পুতিনের কাছে দোনেৎস্কের বাকি অংশ দখল করা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত শান্তি আলোচনার জন্য রোববার আবুধাবিতে ফের মুখোমুখি হচ্ছেন রাশিয়া ও ইউক্রেনের আলোচকরা। তবে আলোচনায় অন্তত একটি মৌলিক ইস্যু এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে, তা হলো দোনেৎস্ক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ।
কয়েক মাস ধরে রুশ কর্মকর্তারা বলে আসছেন, কিয়েভের নিয়ন্ত্রণে থাকা দোনেৎস্ক অঞ্চলের ২,০৮২ বর্গমাইল এলাকা ইউক্রেন হস্তান্তর না করা পর্যন্ত মস্কো যুদ্ধ বন্ধ করবে না।
গত বুধবার সিনেটে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, দোনেৎস্ক অঞ্চলের বিষয়টি শান্তি আলোচনায় 'একমাত্র বাকি থাকা ইস্যু' হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, 'এটা এমন এক সেতু, যেটা আমরা এখনও পার হইনি।'
তবে এক দিন পর মস্কো এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে।
ক্রেমলিনের পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ বলেন, ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশগুলো যে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রস্তাব দিয়েছে, সেসবসহ আরও কিছু বিষয় এখনও নিষ্পত্তি করা বাকি রয়েছে।
তবু এটা স্পষ্ট যে, দোনেৎস্ক অঞ্চলের যে অংশটি এখনও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যার আয়তন যুক্তরাষ্ট্রের দেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যের চেয়েও ছোট, এটাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, ইউক্রেনের অন্যান্য যেসব ভূখণ্ডের ওপর মস্কো দাবি করেছে, সেগুলোর তুলনায় এই নির্দিষ্ট ভূখণ্ডটি নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কেন এতটা আগ্রহী?
প্রতীকী গুরুত্ব ও রাষ্ট্রীয় প্রচারণা
২০১৪ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকেই দোনেৎস্ক মস্কোর জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। পূর্ব ইউক্রেনের প্রধানত রুশভাষী শিল্পাঞ্চলটিকে বিচ্ছিন্ন করে পরে সংযুক্ত করার চেষ্টায় দোনেৎস্ক ছিল কেন্দ্রবিন্দু, যাকে ক্রেমলিন ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার অংশ হিসেবে অভিহিত করে।
দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলের জনগণকে 'রক্ষা' করার বয়ানকে কেন্দ্র করেই রাশিয়া তার রাষ্ট্রীয় প্রচারণার বড় অংশ গড়ে তুলেছে। এই দুটি অঞ্চলকে সম্মিলিতভাবে 'দনবাস' বলা হয়। এরই মধ্যে লুহানস্ক অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে রাশিয়া।
২০২২ সালের শেষ দিকে ক্রেমলিন ঘোষণা দেয়, তারা ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল—লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়া—সংযুক্ত করেছে।
রুশ আলোচকরা খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের যেসব অংশ এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, সেগুলো দখলের চেষ্টা কার্যত ছেড়ে দিয়েছে বলে মনে হয়। এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেন যদি দোনেৎস্কের একটি বড় অংশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়, তাহলে পুতিনের নিজ ঘাঁটির যুদ্ধপন্থী জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
দোনেৎস্ক অঞ্চলের যে অংশটি এখনও ইউক্রেনের দখলে রয়েছে, তার প্রতীকী গুরুত্বও কম নয়। এই অংশের মধ্যেই রয়েছে স্লোভিয়ানস্ক শহর, যেখানে ২০১৪ সালে মস্কো তথাকথিত রাশিয়াপন্থী 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' বিদ্রোহ শুরু করেছিল।
১২ বছর চেষ্টার পরও শহরটি দখলে নিতে ব্যর্থ হলে, যাকে রুশ প্রচারণায় 'রুশ বসন্তের আঁতুড়ঘর' বলা হয়, তা যুদ্ধপন্থী জাতীয়তাবাদীদের সমালোচনাকে আরও তীব্র করতে পারে।
দোনেৎস্কের বাকি অংশ দখল করতে পারলে পুতিন বিজয়ের একটি বয়ান দাঁড় করানোর সুযোগ পাবেন।
বার্লিনভিত্তিক থিংকট্যাংক কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের পরিচালক আলেক্সান্ডার গাবুয়েভ বলেন, আলোচনার মাধ্যমে দোনেৎস্ক অর্জন করতে পারলে পুতিন বিজয়ের একটি বয়ান দাঁড় করাতে পারবেন।
তিনি বলেন, এতে যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে রাশিয়ার পরাজয়ের ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
গাবুয়েভ আরও বলেন, কিয়েভ যদি এই ভূখণ্ড হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তা ইউক্রেনের ভেতরে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, কারণ গত ১২ বছর ধরে এই ভূমির জন্য দেশটির বহু সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।
তিনি বলেন, 'মানুষ এর জন্য রক্ত দিয়েছে। দনবাসে লড়াইয়ে বহু পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে। এখন আপনি সেটা ছেড়ে দিচ্ছেন? এটা ইউক্রেনের ঐক্যের নিচে রাখা একটি টাইম বোমা।'
