টেলিগ্রাম যখন সাইবার অপরাধী আর গুজব রটনাকারীদের প্রিয় প্ল্যাটফর্ম
গত বুধবার রাতে স্পেনের প্রায় ৮০ লাখ টেলিগ্রাম ব্যবহারকারী অ্যাপটির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও পাভেল দুরভের কাছ থেকে একটি বার্তা পায়। রুশ এই ধনকুবের স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের ঘোষণা করা নতুন 'বিপজ্জনক নিয়মাবলী'র কথা উল্লেখ করেন।
ওই নিয়মে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কড়াকড়ি এবং প্ল্যাটফর্মের নিয়মভঙ্গে কর্মকর্তাদের আইনি দায়বদ্ধতার কথা বলা হয়েছে।
দুরভ লিখেছেন, 'এই পদক্ষেপগুলো সুরক্ষার নামে স্পেনকে একটি নজরদারি রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।' তবে তিনি যা উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন তা হলো, টেলিগ্রাম সব ধরনের নজরদারির বাইরে। আর এই সুযোগেই অ্যাপটি স্পেনে এবং অন্যান্য দেশে গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়াতে সাহায্য করছে। বছরের পর বছর ধরে এটি সাইবার অপরাধীদের যোগাযোগের পছন্দের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুরভের প্রতিষ্ঠিত অ্যাপটির সুনাম নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ আছে। কর্তৃপক্ষ জানে যে টেলিগ্রাম অপরাধীদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এসব বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট প্যারিসে ব্যক্তিগত জেট থেকে নামামাত্রই দুরভকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছে রাশিয়া, ফ্রান্স ও আরব আমিরাতের পাসপোর্ট রয়েছে।
তার বিরুদ্ধে নিজের পরিচালিত মেসেজিং নেটওয়ার্কে শিশু পর্নোগ্রাফি ছড়াতে সহায়তাসহ নানা অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগে তার১০ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। ফরাসি কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলা সত্ত্বেও এই ব্যবসায়ী গত বছরের মার্চে দুবাই ফিরে যান, যেখানে তিনি ২০১৪ সালে নির্বাসিত হয়েছিলেন।
দুরভ নিজেকে 'স্বাধীনতার চ্যাম্পিয়ন' হিসেবে তুলে ধরেন। ২০০৬ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি ফেসবুকের রাশিয়ান সংস্করণ 'ভিকে' প্রতিষ্ঠা করেন। ৩০ বছর বয়সে তিনি ভ্লাদিমির পুতিনের নিরাপত্তা বাহিনীর চাপে শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হন। এরপর তিনি টেলিগ্রাম চালু করেন। কোম্পানির তথ্যমতে, বর্তমানে এর মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী প্রায় ১০০ কোটি।
প্যারিসে গ্রেপ্তারের কয়েক দিন আগে নিজের প্ল্যাটফর্মে তিনি বলেছিলেন, '১৯৯৫ সালে ১১ বছর বয়সে আমি নিজেকে কথা দিয়েছিলাম যে প্রতিদিন আরও স্মার্ট, শক্তিশালী ও মুক্ত হব। আজ টেলিগ্রামের ১১ বছর পূর্ণ হলো এবং এটি সেই একই প্রতিশ্রুতি দিতে প্রস্তুত।'
সাইবার অপরাধের আঁতুড়ঘর
দুরভের এসব ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবের মিল খুব কম। প্ল্যাটফর্মে কী ঘটছে তার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এটি সাইবার অপরাধের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে স্পেনের সিভিল গার্ড একটি ব্যাংকিং ফিশিং চক্রকে ধরে ফেলে। প্রতারণার মাধ্যমে তথ্য চুরি করা এই চক্রটি যোগাযোগের জন্য টেলিগ্রাম ব্যবহার করত। তাদের চ্যানেলের নামগুলো ছিল চমকে ওঠার মতো যেমন—'দাদিদের সব চুরি করা'।
টেলিগ্রামে প্রচুর শিশু পর্নোগ্রাফিও ছড়ায়। দুই বছর আগেও এসব অপরাধের কোনো বিচার হতো না। তবে দুরভের গ্রেপ্তারের পর কোম্পানিটি হঠাৎ পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। স্প্যানিশ পুলিশকেও তারা সহায়তা করেছে, যার ফলে কিছু পেডোফাইল বা শিশু নির্যাতনকারী চক্র ধরা পড়েছে।
অপরাধ কমছে, নাকি কৌশল বদলাচ্ছে?
