এপস্টিন নথিতে সুপারমডেল নাওমি ক্যাম্পবেলের নাম: গোপন সম্পর্কের ইঙ্গিত
যৌন অপরাধী হিসেবে দণ্ডপ্রাপ্ত জেফরি এপস্টিনকে নিয়ে বিচার বিভাগ লক্ষ লক্ষ নথিপত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে বারবার উঠে এসেছে ফ্যাশন জগতের অন্যতম পরিচিত মুখ নাওমি ক্যাম্পবেলের নাম।
ইমেইল চালাচালিতে দেখা গেছে, ৫৫ বছর বয়সী ক্যাম্পবেল এপস্টিনের ব্যক্তিগত বিমানে চড়ার অনুরোধ করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, এপস্টিনের নিউ ইয়র্কের প্রাসাদে দেখা করবেন। বিশ্বজুড়ে জাঁকজমকপূর্ণ সব অনুষ্ঠানে ক্যাম্পবেলের পক্ষ থেকে এপস্টিনকে আমন্ত্রণ জানানো হতো। এসব পরিকল্পনা মূলত এপস্টিনের দীর্ঘদিনের সহকারী লেসলি গ্রফের মাধ্যমে সমন্বয় করা হতো।
ফেডারেল তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পরিচয় গোপন রাখা ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, সামাজিক অনুষ্ঠানে এপস্টিন তাদের এই ব্রিটিশ সুপারমডেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। তারা ক্যাম্পবেলকে এপস্টিনের প্রাসাদ এবং ব্যক্তিগত দ্বীপেও দেখেছেন।
নথিপত্রে দেখা যায়, ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় নাবালিকাকে দিয়ে পতিতাবৃত্তির দায়ে এপস্টিন দণ্ডিত হওয়ার অনেক পরেও ক্যাম্পবেল তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। তাদের সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে নতুন তথ্য এখন সামনে আসছে।
২০১৯ সালে ম্যানহাটনের কারাগারে আত্মহত্যা করা এপস্টিন কীভাবে তার বিশাল ও প্রভাবশালী সামাজিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে কিশোরী ও তরুণীদের ফাঁদে ফেলতেন, ক্যাম্পবেলের সঙ্গে তার মেলামেশা এর আরেকটি উদাহরণ।
এপস্টিন, তার সহযোগী এবং বর্তমানে যৌন পাচারের দায়ে কারাবন্দি গিজলাইন ম্যাক্সওয়েলের আইনি কার্যক্রমে ক্যাম্পবেলের নাম আগেও এসেছিল।
ক্যাম্পবেলের আইনজীবী মার্টিন সিঙ্গার এক ইমেইল বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তার মক্কেল ২০১৯ সালে গ্রেপ্তারের আগে এপস্টিনের 'জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড' সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। এরপর তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগও রাখেননি।
সিঙ্গার লিখেছেন, '২০১৯ সালে গ্রেপ্তারের আগে আমার মক্কেল তার অপরাধ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। যদি তিনি কখনো দেখতেন কোনো তরুণী এপস্টিনের শিকারে পরিণত হচ্ছে, তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাকে সাহায্য করতেন।' তিনি আরও জানান, ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ক্যাম্পবেল মস্কোতে ছিলেন এবং এপস্টিন যে নিবন্ধিত যৌন অপরাধী, তা তিনি জানতেন না।
ক্যাম্পবেলের বিরুদ্ধে কোনো অন্যায়ের অভিযোগ নেই। এফবিআইয়ের সাক্ষাৎকারে ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে ক্যাম্পবেল সম্পর্কে কোনো অপরাধমূলক প্রমাণের উল্লেখ নেই।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিচার বিভাগের প্রকাশিত প্রায় ৩০০টি নথিতে ক্যাম্পবেলের নাম রয়েছে। বিল ক্লিনটন, ইহুদ বারাক এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রভাবশালী পুরুষদের ভিড়ে তিনি অন্যতম নারী সেলিব্রেটি।
'যাদের কাছে জেই-এর (এপস্টিন) ঠিকানা দরকার' শিরোনামের এক নথিতে ক্যাম্পবেলসহ কয়েক ডজন মানুষের নাম ছিল। সেখানে ফ্লোরিডার জেলে থাকা এপস্টিনকে চিঠি বা বই পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া ছিল।
সিঙ্গারের দাবি, ক্যাম্পবেল জানেন না এই তালিকা কে তৈরি করেছে বা তার নাম কেন সেখানে। তিনি জেলে যোগাযোগ করার জন্য কখনো ঠিকানা চাননি।
