যুক্তরাষ্ট্রের নজর এই খনিজের দিকে, কিন্তু মার্কিন অস্ত্রধারী জঙ্গিরাই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে
আকাশপথে আসার সময় নিচে তাকালে মনে হবে, পাকিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতমালার লালচে-বাদামি আঁকাবাঁকা পর্বতমালার গভীরে বিশাল খাঁজকাটা একটি গহ্বর শীতের রোদে যেন ঝলমল করছে। এটি অবস্থিত, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্গম ও আইনশৃঙ্খলাহীন অঞ্চলের একটিতে, আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে মাত্র ১০ মাইল দূরে পাহাড় কেটে তৈরি হওয়া এই গহ্বর মূলত খনি।
এর নাম মুহাম্মদ খিল কপার মাইন। গত বছর এ খনি থেকেই প্রায় ২২ হাজার টন তামা উত্তোলন করা হয়, যার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েকশ' মিলিয়ন ডলার। এই তামা রপ্তানি হয়েছে চীনে—যে দেশটির ধাতু ও খনিজের চাহিদা ব্যাপক।
পার্শ্ববর্তী আরেক প্রদেশে রয়েছে আরেকটি তামার খনি, যেখান থেকে পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী প্রায় দশ গুণ বেশি তামা উত্তোলন সম্ভব—যার পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রে বছরে ব্যবহৃত মোট তামার প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমান। এই সম্ভাবনাই ওয়াশিংটনের জন্য এতটাই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে যে, খনি প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্র এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে।
পাকিস্তান বলছে, তাদের ভূগর্ভে রয়েছে আরও বিপুল সম্পদ—আনুমানিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের তামা, লিথিয়াম, কোবাল্ট, স্বর্ণ, অ্যান্টিমনি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ। আর এই দাবি থেকেই ইসলামাবাদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক অপ্রত্যাশিত ঘনিষ্ঠতা, যিনি বিরল খনিজ সংগ্রহকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছেন।
তবে পাকিস্তান যে বিপুল সম্পদের কথা বলছে, তার বড় অংশই অবস্থিত এমন সীমান্ত এলাকায়, যেখানে কয়েক দশক ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও জঙ্গি তৎপরতা চলছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খল সেনা প্রত্যাহারের পর ফেলে যাওয়া বিপুল অস্ত্রশস্ত্রের হাতে পড়ার কারণে—এসব গোষ্ঠীর সহিংসত তৎপরতা আরও বিস্তৃত ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু এলাকা সফর করেছে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের একটি টিম। তারা দেখতে পান শত শত যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি রাইফেল, মেশিনগান ও স্নাইপার রাইফেল—সবই আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সময় ফেলে যাওয়া অস্ত্র, যা এখন নতুন প্রজন্মের জঙ্গি ও বিদ্রোহীদের কাছ থেকে জব্দ করেছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী।
মুহাম্মদ খিল কপার মাইন থেকে প্রায় ৫০ মাইল দূরে, পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ওয়ানার কাছে সম্প্রতি পাকিস্তানি তালেবানের আত্মঘাতী হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি সামরিক ক্যাডেট কলেজের বাইরে এক কর্নেল সাংবাদিকদের সামনে রক্তমাখা একটি ব্যান্ডানা ও তিনটি এম-১৬ রাইফেল তুলে ধরে দেখান। ব্যান্ডানাটিতে উর্দু ও ইংরেজিতে শাহাদাতের জন্য প্রস্তুতির স্লোগান লেখা ছিল। আর রাইফেলগুলোর গায়ে খোদাই করা ছিল—"প্রপার্টি অব ইউএস গভর্নমেন্ট। ম্যানুফ্যাকচার্ড ইন কলাম্বিয়া, সাউথ ক্যারোলাইনা।"
যুক্তরাষ্ট্র ফেলে যাওয়া এই আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চলের বিদ্রোহকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের খনিজ আহরণের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে।
আইফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি পর্যন্ত প্রায় সব আধুনিক প্রযুক্তিপণ্যে ব্যবহৃত হওয়া বিশ্বের বিরল খনিজ উপাদানের ৯০ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে চীন।
রেয়ার আর্থ ও তার প্রক্রিয়াজাতকরণে এই প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে বেইজিংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। আর ট্রাম্প প্রশাসন এই আধিপত্য ভাঙতেই তৎপর হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম বছরেই ট্রাম্প অস্ট্রেলিয়া, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করেন গুরুত্বপূর্ণ খনিজে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, যুক্তরাষ্ট্র এত পরিমাণ খনিজের জোগান নিশ্চিত করবে "যা দিয়ে পড়ে কী করবেন, সেটাই বুঝে উঠতে পারবেন না।"
পরিস্থিতি বুঝে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে হোয়াইট হাউসে তাদের প্রথম যৌথ সফরে এক অভিনব উপহার নিয়ে যান—পাকিস্তানের মাটি থেকে উত্তোলিত বলে দাবি করা রেয়ার আর্থের নমুনা ভরা সুদৃশ্য একটি কাঠের বাক্স।
ওভাল অফিসে খনিজের এই নমুনা পেয়ে ট্রাম্প মুগ্ধ হন। পরের মাসেই তিনি প্রকাশ্যে মুনিরের প্রশংসা করে তাকে সম্বোধন করেন "আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল" বলে।
পাকিস্তান আরও একটি ধাতুর বিশাল মজুদের কথা তুলে ধরে ট্রাম্পের আগ্রহ বাড়িয়েছে— সেটা হচ্ছে তামা। এই তামাই ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর তার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের পেছনের সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের নানা প্রযুক্তির মূল উপাদান তৈরিতে লাগে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব যখন দ্রুত ডিজিটাল ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হচ্ছে, তখন শুরু হয়েছে এক ধরনের 'কপার রাশ'। বর্তমানে বছরে প্রায় ৩ কোটি টন তামার চাহিদা থাকলেও ২০৫০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৫ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ক্রিটিক্যাল মিনারেলস সিকিউরিটি প্রোগ্রামের পরিচালক ড. গ্রাসেলিন বাস্কারান বলেন, "তামাই আমাদের আধুনিক অর্থনীতির প্রতিটি অংশকে চালাবে। আর আমরা এখন এর কাঠামোগত ঘাটতির মুখে।"
এই ঘাটতিই যুক্তরাষ্ট্রকে বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণে কম প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে, তিনি যোগ করেন।
ডিসেম্বরে পাকিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক (এক্সিম) বেলুচিস্তানের রেকো ডিক এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলনে সহায়তার জন্য ১.২৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন দিয়েছে।
কানাডার প্রতিষ্ঠান ব্যারিকের নেতৃত্বে উন্নয়নাধীন এই খনি এলাকা এখনো বিশ্বের অনাবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় তামার মজুদগুলোর একটি বলে দাবি করা হয়।
বারবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়া পাকিস্তান ১৯৫৮ সাল থেকে আইএমএফের ২৪টি বেইলআউট প্যাকেজ নিয়েছে; এমতাবস্থায় অনেকে আশা করছেন, এই খনিজ সম্পদই একদিন দেশটির অর্থনীতির ত্রাণকর্তা হয়ে উঠবে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী সিএনএনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র "পাকিস্তানের জনগণ, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য অনেক কিছু দেওয়ার সামর্থ্য রাখে।"
ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানে ওয়াশিংটনের এই তৎপরতা বেইজিংয়ের নজর এড়ায়নি। তবে চীনা কর্মকর্তারা বলছেন, ইসলামাবাদ তাদের আশ্বস্ত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা চীনের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে না।