টেলিগ্রামে আরও অনেক কিছুই ঘটে। অ্যাপটির বিশেষ কিছু সুবিধার কারণে এটি গোপন কাজ চালানোর জন্য আদর্শ। টেলিগ্রামের স্বয়ংক্রিয় 'বট' ব্যবহার করে সাইবার অপরাধীরা তাদের ক্লায়েন্টদের প্রশ্নের উত্তর দেয়। পাসওয়ার্ড বিক্রি, র্যানসমওয়্যার হামলা বা ডিভাইস হ্যাক করার মতো সেবাগুলো তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদান করে।
এখানে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ক্রিপ্টোকারেন্সি পেমেন্ট এবং অবৈধ পণ্য কেনাবেচা করা যায়। চুরি করা ব্যাংক কার্ড, তথ্য চুরির ম্যালওয়্যার, ফিশিং কিট বা ডিডস হামলার সরঞ্জাম—সবই মেলে এখানে। এ ছাড়া এর আনলিমিটেড স্টোরেজ সুবিধা কাজে লাগিয়ে ফাঁস হওয়া ডেটাবেজ বা চুরি করা করপোরেট নথি শেয়ার করা সহজ।
তবে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কির এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অপরাধীরা এখন টেলিগ্রাম ছাড়তে শুরু করেছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্লক করা ৮০০টি অপরাধী চ্যানেল বিশ্লেষণ করে বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন। প্ল্যাটফর্মটি তাদের নীতি কঠোর করায় চ্যানেলগুলো এখন দ্রুত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ক্যাসপারস্কির বিশ্লেষক ভ্লাদিস্লাভ বেলোসভ বলেন, 'প্রতারকদের জন্য টেলিগ্রাম এখনো কাজের জায়গা, তবে ঝুঁকি বাড়ছে। চ্যানেলগুলো ব্লক হওয়ার হার বেড়েছে। যখন কোনো দোকান বা পরিষেবা রাতারাতি উধাও হয়ে যায়, তখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা ইতিমধ্যে অপরাধীদের অন্য প্ল্যাটফর্মে সরে যাওয়ার লক্ষণ দেখছি।'
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হ্যাকটিভিস্টরা অভিযোগ দায়ের করে বিপজ্জনক চ্যানেলগুলো ব্লক করতে ভূমিকা রাখছে।
টেলিগ্রামে সাইবার অপরাধীদের জন্য অন্য সমস্যাও আছে। হোয়াটসঅ্যাপ বা সিগন্যালের মতো এখানে 'এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন' বা গোপনীয়তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু থাকে না। ফলে বার্তা শুধু প্রেরক ও প্রাপকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এ ছাড়া টেলিগ্রামের সার্ভার কোড গোপন থাকায় অপরাধীরা তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিজস্ব সার্ভার থেকে পরিচালনা করতে পারে না।
এসব কারণে 'বিএফরেপো' বা 'অ্যাঞ্জেল ড্রেইনার'-এর মতো বড় সাইবার অপরাধী গোষ্ঠীগুলো তাদের কার্যক্রম অন্য প্ল্যাটফর্মে বা নিজস্ব তৈরি মেসেজিং অ্যাপে সরিয়ে নিচ্ছে।
গুজব আর মিথ্যা তথ্যের ভাণ্ডার
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টেলিগ্রাম গুজব রটনাকারী এবং উসকানিদাতাদের পছন্দের চ্যানেল হয়ে উঠেছে। এখানে কনটেন্ট মডারেশনের বা তদারকির ব্যবস্থা খুবই শিথিল, প্রায় সবকিছুই শেয়ার করা যায়। এর সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুবিধার কারণে এটি যাচাইহীন তথ্য ছড়ানোর আদর্শ মাধ্যম। শিশু পর্নোগ্রাফি বা ম্যালওয়্যারের মতো এসব অপরাধের আইনি বিচার করাও বেশ কঠিন।
দুই সপ্তাহ আগে দক্ষিণ স্পেনের আদামুজে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পর টেলিগ্রামে নানা উদ্ভট সব গুজবে ভরে গিয়েছিল। গত গ্রীষ্মে স্পেনের মুরসিয়া অঞ্চলের টোরে পাচেকোতে অভিবাসীদের ওপর হামলা বা 'শিকার' করার জন্য টেলিগ্রাম ব্যবহার করা হয়েছিল। কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ডাকে সাড়া দিয়ে ডজনখানেক তরুণ ফোনে উসকানিমূলক বার্তা নিয়ে ওই শহরে জড়ো হয়েছিল। তাদের বার্তায় ছিল 'স্পেনকে পরিষ্কার করার' আহ্বান।
