‘খামেনি কি রাশিয়ায় পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন?' ইরানে বিক্ষোভ ঘিরে অনলাইনে ভাইরাল হওয়া যত গুজব
গুজব সব সময়ই জনমনে অস্থিরতা তৈরির অন্যতম প্রধান উৎস। অনেক সময় আসল খবর আর জল্পনা-কল্পনার মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে যেকোনো মিথ্যা তথ্য বা বয়ান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ইরানে চলমান বিক্ষোভ ঘিরেও এমন অনেক গুজব ভাইরাল হয়েছে।
এসব গুজবের অধিকাংশেরই উৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন বেনামি বা নামহীন অ্যাকাউন্ট। এমনকি মূলধারার অনেক সংবাদমাধ্যমও শুধু চটকদার শিরোনামের আশায় এসব তথ্য প্রচার করছে।
এসব গুজবের কোনো কোনোটিতে হয়তো আংশিক সত্যতা থাকে। তবে ঢালাওভাবে সব তথ্য বিশ্বাস করা ঠিক নয়। যেকোনো খবর বিশ্বাস করার আগে এর বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই-বাছাই করা জরুরি।
গত কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের বিক্ষোভ নিয়ে এমন কিছু গুজব ছড়িয়েছে, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে বা ভুল বার্তা দিয়েছে। এমন কয়েকটি আলোচিত গুজব ও এর পেছনের সত্যতা নিচে তুলে ধরা হলো :
ইরান থেকে রাশিয়ায় কি সোনা পাচার হচ্ছে?
গত ৭ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু বেনামি আইডি থেকে একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, ইরান থেকে রাশিয়ায় সোনার বার সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যদিও এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ বা বিস্তারিত তথ্য কেউ দিতে পারেনি।
ওই সব পোস্টে দাবি করা হয়, ইরানি কর্মকর্তারা দেশ ছেড়ে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ১৯৭৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা সরকার যদি বিক্ষোভের মুখে পড়ে যায়, তবে কর্মকর্তারা যেন মস্কোতে গিয়ে বিলাসী জীবন কাটাতে পারেন, সে জন্যই নাকি আগেভাগে এই সোনা সরানোর তোড়জোড়।
যুক্তরাজ্যের আইনপ্রণেতা ও সাবেক নিরাপত্তা মন্ত্রী টম টুগেনধাতও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এ প্রসঙ্গটি তুলেছেন। তার মতে, ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখন 'লড়াই অথবা পালানোর' প্রস্তুতি নিচ্ছে। তেহরানে একটি রুশ উড়োজাহাজের উপস্থিতির বিষয়ে তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেত কুপারের কাছে ব্যাখ্যাও চেয়েছেন।
টুগেনধাতের দাবি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বা সম্পদ সরানোর অংশ হিসেবেই হয়তো রুশ উড়োজাহাজটি সেখানে গেছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের সম্পদ বিভিন্ন গন্তব্যে সরিয়ে নেওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা আদতে ইরানি শাসকদের ক্ষমতা হারানোর ইঙ্গিত দেয়।
তবে এসব আলোচনার ডালপালা মেললেও আদতে ইরান থেকে রাশিয়ায় সোনার বার সরানোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নিরপেক্ষ কোনো সূত্রও এখন পর্যন্ত এমন তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
মূলত অতীতে বিভিন্ন দেশের একনায়কদের দেশ ছেড়ে পালানোর ঘটনার সঙ্গে মিল রেখেই এসব গুজব ছড়ানো হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের কথা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) নেতৃত্বে হঠাৎ বিদ্রোহের মুখে সরকার পতনের পর আসাদ যখন সিরিয়া ছেড়ে পালান, তখন তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সোনা রাশিয়ায় সরিয়ে নিয়েছিলেন বলে খবর বেরিয়েছিল।
তা ছাড়া ইরানের ইতিহাসের দিকে তাকালেও এমন নজির মেলে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের সময় ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি যখন দেশ ছাড়েন (২৬ ডিসেম্বর), তখন তিনিও বিপুল নগদ অর্থ ও সোনা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
'পরিবার নিয়ে লেবাননে পালিয়েছেন আরাগচি'
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আঞ্চলিক সফরের অংশ হিসেবে সম্প্রতি লেবাননে গিয়েছিলেন। সাধারণত তিনি একা সফর করলেও এবার তার সঙ্গে স্ত্রী ও ছোট সন্তান ছিল বলে খবর ছড়ায়। আর এতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রটে যায়, ইরানের এই শীর্ষ কূটনীতিক দেশ ছেড়ে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে যদি বর্তমান সরকারের পতন হয়, তবে লেবানন আরাগচির জন্য নিরাপদ গন্তব্য হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তেহরান ও বৈরুতের বর্তমান সম্পর্ক এবং সেখানে তাকে দেওয়া অভ্যর্থনা—সব মিলিয়ে লেবাননে থিতু হওয়া তার জন্য খুব একটা সুবিধাজনক হওয়ার কথা নয়।
সব জল্পনায় পানি ঢেলে সফর শেষে দেশে ফিরেছেন আরাগচি। শুধু তা-ই নয়, গত শনিবার তেহরানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তিনি ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়িদ বদর হামাদ আল বুসাইদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করেছেন।
খামেনির 'রাশিয়ায় পলায়ন'
