরিয়া বলেন, এই পরিস্থিতি চমস্কির আর্থিক স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলেছিল এবং তাকে চরম দুশ্চিন্তায় ফেলে।
ভ্যালেরিয়ার দাবি, এপস্টিনের এই সহায়তা ছিল 'সম্ভবত নোয়ামের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার বা তার কাছে পৌঁছানোর ষড়যন্ত্রের অংশ'। তিনি বলেন, এপস্টিন কেবল এই নির্দিষ্ট বিষয়ে আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছিলেন। তার জানামতে, তাদের ব্যাংক বা বিনিয়োগ অ্যাকাউন্টে এপস্টিনের কখনোই কোনো প্রবেশাধিকার ছিল না।
তিনি আরও জানান, ব্যক্তিগতভাবে বা দম্পতি হিসেবে এপস্টিনের অফিসের মাধ্যমে তাদের কোনো বিনিয়োগ ছিল না।