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শুক্রবার বলেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে তিনি আপস করতে প্রস্তুত, তবে ইউক্রেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে কোনো আপস করবেন না।
ডিসেম্বরে জেলেনস্কি বলেন, কিয়েভের নিয়ন্ত্রণে থাকা দোনেৎস্ক অঞ্চলের অংশ থেকে সেনা প্রত্যাহার করে সেগুলোকে সামরিকমুক্ত অঞ্চল বানাতে তিনি প্রস্তুত।
তবে এর বিনিময়ে রাশিয়াকেও দোনেৎস্কের সমপরিমাণ এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।
'অ্যাঙ্কোরেজ সূত্র'
গত গ্রীষ্মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগ অচলাবস্থায় পড়লে, তার প্রশাসন দোনেৎস্ককে ঘিরে একটি ভূখণ্ড বিনিময়ের প্রস্তাব তোলে, যাতে ক্রেমলিনের সঙ্গে আলোচনা নতুন করে গতি পায়।
ওই প্রস্তাব নিয়ে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ মস্কো সফর করলে পুতিন ইতিবাচক সাড়া দেন। এর ধারাবাহিকতায় গত আগস্টে অ্যাঙ্কোরেজে একটি শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
আলাস্কায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ঠিক কোন বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন একমত হয়েছিলেন, তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে এরপর থেকে রুশ নেতারা বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়েই বলে আসছেন, যেকোনো শান্তি চুক্তি অবশ্যই 'অ্যাঙ্কোরেজের চেতনা' বা 'অ্যাঙ্কোরেজ সূত্র' অনুসরণ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই শব্দগুচ্ছটি আলাস্কায় ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের করা একটি সমঝোতার সংক্ষিপ্ত রূপ। সে অনুযায়ী, ইউক্রেন যদি দোনেৎস্ক অঞ্চলের বাকি অংশ হস্তান্তর করে এবং আরও কিছু দাবিতে সম্মত হয়, তাহলে রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ করবে।
তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এতে সম্মত হননি।
তিনি বলেন, ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী, দেশব্যাপী গণভোট ছাড়া কোনো ভূখণ্ড ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়।
এই ইস্যুটি পরে নতুনভাবে উঠে আসে গত শরতে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকদের তৈরি করা ২৮ দফা পরিকল্পনায়। এই পরিকল্পনা প্রণয়নে পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভের মতামতও নেওয়া হয়েছিল।
ওই পরিকল্পনায় প্রস্তাব করা হয়, ইউক্রেনীয় বাহিনী দোনেৎস্ক অঞ্চলের যে অংশটি এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখান থেকে সরে যাবে এবং সেখানে একটি 'নিরপেক্ষ সামরিকমুক্ত বাফার জোন' গঠন করা হবে। অঞ্চলটি আন্তর্জাতিকভাবে রুশ ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি পাবে, তবে সেখানে রুশ সেনা মোতায়েনের অনুমতি থাকবে না।
আলাস্কায় ট্রাম্পের সঙ্গে এই প্রস্তাবে সম্মত হওয়ায়, পুতিন মনে করতে পারেন যে এর কোনো পরিবর্তন হলে তা তার জন্য ক্ষতিকর সমঝোতা হিসেবে বিবেচিত হবে।
র্যান্ড করপোরেশনের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিজ্ঞানী স্যাম চারাপ বলেন, রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে এমন একটি প্রস্তাব পরে প্রত্যাহার হওয়া গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
তবে সমস্যা হলো, ইউক্রেন কখনোই এই প্রস্তাবে সম্মত হয়নি।
প্রতিরক্ষা ও পানির সংকট
দোনেৎস্ক অঞ্চলের যে অংশটি এখনও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তা সামনের সারির সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকাগুলোর একটি। কারণ এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল ২০১৪ সালে, রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর অনেক আগেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিরক্ষা হারালে ভবিষ্যতে রাশিয়ার যেকোনো নতুন হামলার ক্ষেত্রে ইউক্রেন আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। শান্তিচুক্তি ব্যর্থ হলে, এতে মস্কোর জন্য নতুন করে আগ্রাসন চালানো সহজ হতে পারে।
এদিকে, রাশিয়ার দখলে থাকা দোনেৎস্ক শহর—গত বছর তীব্র পানিসংকটে পড়েছিল এবং এখনও পানি ঘাটতির সমস্যায় ভুগছে।
দোনেৎস্ক অঞ্চলে পানি সরবরাহকারী সিভেরস্কি দোনেৎস–দোনবাস ক্যানাল ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরুতেই ধ্বংস হয়ে যায়। এই খালটির উৎস স্লোভিয়ানস্ক শহরের উত্তর-পূর্বে, যা এখনও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ডিসেম্বরে এক ফোন-ইন সংবাদ সম্মেলনে পানিসংকট নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পুতিন বলেন, প্রধান পানি আহরণ কেন্দ্রটি 'দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও শত্রুর নিয়ন্ত্রণে' রয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, 'এই ভূখণ্ড আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এলে' সমস্যার 'মৌলিক সমাধান' সম্ভব হবে।