সাম্প্রতিক সময়ে যে খবরটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দেশত্যাগের গুঞ্জন।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'দ্য টাইমস'–এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দেশের ভেতর বিক্ষোভ তীব্র হলে ধরা পড়ার ভয়ে খামেনি রাশিয়ায় পালিয়ে যেতে পারেন। সেনাবাহিনী, রেভল্যুশনারি গার্ড বা নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতর বিদ্রোহের আঁচ পেলেই ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে তিনি দেশ ছাড়বেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দ্য টাইমস নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম হলেও তাদের এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ মেলেনি। বরং গত শুক্রবার সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে খামেনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বিক্ষোভের মুখে তিনি 'পিছু হটবেন না'। সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্র হলেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দেশ ছেড়ে পালানোর সম্ভাবনা খুব কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি বেনামি অ্যাকাউন্ট থেকে খামেনির ছবিসহ একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, বিমানবন্দরে পালানোর সময় তিনি আহত হয়েছেন। খবরটি অনেকে লুফে নিলেও এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রই এমন ঘটনার কথা নিশ্চিত করেনি।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণবিক্ষোভের মুখে ইউক্রেন ও সিরিয়ার নেতাদের দেশ ছেড়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে আশ্রয় নেওয়ার নজির রয়েছে। মূলত সেই প্রেক্ষাপট থেকেই খামেনিকে নিয়ে এমন গুঞ্জন রটেছে।
গালিবাফের পরিবারের ফ্রান্সের ভিসা খোঁজা
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের পরিবার ফ্রান্সের ভিসা পাওয়ার চেষ্টা করছে—এমনই এক দাবি করেছেন ইরানি-ফরাসি সাংবাদিক এমানুয়েল রাস্তেগার। ফ্রান্সের 'চ্যানেল ১'-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্যারিসে এক আইনজীবীর মাধ্যমে গালিবাফের পরিবারের সদস্যরা ভিসার আবেদন করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন।
তবে নিজের দাবির পক্ষে বিস্তারিত কোনো তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেননি ওই সাংবাদিক। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনি ফ্রান্সে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে রাস্তেগার ইঙ্গিত দেন, হয়তো সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হিসেবেই ফ্রান্সকে বেছে নেওয়া হচ্ছে।
অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে ফ্রান্স ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য নিরাপদ গন্তব্য হওয়ার কথা নয়। গত দুই দশকে তেহরানের সঙ্গে প্যারিসের সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। তাই ইরানে সরকার পতন হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই দেশটি যে তাদের আশ্রয় দেবে, তার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানি কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে কানাডা। অনেকেই সেখানে স্থায়ী বসবাসের অনুমতিও পেয়েছেন।
গালিবাফের পরিবার আসলেই ফ্রান্সের ভিসা চেয়েছে কি না, সে বিষয়ে ফরাসি কর্তৃপক্ষ বা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র এখনো কিছু নিশ্চিত করেনি। এদিকে খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পরদিন ইরানের পার্লামেন্টের মিডিয়া সেন্টার একে 'সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভুয়া' বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, 'বিদেশি শত্রুরা' জনগণের দাবিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পার্লামেন্ট অস্বীকার করলেই যে খবরটি মিথ্যা হয়ে যায়, বিষয়টি তা নয়। এ বিষয়ে সত্যতা জানতে আরও তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন।
গুজব ছড়িয়ে হয়তো সাময়িকভাবে মানুষকে রাজপথে নামানো যায়, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তা আন্দোলনের ক্ষতিই করে। গত কয়েক দশকের আন্দোলন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গুজব শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষেই যায় এবং আন্দোলনকারীদের বিপাকে ফেলে।
২০০৯ সালের বিক্ষোভের কথাই ধরা যাক। সে সময় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অনেক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিলেন—এটা সত্য। কিন্তু কিছু দুরভিসন্ধিমূলক ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির মৃত্যুর অতিরঞ্জিত ও ভুয়া খবর ছড়িয়ে দেন। যাচাই-বাছাই না করেই নামী অনেক সংবাদমাধ্যম সেই খবর প্রকাশ করে ফেলে।
খবরটি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক তখনই ইরান সরকার প্রমাণসহ দেখিয়ে দেয় যে ওই নির্দিষ্ট মৃত্যুর খবরটি মিথ্যা। এতে মূল ধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধাক্কা খায়।
অনেকের ধারণা, এটি হয়তো সরকারেরই সাজানো কোনো ছক ছিল। তারা ইচ্ছে করেই ভুয়া খবর ছড়িয়ে দেয়, যাতে পরে তা মিথ্যা প্রমাণ করে সংবাদমাধ্যম ও আন্দোলনকারীদের জনসমক্ষে হেয় করা যায়।
বি:দ্র: ইউরোনিউজ এই প্রতিবেদনে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রতিক কিছু গুজবের চিত্র তুলে ধরেছে। এর কোনোটির সত্যতা ইউরোনিউজ নিশ্চিত করছে না।