এফবিআইয়ের নথিতে দেখা যায়, তরুণীদের মডেলিং ক্যারিয়ারের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রলুব্ধ করতে এপস্টিন ক্যাম্পবেলের নাম ব্যবহার করতেন। ২০২০ সালে এক ভুক্তভোগী জানায়, ১৫ বছর বয়সে এপস্টিন তাকে ভিক্টোরিয়া'স সিক্রেটে কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন তিনি ক্যাম্পবেল ও লেসলি ওয়েকসনারকে চেনেন। ওই ভুক্তভোগী জানায়, এপস্টিনের ব্যক্তিগত অফিসে তাকে ক্যাম্পবেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
বিবৃতিতে সিঙ্গার বলেন, ক্যাম্পবেল কখনো ওই লঁজারি ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন না। এপস্টিন যদি তার নাম ব্যবহার করে বিশ্বাস অর্জন করে থাকেন, তবে তা ক্যাম্পবেলের অজান্তেই করেছেন।
২০১৯ সালে আরেক ভুক্তভোগী এফবিআইকে জানায়, ১৮ বছর বয়সে সে এপস্টিনের নিউ ইয়র্কের প্রাসাদে এক ডিনার পার্টিতে ক্যাম্পবেলকে দেখেছিল। আরেকজন জানায়, সে ক্যাম্পবেলকে এপস্টিনের দ্বীপে দেখেছিল।
গত বছর আত্মহত্যা করা ভার্জিনিয়া জিওফ্রে ২০১৬ সালে জানিয়েছিলেন, এপস্টিন তাকে ক্যাম্পবেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
সিঙ্গারের বিবৃতিতে বলা হয়, ক্যাম্পবেল এবং 'এফ১ রেসে যাওয়া একদল মানুষ' কমার্শিয়াল ফ্লাইটের ট্রানজিট হিসেবে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দ্বীপে ছিলেন। তিনি বলেন, ক্যাম্পবেল ভুক্তভোগীদের সঙ্গে দেখা করার কথা মনে করতে পারছেন না এবং কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে তার বাড়িতে যাননি। তবে '৩-৪টি ব্যবসায়িক মিটিংয়ের' জন্য তিনি এপস্টিনের হোম অফিসে গিয়েছিলেন।
২০০৯ সালে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর নিবন্ধিত যৌন অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও এপস্টিন ক্যাম্পবেলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন এবং তাকে নিজের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিলেন।
২০১০ সালের এক ইমেইলে দেখা যায়, এপস্টিন তার সহকারীকে নির্দেশ দিচ্ছেন লিন্ডা ওয়াকনারকে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতে, যাতে তিনি ক্যাম্পবেলের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। পরদিন সহকারী জানান, 'নাওমি নিশ্চিত করেছেন।'
সিঙ্গার জানান, ক্যাম্পবেল লিন্ডার সঙ্গে দেখা করেছিলেন কারণ তিনি লঁজারি ও সাঁতারের পোশাকের লাইন চালু করতে চাইছিলেন এবং এপস্টিন তাকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে তিনি সাহায্য করতে পারবেন। লিন্ডার আইনজীবী জানান, তার মক্কেল ভার্চুয়ালি যোগ দিয়েছিলেন এবং ওই মিটিং থেকে কোনো ফল আসেনি।
ওই বছরই ফ্রান্সের কানে ক্যাম্পবেলের ৪০তম জন্মদিনের সারপ্রাইজ পার্টিতে এপস্টিনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে সিঙ্গারের দাবি, তিনি অতিথি তালিকায় ছিলেন না এবং যাননি।
প্যারিসে ক্যাম্পবেলের ২৫ বছর পূর্তি উদযাপনেও এপস্টিনকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। জবাবে জানানো হয়েছিল, 'জেফরি আরও দুজনকে নিয়ে আসবেন।' সিঙ্গারের মতে, এপস্টিন ম্যাক্সওয়েলকে নিয়ে এসেছিলেন এবং মাত্র ২০ মিনিট ছিলেন।
তাদের সম্পর্ক শুধু পার্টিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০১০ সালে সহকারী গ্রফ এপস্টিনকে মেইল করে জানান, 'নাওমি ক্যাম্পবেল ফেসিয়াল করছেন এবং বলেছেন তিনি পরে কল ব্যাক করবেন।'
২০১৫ সালে ক্যাম্পবেল গ্রফকে মেইলে লেখেন, 'আমি জেফরির সঙ্গে দেখা করতে চাই।' শেষে লেখেন, 'এক্সহস্টেড বেবস' (খুবই ক্লান্ত)।
২০১৬ সালের এক ইমেইলে এপস্টিনের এক সহযোগী জানতে চান ক্যাম্পবেল 'বিমানটি' ব্যবহার করতে পারবেন কি না। পরে ওই একই মেইলে আরেক সহযোগীকে নির্দেশ দেওয়া হয় ক্যাম্পবেলের জন্য চার্টার বিমানের ব্যবস্থা করতে, যাতে তিনি 'আজ রাতে নিউ ইয়র্ক থেকে মিয়ামি গিয়ে শনি বা রবিবারে ফিরতে পারেন।'
সিঙ্গারের বিবৃতিতে বলা হয়, তার মক্কেল 'কয়েকবার এপস্টিনের বিমানে চড়েছেন, কিন্তু কখনো কোনো অনুপযুক্ত আচরণ দেখেননি।'
