দীর্ঘ রাজত্বের পর যেভাবে জৌলুশ হারাল জার্মান স্পোর্টস আইকন ‘পুমা’
ইউরোপের অন্যতম আইকনিক স্পোর্টস ব্র্যান্ড পুমা। যদিও সময়টা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না তাদের। ব্যবসায়িক মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে এবার চীনা কোম্পানির দ্বারস্থ হতে হচ্ছে জার্মানির এই প্রতিষ্ঠানটিকে। চীনের শীর্ষ স্পোর্টসওয়্যার প্রতিষ্ঠান 'আনতা' প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের এক চুক্তির মাধ্যমে পুমার সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার হতে যাচ্ছে।
পুমা ও তার চরম প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাডিডাস—দুটি প্রতিষ্ঠানের শেকড় কিন্তু একই জায়গায়। ১০০ বছর আগে দুই ভাই রুডলফ ডাসলার ও অ্যাডলফ ডাসলার জার্মানির একই বাড়িতে জুতার ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পরে দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ধরনের বিবাদের ফলে কোম্পানি ভাগ হয়ে যায়।
রুডলফ প্রতিষ্ঠা করেন 'রুডা', যা পরে 'পুমা' নাম নেয়। আর অ্যাডলফ গড়েন 'অ্যাডিডাস'। জার্মানির হারজোজেনাউরাখ শহরে আজও দুই প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর একে অপরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত।
বর্তমানে অ্যাডিডাসের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে বেশ পিছিয়ে পড়েছে পুমা। অ্যাডিডাসের 'টেরেস' মডেলের রেট্রো জুতাগুলো যখন বাজারে দেদার বিক্রি হচ্ছে, তখন পুমার 'স্পিডক্যাট' স্নিকার বা অন্যান্য স্পোর্টসওয়্যার ক্রেতাদের মন জয় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এতে দুই কোম্পানির আয়ের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।
পুমার এই পিছিয়ে পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মর্নিংস্টারের বিশ্লেষক ডেভিড শোয়ার্টজ বলেন, 'খেলার জুতার (পারফরম্যান্স স্পোর্টস শু) চেয়ে লাইফস্টাইল পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল পুমা। অথচ এ শিল্পে খেলার জুতাই আসল চালিকাশক্তি।'
তিনি আরও জানান, আয় কমে যাওয়ায় ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়াতে বড় তারকাদের পেছনে যথেষ্ট অর্থ ঢালতে পারেনি পুমা। ফলে দৃশ্যমানতা বা পরিচিতির দিক থেকেও পিছিয়ে পড়েছে তারা।
নাইকি ও অ্যাডিডাসের পরেই স্পোর্টসওয়্যার বাজারে দীর্ঘদিন তৃতীয় স্থানটি ধরে রেখেছিল পুমা। দারুণ সব স্নিকার তৈরি আর নামীদামি অ্যাথলেট ও ফুটবল দলের স্পনসর হয়ে তারা টিকে ছিল প্রতিযোগিতায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে 'অন রানিং' ও 'হোকা'র মতো নতুন ব্র্যান্ডগুলোর উত্থানে দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছে পুমা।
পুমার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আর্থার হোয়েল্ড নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। পুমার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাডিডাসের সাবেক এই বিক্রয়প্রধান গত অক্টোবরে বলেন, 'পুমা অতিরিক্ত বাণিজ্যিক হয়ে পড়েছে। ভুল সব জায়গায় পণ্য বিক্রি এবং অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার কারণে ব্র্যান্ডটির ক্ষতি হয়েছে।'