মূল্যবান ধাতু এখন বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে। আর পাকিস্তানে সেগুলোর নাগাল পেতে হচ্ছে রক্তক্ষয়ী স্থানীয় সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে।
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর পেশোয়ারের একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল উইংয়ে উজ্জ্বল আলোয় ঢাকা কক্ষে লালচে কম্বলের নিচে শুয়ে আছে ডজনখানেক আহত তরুণ। যন্ত্রের বিপবিপ শব্দ, নার্সদের চাপাকণ্ঠে কথাবার্তা। পাশের আরেক ওয়ার্ড থেকে ভেসে আসে কারও তীক্ষ্ণ চিৎকার।
এই যন্ত্রণাক্লিষ্ট বাস্তবতার মধ্যে বসে আছেন ৩০ বছর বয়সী আল্লাহ উদ্দিন। সিএনএনের সঙ্গে দেখা হওয়ার এক সপ্তাহ আগে, মুহাম্মদ খিল কপার মাইন যে জেলায় অবস্থিত, সেখানে তিনি যে কনভয় পাহারা দিচ্ছিলেন, সেটিতে পাকিস্তানি তালেবান হামলা চালায়। ওই হামলায় দুই পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এটাই ছিল তার প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। এখন তিনি দুই পা হারানো একজন মানুষ, অথচ তিন সন্তান ও একটি পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে।
শান্ত কণ্ঠে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, শত্রুদের অস্ত্রের মান তাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে। "আমি জানি না তারা কোথা থেকে এনেছে, কিন্তু তাদের অস্ত্রগুলো… আলাদা ছিল, আরও উন্নত ছিল।"
পাকিস্তানে ঐতিহ্যগতভাবে জঙ্গিদের অস্ত্র ছিল সোভিয়েত যুগের কালাশনিকভ ও আরপিজি। কিন্তু, এখন তারা ব্যবহার করছে আমেরিকান অস্ত্র।
পেশোয়ার হাসপাতালে দায়িত্বে থাকা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর জেনারেল সার্জন কর্নেল বিলাল সাঈদ সিএনএনকে বলেন, আগে যেখানে আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বা পেতে রাখা বিস্ফোরণে আহত রোগী আসত, এখন সেখানে আসছে "দূর থেকে গুলিবিদ্ধ বা স্নাইপারের বুলেটে আহত রোগী।"
তিনি বলেন, আগে আহতরা দিনের বেলায় আসত। এখন তারা আসে সূর্যাস্তের পর, কারণ জঙ্গিদের হাতে শুধু উন্নত অস্ত্রই নয়, আছে "নাইট ভিশন ডিভাইস"।
যে সংঘর্ষে আল্লাহ উদ্দিন তার দুই পা হারান, সেটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সিএনএন একই ওয়ার্ডে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গুলিবিদ্ধ বা বিস্ফোরণে আহত আরও প্রায় ১০ জন সেনার সঙ্গে কথা বলেছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে জঙ্গি হামলায় সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে ১২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এটি ২০২১ সালের তুলনায় দ্বিগুণ—যে বছর যুক্তরাষ্ট্র কাবুল ছাড়ে এবং আফগান তালেবান ক্ষমতায় ফেরে। একাধিক পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, তারা এখন সীমান্ত অঞ্চলগুলোয় কার্যত একটি "যুদ্ধ" লড়ছেন।
দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের সড়কজুড়ে সিএনএন দেখতে পায় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সেনাদের টহল। সবচেয়ে বড় শহর ওয়ানার বিমানঘাঁটি ছিল নিরাপত্তা বাহিনীতে ভরা। তবে উত্তর ওয়াজিরিস্তানের দিকে যাওয়ার সড়ক—যেখানে মুহাম্মদ খিল কপার মাইন অবস্থিত—বন্ধ রাখা হয়েছিল। কর্মকর্তাদের ভাষায়, সেটি খুবই বিপজ্জনক।
পেশোয়ারে ফিরে, হাসপাতাল উইংয়ের কাছেই, পাকিস্তানের খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলে নতুন করে তাণ্ডব চালানো জব্দ অস্ত্রগুলোর কিছু নমুনা সিএনএনকে দেখানো হয়।
সেখানে একই টেবিলে রাখা ছিল শতাধিক অস্ত্র—এম-১৬, এম-৪, এম২৪৯ মেশিনগান ও রেমিংটনের তৈরি স্নাইপার রাইফেল। সবগুলোর গায়েই লেখা ছিল, সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি।
