পাকিস্তানে ইমরান খান ছাড়াও যাদের ভিন্নমত দমন করছে সেনাবাহিনী
পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে পাঁচ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কোনো দর্শনার্থীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি বলে দোবি করেছেন তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)।
ইমরান খানের বার্তা বিশ্বের কাছে পৌঁছানো বন্ধ করার জন্যই এটি করা হয়েছে বলে দাবি তার পরিবারের।
তারা দেশটির সামরিক প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তবে দেশটির সরকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
তাদের দাবি, কারাগারে 'রাজনীতি নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ'। ইমরান খান কারাগারের এই নিয়ম ভঙ্গ করেছিলেন বলেই সাক্ষাৎ বন্ধ করা হয়েছে।
এভাবে ইমরান খানকে চুপ করানোও হতে পারে, তবে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি নন যিনি চাপের মুখে রয়েছেন।
পাকিস্তানের সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, রাষ্ট্রের সাথে দ্বিমত পোষণের সুযোগ ক্রমশ সীমিত হচ্ছে এবং ঝুঁকিও বাড়ছে।
গত সপ্তাহের শেষের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে মানবাধিকার আইনজীবী ইমান মাজারি এবং তার স্বামীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এই দম্পতিকে ১০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সাজা ঘোষণার আগে, পাকিস্তানকে 'ভিন্নমত দমন করা এবং মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা ব্যক্তিদের ভয় দেখানোর জন্য জবরদস্তিমূলক কৌশল'- বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
সাধারণ মানুষের মন থেকে তাকে মুছে ফেলার চেষ্টারও স্পষ্ট অভিযোগ তুলেছে ইমরান খানের পরিবার।
তার বোন আলিমা খানম বিবিসিকে বলেন, 'টেলিভিশনে দুটি নাম থাকতে পারে না। ইমরান খান সম্পর্কে ভালো কিছু বলা যাবে না, আর আসিম মুনির সম্পর্কে খারাপ কিছু বলা যাবে না।'
সম্প্রতি রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগার থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সমর্থকদের বিক্ষোভে এ কথা বলেন তিনি।
তার দল বলছে, সর্বশেষ গত আট সপ্তাহ আগে ইমরান খানকে নিজের পরিবারের একজন সদস্যের সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়। এরপর আট সপ্তাহেরও বেশি সময় পেরিয়েছে।
এছাড়া একজন আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাতেরও পাঁচ সপ্তাহেরও বেশি সময় হয়ে গেছে, সেটিও হয়েছিল মাত্র আট মিনিটের জন্য।
আলিমা খানম বলেন, 'এখন আমাদের কাছে চাপ তৈরি করাই একমাত্র উপায়, যাতে আমরা তার সঙ্গে দেখা করতে পারি।'
তিনি বলেন, 'তার আইনজীবীদের এবং পরিবারের সঙ্গে দেখা করা তার অধিকার। এটি বাইরের জগতের সঙ্গে তার যোগাযোগের উপায়।'
কারাগারের ভেতরে বৈঠকের পর ইমরান খানের বক্তব্য মাঝেমধ্যেই তার এক্স অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা হতো। যা তার নামেই লেখা হতো এবং এর মাধ্যমে তার দল ও সমর্থকরা নানা নির্দেশনা পেত।
আলিমা খানম বলেন, 'তারা তার কণ্ঠস্বর আটকাতে পারছে না, কারণ মানুষ তাকে শুনতে চায়, তারা তার বার্তা পড়ে, তারা তাকে ছেড়ে দিচ্ছে না।'
কিন্তু আপাতত বৈঠক বন্ধ থাকায়, সেই বার্তাগুলোও এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে কারাবন্দি ইমরান খান বেশ কয়েকটি দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তার দাবি এসব মামলা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
যদিও ইমরান খানকে বিচ্ছিন্ন রাখার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাল চৌধুরী তাকে জিমের সরঞ্জাম পাওয়া এবং একজন রাঁধুনিসহ 'পাকিস্তানের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত বন্দি' বলে অভিহিত করেছেন।
ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে 'মানসিকভাবে অস্থির ব্যক্তি' বলে অভিহিত করে ইমরান খানের এক্স অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট প্রকাশিত হওয়ার পর, সামরিক মুখপাত্র পাকিস্তানের গণমাধ্যমে দুই ঘণ্টার একটি সংবাদ সম্মেলন করেন।
