যুদ্ধ বন্ধে কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হলো রাশিয়া-ইউক্রেন বৈঠক
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দিনের আলোচনা শেষ করেছে ইউক্রেন ও রাশিয়া। তবে এসব আলোচনায় রাশিয়ার যুদ্ধের অবসান ঘটানোর বিষয়ে কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি।
তবে উভয় পক্ষ যুদ্ধবন্দি বিনিময়ে সম্মত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ইউক্রেন ও রাশিয়া একে অপরের কাছে ১৫৭ জন করে যুদ্ধবন্দি হস্তান্তর করেছে।
বৃহস্পতিবার ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এবং রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পৃথকভাবে এই বন্দি বিনিময়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ—যিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মার্কিন মধ্যস্থতা দলের নেতৃত্ব দেন—বলেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে শান্তি আলোচনায় এখনও 'গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি' রয়েছে।
তবে তিনি বলেন, বন্দি বিনিময়ের ঘটনা প্রমাণ করে যে 'নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক যোগাযোগ বাস্তব ফল দিচ্ছে এবং ইউক্রেনে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিচ্ছে'।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ জোরদারের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ইউরোপীয় কমান্ডের বরাতে জানা গেছে, দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের সামরিক-থেকে-সামরিক সংলাপ পুনরায় শুরু করতে সম্মত হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে এই সংলাপ স্থগিত ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই যোগাযোগ চ্যানেলটি 'স্থায়ী শান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সামরিক-থেকে-সামরিক পর্যায়ে নিয়মিত ও ধারাবাহিক যোগাযোগ নিশ্চিত করবে'।
বৃহস্পতিবারের আলোচনার পর্ব শেষ হওয়ার আগে রাশিয়ার আলোচক কিরিল দিমিত্রিয়েভ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, 'বিষয়গুলো ভালো ও ইতিবাচক পথে এগোচ্ছে।' তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সক্রিয়ভাবে কাজ চলছে, যার মধ্যে অর্থনীতি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র–রাশিয়া যৌথ কর্মী দলের কাঠামোর আওতাও রয়েছে।
তবে তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা করে বলেন, তারা এই প্রক্রিয়ায় 'বিঘ্ন ঘটানো' এবং 'হস্তক্ষেপের' চেষ্টা করছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছেন। তিনি বলেন, প্রক্রিয়াটি 'নিশ্চিতভাবেই সহজ নয়', তবুও ইউক্রেন 'যতটা সম্ভব গঠনমূলক' ভূমিকা পালন করবে।
কিয়েভে সফররত পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি বলেন, 'আমরা আরও দ্রুত ফলাফল চাই।'
এর আগে জানুয়ারির শেষ দিকে তিন পক্ষের প্রথম দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তবে ভূখণ্ড-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে ওই আলোচনায় খুব একটা অগ্রগতি হয়নি বলে মনে করা হচ্ছে। মস্কো দাবি করছে, ডোনেৎস্ক অঞ্চলের যে এক-পঞ্চমাংশ এখনো কিয়েভের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তা ইউক্রেনকে ছেড়ে দিতে হবে। তবে জেলেনস্কির সরকার এই দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ইউক্রেনের প্রধান আলোচক রুস্তেম উমেরভের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ত্রিপক্ষীয় আলোচনা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আবারও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, আলোচনার ওই দফা যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুদ্ধবন্দি বিনিময় চুক্তি
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আরআইএ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে, রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের কাছে ১৫৭ জন করে যুদ্ধবন্দি বিনিময় করেছে। পাশাপাশি কুরস্ক অঞ্চল থেকে তিনজন বেসামরিক নাগরিককেও রাশিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সহকারী কিরিলো বুদানভ জানান, মুক্তি পাওয়া ইউক্রেনীয়দের মধ্যে ১৯ জন ছিলেন, যাদের 'অবৈধভাবে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল'; এর মধ্যে ১৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ইউক্রেনের সংসদের মানবাধিকার কমিশনার দমিত্রো লুবিনেৎস বলেন, মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে সাতজন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক।
এক্সে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির শেয়ার করা ছবিতে দেখা যায়, সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত কয়েকজন বন্দির মাথা ন্যাড়া এবং তারা ইউক্রেনের পতাকায় মোড়ানো।
এই বন্দি বিনিময়টি কয়েক মাসের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে হওয়া প্রথম এমন চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর আগে সর্বশেষ গত ২ অক্টোবর মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে বন্দি বিনিময় হয়েছিল। ওই বছরের শুরুর দিকে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত সরাসরি আলোচনার তিন দফার চুক্তির অংশ হিসেবে তখন এই বিনিময় সম্পন্ন হয়।
বৃহস্পতিবারের এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের চার বছর পূর্তির আগে।
যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির বিরল এক তথ্যে জেলেনস্কি এই সপ্তাহে অনুমান করেছেন যে, ২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় সৈন্য নিহত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আরও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে এবং মূলত এই বিপুল পরিমাণ প্রাণহানির কারণেই উভয় পক্ষ এখন আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়েছে।"
হামলা অব্যাহত
বন্দি বিনিময়ের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার সময়ও সহিংসতা থেমে থাকেনি। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানান, রাতে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় দুইজন বৃদ্ধ নারী আহত হয়েছেন। এ ছাড়া আবাসিক ভবন, একটি অফিস ভবন এবং একটি কিন্ডারগার্টেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে কিয়েভের আশপাশের অঞ্চলের গভর্নর জানান, সেখানে এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাতে রাশিয়া ইউক্রেনের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৮৩টি ড্রোন ছুড়ে। এর মধ্যে ১৫৬টি ড্রোন ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে।
রুশ হামলায় শীতের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের শত শত অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র মেরামতে দুই মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ওই কেন্দ্রটি প্রায় এক হাজার ১০০টি ভবনে তাপ সরবরাহ করে।
এদিকে বুধবার রাশিয়ার বাহিনী ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দ্রুজকিভকায় গোলাবর্ষণ চালায়। এতে একটি ব্যস্ত বাজারে অন্তত সাতজন নিহত হন।
দোনেৎস্ক অঞ্চলের গভর্নর ভাদিম ফিলাশকিন জানান, বুধবার সকালে সাধারণত ব্যস্ত সময়েই ক্লাস্টার গোলাবারুদ ব্যবহার করে বাজারটিকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। এতে আরও ১৫ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তির বয়স ছিল ৮১ বছর।