গুচির মালিকানা প্রতিষ্ঠান কেরিং গ্রুপের পিনো পরিবারের হাতে থাকা পুমার ২৯ শতাংশ শেয়ার কিনছে চীনা কোম্পানি আনতা। এই চুক্তির ফলে চীনসহ বিশ্ববাজারে হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে পুমার সামনে। শেয়ার হস্তান্তরের এই খবরে গত মঙ্গলবার পুমার শেয়ারের দাম ৯ শতাংশ বেড়েছে।
আনতার ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েই লিন বলেন, 'চীনে পুমাকে কীভাবে আরও সফল করা যায়, সে বিষয়ে আমাদের ভালো ধারণা আছে। এই শিল্পের অন্যতম মূল্যবান ব্র্যান্ড এটি।'
আনতার সঙ্গে এই চুক্তিতে পুমার মোট বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৬২০ কোটি ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, নাইকি, অ্যাডিডাস কিংবা সুইস কোম্পানি অন রানিংয়ের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পুমার এই দর বেশ সস্তাই বলা চলে।
১৯৪৮ সালে যাত্রা শুরু করা পুমার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। অ্যাথলেটদের জন্য ট্র্যাক স্পাইক ও ফুটবল বুট তৈরির জন্য তাদের খ্যাতি পুরোনো। একসময় জার্মানির হারজোজেনাউরাখে নিজস্ব কারখানায় জুতা তৈরি করত তারা। তবে এখন তাদের বেশির ভাগ পণ্যই আসে চীন, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার কারখানা থেকে।
২০২১ সালের শেষ দিকেও পুমার ব্যবসায়িক অবস্থা ছিল রমরমা। সে সময় তাদের শেয়ারের দাম ১১৫ ইউরো পর্যন্ত উঠেছিল। কিন্তু এরপরই ছন্দপতন। গত কয়েক বছরে পুমার শেয়ারের দর প্রায় ৮০ শতাংশ পড়ে গেছে। গত মঙ্গলবার কোম্পানিটির বাজারমূলধন ছিল ৩২০ কোটি ইউরো, যা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাডিডাসের আকারের মাত্র আট ভাগের এক ভাগ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্যযুদ্ধ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে খুচরা বিক্রির বাজারে মন্দা দেখা দিয়েছে। তবে এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে পুমা। বিশেষ করে পণ্যের প্রতিযোগিতায় তারা বেশ চাপে পড়েছে।
পুমার নতুন জুতা 'স্পিডক্যাট' বাজারে এলেও তা খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। অন্যদিকে অ্যাডিডাস বাজিমাত করেছে তাদের 'সাম্বা' ও 'টেরেস' মডেলের জুতা দিয়ে। ৭০ ও ৮০-এর দশকের ফুটবল ভক্তদের জুতোর আদলে তৈরি অ্যাডিডাসের এই জুতাগুলো এখন তরুণদের পছন্দের শীর্ষে। অ্যাডিডাসের এই জনপ্রিয়তার কাছে ম্লান হয়ে গেছে পুমার স্পিডক্যাট।
সংকট কাটাতে গত অক্টোবরে ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন পরিকল্পনার কথা জানান পুমার সিইও আর্থার হোয়েল্ড। গত বছরের জুলাইয়ে দায়িত্ব নেওয়া এই কর্মকর্তা জানান, খরচ কমাতে ৯০০ করপোরেট কর্মী ছাঁটাই করা হবে। এ ছাড়া পণ্যে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া বন্ধ করা, মার্কেটিং জোরদার করা এবং পণ্যের সংখ্যা কমানোর ওপর জোর দেন তিনি।
জার্মান ব্যাংক মেটজলারের খুচরা বাজার বিশ্লেষক ফেলিক্স ডেনল মনে করেন, স্নিকারের বাজারে অ্যাডিডাস শুরুতেই কৌশলগতভাবে এগিয়ে গেছে। তিনি বলেন, 'রেট্রো বা পুরোনো ধাঁচের স্নিকারের ট্রেন্ড ধরার ক্ষেত্রে পুমার চেয়ে অন্তত ছয় মাস আগে মাঠে নেমেছিল অ্যাডিডাস। আগেভাগে বাজারে নামার কারণে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। লাইফস্টাইল জুতোর এই জনপ্রিয়তা তাদের পারফরম্যান্স বা খেলার জুতোর কাটতি বাড়াতেও সাহায্য করেছে।'