পাকিস্তানি সেনারা ২০২২-২৩ সাল থেকে তালেবান যোদ্ধাদের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি অস্ত্র জব্দ করতে শুরু করে, বলেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ মুবাশির। তিনি বলেন, এগুলো এখন "প্রায় প্রতিটি সংঘর্ষেই" দেখা যাচ্ছে।
ওয়ানার কাছে ক্যাডেট কলেজে আত্মঘাতী হামলায় ব্যবহৃত তিনটি এম-১৬ রাইফেলের সিরিয়াল নম্বর সংগ্রহ করে সিএনএন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কাছে ফ্রিডম অব ইনফরমেশন অ্যাক্টের আওতায় তথ্য চায়।
আলাবামার রেডস্টোন আর্সেনালে অবস্থিত ইউএস আর্মি ম্যাটেরিয়াল কমান্ড জানায়, রাইফেলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অস্ত্র প্রস্তুতকারক ও সামরিক স্থাপনা থেকে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন শাখাকে দেওয়া হয়েছিল—২০২১ সালে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের অনেক বছর আগে।
পেন্টাগন সিএনএনের অনুরোধে এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
পাকিস্তানি সামরিক সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এম-১৬ ও এম-৪ কারবাইন এখন আরেক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী—বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ)—হাতেও দেখা যাচ্ছে।
দশকের পর দশক ধরে বিএলএ একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী লড়াই চালিয়ে আসছে। তাদের লক্ষ্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও খনিজসমৃদ্ধ বেলুচিস্তানে রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। আর এই প্রদেশেই রেকো ডিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিগুলো অবস্থিত। এই খনিগুলোতে তামাসহ গুরুত্বপূর্ণ সব ধাতুর মজুদ আছে।
সীমান্ত অঞ্চলে মোতায়েন করা অধিকাংশ পাকিস্তানি সেনাদের কাছে কি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি আগ্নেয়াস্ত্রের সমমানের অস্ত্র আছে—এই প্রশ্নে মুবাশির এক কথায় বলেন, "না।"
গত সপ্তাহান্তে বিএলএ একযোগে একাধিক স্থানে হামলা চালায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এতে ৩৩ জন নিহত হন। এতে প্রদেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের খনিজ নীতির বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, পাল্টা অভিযানে তারা অন্তত ১৩৩ জন জঙ্গিকে হত্যা করেছে।
প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি সিএনএনকে বলেন, "প্রাথমিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, (বিএলএ'র সঙ্গে) কয়েকজন আফগান নাগরিকও জড়িত ছিল।" তিনি বলেন, "ব্যবহৃত অধিকাংশ অস্ত্রই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি, যা আফগানিস্তান থেকে এসেছে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।"
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান সিএনএনকে বলেন, বেলুচিস্তান একই সঙ্গে "গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু, আবার জঙ্গি হুমকির ক্ষেত্রেও কেন্দ্রবিন্দু।"
৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র তালেবানকে কাবুল থেকে উৎখাত করে নতুন আফগান সেনাবাহিনী গড়ে তোলে এবং তাদের হাতে তুলে দেয় বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম—যাতে তারা তালেবানকে ঠেকাতে পারে। কিন্তু, মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের আগেই তালেবানের আক্রমণ অভিযানের মুখে ধসে পড়ে পশ্চিমা প্রশিক্ষিত আফগান সরকারি বাহিনীর প্রতিরোধ।
এনিয়ে মার্কিন বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল স্কট ইয়েটম্যান বলেন, "সবকিছু ধস পড়বে এমনটা ধরে নেওয়ার জন্য আমরা পরিকল্পনা করি না। আরা পরিকল্পনা করি অভিযান চালিয়ে যাওয়ার এবং যেভাবেই হোক ধস ঠেকানোর।" তিনি তালেবান কাবুল পুনর্দখলের দুই মাস আগ পর্যন্ত আফগান বিমানবাহিনীর শীর্ষ মার্কিন উপদেষ্টা ছিলেন।
