ইরানের তেল নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর ১১৬ ডলার ছুঁয়েছে ব্রেন্ট ক্রুডের দর
'ইরানের তেল সম্পদ কবজা করতে চান' —যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পরেই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের দর ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলারে পৌঁছেছে।
সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য সূচক প্রায় প্রায় ২% বেড়ে যায়। তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে ট্রাম্প ইরানের রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখল করতে পারেন এই খবরও দাম চড়ার পেছনে ভূমিকা রাখে।
রোববার (যুক্তরাষ্ট্র সময়) ব্রিটিশ দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমসস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, "সত্যি বলতে, আমার সবচেয়ে পছন্দের বিষয় হলো ইরানের তেল নিয়ে নেওয়া, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কিছু বোকা মানুষ প্রশ্ন তোলে—'কেন এটা করছ?' তারা আসলে বোকার মতো কথা বলছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা হয়তো খারগ দ্বীপ (দখলে) নেব, হয়তো নেব না। আমাদের অনেক বিকল্প আছে।"
এই পরিস্থিতিতে, এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে তীব্র পতন দেখা গেছে। কারণ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির ঝুঁকি বেশি এই মহাদেশেই। প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে জাপানের নিক্কেই-২২৫ বাজারসূচক ৩ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারসূচক কস্পি ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ কমেছে। হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচক প্রায় ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ইউরোপীয় বাজারেও সোমবার দিনের শুরুতে মিশ্র প্রবণতা দেখা যায়। স্টোক্সএক্স ইউরোপ-৬০০ সূচক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমলেও যুক্তরাজ্যের ব্লু চিপ কোম্পানিগুলোর এফটিএসই-১০০ সূচক শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে খনিশিল্প কোম্পানিগুলোর শেয়ারের উত্থান ভূমিকা রেখেছে।
সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কায় ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়েছে। ডাচ মাসিক ফিউচার প্রায় ১.৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৫৫ ইউরোর ওপরে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে আরও সাড়ে তিন হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েনের পর।
ইয়েমেনের হুথিরাও এখন সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে এবং ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যা যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত ও জ্বালানি সংকটকে গভীরতর করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ডয়চে ব্যাংক-এর বিশ্লেষকরা বলেন, "সংঘাতের দ্রুত সমাপ্তির কোনো ইঙ্গিত নেই, আর খবরের বিভিন্ন শিরোনাম পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করছে—ফলে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।"
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ তেলের দামকে ঐতিহাসিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মার্চের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৫৯ শতাংশ বেড়েছে। এই উত্থান ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে ইরাকের কুয়েত আক্রমণের পর রেকর্ড ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সোমবার জ্বালানি কোম্পানি শেল, বিপি এবং ইকুইনোর-এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। বৈঠকে হরমুজ প্রণালি অবরোধজনিত সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে।
মার্চ মাসে ব্রেন্ট ক্রুড সর্বোচ্চ ১১৯.৫০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল, যা ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ। এর পেছনে ইরানের কার্যত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার ভূমিকা রয়েছে। এই প্রণালি দিয়েই সাধারণত বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানি করা হয়।
বিশ্লেষক সংস্থা-সুইসকোট এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ইপেক ওজকারদেস্কায়া বলেন, "যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হলে তেলের দাম ১৫০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে—এমন ধারণাও রয়েছে। তবে দাম এত বেশি হলে তেলের চাহিদা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যারেলপ্রতি ১২০-১৩০ ডলারের উপরে গেলে বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি বাড়বে এবং তখন দাম বৃদ্ধির চাপ কমে আসবে।"
তিনি আরও জানান, ইরান সপ্তাহান্তে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন স্থাপনায় হামলা চালানোর পর এশিয়ায় অ্যালুমিনিয়ামের দামও ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস জি-৭ জোটের দেশগুলোর প্রতি দ্রুত পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানাতে পারেন, যাতে তেল ও গ্যাসের বৈশ্বিক দামের ধাক্কা থেকে অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া যায়।
