এপস্টিন ও জাদুকর ডেভিড কপারফিল্ডের ‘খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ ছিল, নতুন প্রকাশিত নথিতে দাবি
২০০৭ সালে এফবিআই এজেন্টরা তদন্তের সময় বলেছিলেন যে বিখ্যাত জাদুকর ডেভিড কপারফিল্ড ও জেফ্রি এপস্টেইনের মধ্যে একটি 'স্পষ্ট সম্পর্ক' রয়েছে। বিচার বিভাগের (ডিওজে) গত সপ্তাহে প্রকাশিত এপস্টেইন ফাইলসের সর্বশেষ কিস্তির নথিতে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
সিয়াটলে কর্মরত এফবিআই এজেন্টদের লেখা ২০০৭ সালের একটি মেমোতে বলা হয়, এই 'সম্পর্ক' নিয়ে আরও তদন্ত প্রয়োজন, যাতে বোঝা যায় কপারফিল্ড ও এপস্টিন দুজনেই কি অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি যৌন আগ্রহ পোষণ করতেন এবং তারা একে অপরের কাছে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের পাঠাতেন কিনা।
২০০৭ সালে কপারফিল্ডের বিরুদ্ধে এফবিআইয়ের দুই বছরব্যাপী তদন্ত শুরু হয় সিয়াটলের এক নারী লেসি ক্যারোলের অভিযোগের পর। তিনি দাবি করেন, কপারফিল্ড তার একটি শো দেখার পর তার সঙ্গে পরিচিত হন এবং মডেলিং ও প্রচারণার কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে বাহামার নিজের ব্যক্তিগত দ্বীপ 'মুশা কে'-তে নিয়ে যান। সেখানে তাকে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন করা হয় বলে অভিযোগ করেন ক্যারোল।
তবে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে এই তদন্ত বন্ধ হয়ে যায় এবং ক্যারলের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কপারফিল্ডের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি।
২০১২ সালে অপরা উইনফ্রের সঙ্গে মুশা কে-তে ধারণ করা এক সাক্ষাৎকারে কপারফিল্ড দাবি করেন, তিনি শুধু নির্দোষ প্রমাণিতই হননি, বরং এ মামলায় তিনি নিজেই একজন ভুক্তভোগী।
নতুন নথি প্রকাশের বিষয়ে কপারফিল্ডের আইনজীবীরা কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি। তবে ২০২৪ সালে তারা দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছিলেন, কপারফিল্ড 'জেফ্রি এপস্টিনের বন্ধু ছিলেন না'। তাদের ভাষায়, কপারফিল্ড ও এপস্টেইনের বন্ধুত্বের দাবি 'সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গণমাধ্যমের ভুল উপস্থাপন'। তারা বলেন, তাদের কেবল হাতেগোনা কয়েকবার দেখা হয়েছিল।
কপারফিল্ড বরাবরই যৌন অসদাচরণ বা অনুপযুক্ত আচরণের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত নতুন নথিতে এফবিআইয়ের তদন্ত সংক্রান্ত নতুন তথ্য এবং কপারফিল্ড ও এপস্টিন–সংক্রান্ত তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে হওয়া আলোচনা উঠে এসেছে।
২০০৭ সালের ১২ ডিসেম্বরের এক মেমোতে সিয়াটলের এফবিআই এজেন্টরা মায়ামির সহকর্মীদের জানান, এপস্টিন–সম্পর্কিত কিছু প্রমাণ কপারফিল্ড তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তারা বলেন, কপারফিল্ডের 'বিজনেস লিস্টে' এমন দুই নারীর নাম পাওয়া গেছে যারা এপস্টিন মামলারও সাক্ষী ছিলেন। একজন নারী দাবি করেছিলেন, এপস্টিন তাকে 'গ্রুম' করেছিলেন।
এফবিআই ওই দুই নারীকে জিজ্ঞাসাবাদে আগ্রহী ছিল, কারণ তারা কপারফিল্ডের একটি 'বিজনেস লিস্ট'-এ নাম থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন। এজেন্টদের মতে, এই তালিকাটি এমন নারীদের নিয়ে তৈরি, যাদের কপারফিল্ড যৌন সম্পর্কের জন্য লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন।
মেমোতে বলা হয়, তালিকায় ওই দুই নারীর পাশে লেখা ছিল যে তারা 'জেফ এপস্টেইনের অতিথি'। সেখানে আরও উল্লেখ ছিল যে 'তিনি'—সম্ভবত এপস্টিন—বলেছিলেন, ওই নারীদের একজন 'অনুগত নয়, খেলায় অংশ নেয় না'।
এফবিআই জানায়, কপারফিল্ডের বাড়ি, গুদাম এবং এমজিএম গ্র্যান্ড হলিউড থিয়েটারে তল্লাশির সময় পাওয়া প্রমাণে দেখা যায়, একাধিকবার কপারফিল্ড এপস্টিন ও তার অতিথিদের বিনা মূল্যে শোয়ের টিকিট দিয়েছিলেন।
মেমোতে আরও বলা হয়, তল্লাশির পর কপারফিল্ডের নথিপত্রে ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৩ বছরের একটি বড় শূন্যতা পাওয়া যায়। এ সময়েই এপস্টিন তার বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ তদন্তের বিষয়ে অবগত হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হয়।