২০২১ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও কর্মীরা যখন পড়িমড়ি করে আফগানিস্তান ত্যাগ করে, তখন তারা ফেলে যায় বিপুল অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৪৮ বিলিয়ন ডলারের আফগান পুনর্গঠন কর্মসূচির বিশেষ পরিদর্শক হিসেবে ১২ বছর দায়িত্ব পালন করা জন সোপকো বলেন, প্রায় ৩ লাখ ছোট আগ্নেয়াস্ত্র সেখানে ছেড়ে আসা হয়।
তিনি সিএনএনকে বলেন, এর সঙ্গে ছিল যোগাযোগ সরঞ্জাম, রকেট লঞ্চার, গ্রেনেড লঞ্চার, মর্টার, কামান, ভারী মেশিনগান, নজরদারি যন্ত্র ও নাইট ভিশন ডিভাইস।
সোপকোর ভাষায়, আফগানিস্তান এখন কার্যত বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্রবাজার। "আপনি যদি আপনার সন্ত্রাসী বা বিদ্রোহী সংগঠনকে অস্ত্রে সজ্জিত করতে চান, তাহলে আফগানিস্তানই (কেনাকাটার) সেরা জায়গা।"
ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আফগানিস্তান জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে। যদিও তালেবান নেতৃত্ব এসব অভিযোগ বরাবরাই অস্বীকার করেছে।
সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আফগান তালেবান জানায়, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তাদের ফেলে যাওয়া সব অস্ত্র তাদের "নিয়ন্ত্রণে ও সুরক্ষিত" অবস্থায় রয়েছে।
সোপকো বলেন, এই অস্ত্রগুলো যেভাবে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, তা "উদ্বেগজনক"।
পাকিস্তান, ইরান এমনকি চীনসহ আফগানিস্তানের সব প্রতিবেশী দেশকেই "উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত," তিনি বলেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আফগান তালেবানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ফেরত দেওয়ার দাবি জানালেও কোনো ফল হয়নি। পেন্টাগন বর্তমানে তালেবানের সঙ্গে অস্ত্র উদ্ধারে আলোচনা করছে কি না—এ বিষয়ে সিএনএন মন্তব্য জানতে চেয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন অন্য পদক্ষেপও নিচ্ছে।
আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র বিএলএকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। একই মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান 'কাউন্টার টেররিজম ডায়ালগ'-এ বিএলএ, ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রদেশ (আইএসকেপি) ও তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)—এই জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যৌথ লড়াই নিয়ে আলোচনা করে।
জানুয়ারিতে দুই দেশের সেনাবাহিনী পাকিস্তানে যৌথ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, এতে যৌথ পদাতিক কৌশল ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন, খনিজসমৃদ্ধ এলাকাগুলো সুরক্ষিত করতে এবং খনি অবকাঠামোকে "বিশ্বমানের" করতে ইসলামাবাদ যা যা করা প্রয়োজন, তাই করবে।
তিনি সিএনএনকে বলেন, "আমরা এর সমাধান করব। আমাদের কাছে আর কোনো বিকল্পও নেই।"
এর অর্থ সম্ভবত রুক্ষ এই পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে আরও সংঘর্ষ—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি অস্ত্রের কারণে পুনরুত্থিত জিহাদি গোষ্ঠীগুলো এখন তাদের প্রতিপক্ষ অর্থাৎ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
পেশোয়ারের হাসপাতালের ওয়ার্ডে আল্লাহ উদ্দিন ও তার মতো আহত সেনারা পড়ে আছেন অসহায় ও ক্ষুব্ধ অবস্থায়।
"আমি পাল্টা গুলি চালিয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের গুলি শত্রু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি," দুই পা হারানোর সেই সংঘর্ষের কথা বলতে গিয়ে সিএনএনকে বলেন তিনি।
"আমি ভীষণ ক্ষুদ্ধ। আমার অবস্থা কি দেখছেন?… চারপাশে আহত সঙ্গীদের দেখে আমার রাগ আরও বেড়ে যায়।"