এফবিআই মনে করেছিল, কপারফিল্ড ও এপস্টিনের সম্পর্কের মধ্যে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড ছিল কি না, তা জানার জন্য মায়ামিতে সাক্ষাৎকার নেওয়া জরুরি।
ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বরের আরেকটি আংশিক গোপন নথিতে দাবি করা হয়, কপারফিল্ড তার কর্মীদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে শোয়ের দর্শকদের মধ্যে তরুণীদের শনাক্ত করতে হয় এবং তাদের আলাদা করে ব্যাকস্টেজে নেওয়া হয়। সেখানে নারীদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রাখা একটি নোটবুকের কথাও উল্লেখ করা হয়।
নথিতে বলা হয়, তদন্ত শেষে মামলাটি বন্ধ করা হয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি অফিস কপারফিল্ডের আর্থিক শক্তির কারণে দুর্বল ও চাপের মুখে ছিল বলে মনে করা হয়। তবে এ দাবির সঙ্গে একমত নন মামলার ভুক্তভোগীর আইনজীবী বেকি রো।
মঞ্চের চাকচিক্যের অন্তরালে
২০২৪ সালের মে মাসে দ্য গার্ডিয়ান ডেভিড কপারফিল্ডকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে জানানো হয়, কপারফিল্ডের বিরুদ্ধে ১৬ জন নারী যৌন অসদাচরণ ও অনুপযুক্ত আচরণের অভিযোগ এনেছেন। এসব অভিযোগের মধ্যে তিন নারী দাবি করেছেন, কপারফিল্ড তাদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়ানোর আগে মাদক প্রয়োগ করেছিলেন।
কপারফিল্ড এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। সে সময় তার আইনজীবীরা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, তিনি 'কখনোই কারও সঙ্গে অনুপযুক্ত আচরণ করেননি'। তারা আরও বলেন, কপারফিল্ডের একটি 'সত্যনিষ্ঠ' চিত্র তুলে ধরলে সেখানে তার 'দয়ালু স্বভাব, লাজুকতা এবং নারী-পুরুষ সবার প্রতি সম্মানজনক আচরণ'-এর কথাই উঠে আসবে।
দ্য গার্ডিয়ানের ওই অনুসন্ধানে এপস্টিনের সঙ্গে কপারফিল্ডের লেনদেনসংক্রান্ত তৎকালীন প্রাপ্ত নথিও খতিয়ে দেখা হয়। এর মধ্যে ছিল এপস্টিনের বাসা থেকে জব্দ করা মেসেজ প্যাড, যেখানে দেখা যায়—২০০৪ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে কয়েক মাসে কপারফিল্ড ১৬ বার এপস্টিনের জন্য বার্তা রেখে গেছেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সে সময় লন্ডনে কপারফিল্ডের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করা আইনজীবী প্রতিষ্ঠান হারবটল অ্যান্ড লুইস ও কার্টার রাককে ২০২৪ সালে দ্য গার্ডিয়ান এপস্টেইন ও কপারফিল্ডের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করে। আইনজীবীরা বারবার অস্বীকার করেন যে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তারা এ দাবিও নাকচ করেন যে কপারফিল্ড এপস্টেইনের জন্য 'একাধিক বার্তা' রেখে গিয়েছিলেন।
আইনজীবীরা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, 'যে কোনো বার্তা রেখে থাকলে তা আমাদের মক্কেলের অফিস থেকেই রাখা হয়েছিল, এবং তা ছিল এপস্টিনের শোয়ের টিকিট চাওয়ার অনুরোধের জবাবে।'
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এপস্টিন ফাইলসের আরেক দফা নথি প্রকাশের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এমন কিছু ছবি প্রকাশ করে, যেখানে কপারফিল্ড ও ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েলকে সাদা পোশাক পরিহিত অবস্থায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে দেখা যায়। দ্য গার্ডিয়ানের অন্যান্য ছবির তুলনামূলক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, ছবিগুলো এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপে তোলা। তবে ছবিগুলোর কোনো তারিখ উল্লেখ ছিল না।
কপারফিল্ডের আইনজীবীরা এসব ছবি, এপস্টিনের দ্বীপে কপারফিল্ডের অবস্থান, কিংবা তিনি সেখানে কতবার যেতেন—এসব প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি।
এপস্টিন ফাইলসের সর্বশেষ নথিপত্রে ২০১৫ সালের একটি ইমেইলও রয়েছে, যা এপস্টিন ও নাদিয়া নামের এক নারীর মধ্যে আদান-প্রদান হয়েছিল। ওই ইমেইলে নাদিয়া কপারফিল্ডের নিজস্ব দ্বীপ 'মুশা কে'-এর একটি লিংক এপস্টিনকে পাঠান—যেখানে লেসি ক্যারোল অভিযোগ করেছেন, কপারফিল্ড তাকে ধর্ষণ করেছিলেন। নাদিয়া জানতে চান, 'সে এটা কবে পেল?' জবাবে এপস্টিন লেখেন, 'আমি তাকে এটার কথা বলার পর।'
তবে লেসি ক্যারোলের সব অভিযোগই অস্বীকার করে আসছেন কপারফিল্ড।