যেখানে তিনি বলেন, রাজনীতির বাইরে গিয়ে ইমরান খান তাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, 'অনেকে যুক্তি দিতে পারেন যে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সত্যিই বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছে, যা দেশটিকে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের বেশ কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। বেসামরিক শাসন চলা কালে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ দমন-পীড়ন।'
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, যাকে প্রায়শইএকটি 'প্রতিষ্ঠান'ও বলা হয়, দেশের রাজনীতিতে একটি চিরস্থায়ী উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে সামরিক একনায়কতন্ত্রের একটি পর্বও রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে ইমরান খান এবং সেনাবাহিনীকে বেশ ঘনিষ্ঠ বলে মনে হয়েছিল। অনেকে এও বিশ্বাস করেন, সেনাবাহিনীর সমর্থন ইমরান খানকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করেছিল।
সেই সময় বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর প্রতি আকৃষ্ট থাকার অভিযোগও তুলেছিল। যদিও তা অস্বীকার করেছিল পিটিআই।
২০২২ সালে যখন ইমরান খানকে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, তখন তিনি কেবল সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গেই বিরোধিতা করেননি, বরং তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের জন্য তাদেরকেই দায়ী করেছিলেন।
২০২৫ সালের নভেম্বরে এক সাংবিধানিক সংশোধনী আসিম মুনিরকে পাকিস্তানের সব প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিচার এবং তত্ত্বাবধান থেকে আজীবন দায়মুক্তি দেয়।
তবে এই সিদ্ধান্তটিকে বেসামরিক সরকারের অধীনে পাকিস্তানের উপর সামরিক বাহিনীর প্রভাব চরম পর্যায়ে পৌঁছেনোর নজির হিসেবেই দেখেছিলেন অনেকে।
বর্তমান সরকার অবশ্য সেনাবাহিনীর দায় অস্বীকার করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেন, 'বেসামরিক সরকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আমরা সবাই হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছি। প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান "একটি অসাধারণ কাজ করছেন।'
নিরাপত্তা সূত্রগুলোও জানিয়েছে, দেশটির 'সেনাবাহিনী সব সময় আইনি সীমার মধ্যে থেকেই কাজ করছে।'
কিন্তু রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা এবং কথা বলার সুযোগের মধ্যে একটি সংযোগ দেখেন মাইকেল কুগেলম্যান এবং অন্যরা।
সাংবাদিক এবং পাকিস্তানের মানবাধিকার কাউন্সিলের সহ-সভাপতি মুনিজা জাহাঙ্গীর বলেন, 'এটি একটি গণতান্ত্রিক সরকার কতটা শক্তিশালী বা দুর্বল এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেমন তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।'
তিনি বলেন, 'যদি সেনাবাহিনী বেশি প্রভাবশালী হয়, তাহলে প্রতিবাদের জায়গা কম থাকবে, ভিন্নমত পোষণের জায়গা কম থাকবে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা কম থাকবে।'
এখন পর্যন্ত যাদেরকে কারাবন্দি করা হয়েছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মুখ মাজারী। পাকিস্তানের সবচেয়ে সংবেদনশীল কিছু মামলায় কাজ করা একজন আইনজীবী তিনি।
মাজারী এবং তার স্বামী হাদি আলী চাট্টাকে 'সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বার্তা প্রচারের' দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, 'যেমন কর্ম, তেমন ফল!'
তালাল চৌধুরী বলেন, 'আইন ভঙ্গকে গণতন্ত্র বা মানবাধিকার হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা সম্পূর্ণ ভুল।'
মানবাধিকার বিষয়ক অন্যান্য অধিকারকর্মীরা বিবিসিকে বলেছেন, তাদের কাজের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এইচআরসিপি জানিয়েছে, তাদের কর্মীদের ফোনে হয়রানি করা হয়েছে এবং আগাম অনুমতি না নিলে হোটেলে গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করতে তাদের বাধা দেওয়া হয়েছে।
যদিও সরকারের দাবি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এটি করা হয়েছে।
সাংবাদিকরাও বলছেন, তারাও চাপের শিকার হয়েছেন।
২০২৩ সালে বিবিসি জানিয়েছিল, টিভি চ্যানেলগুলোকে ইমরান খানের মুখ, তার কণ্ঠস্বর কিংবা তার নামও প্রচার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বিবিসিকে সাংবাদিকরা বলেছেন, কোন বিষয়গুলো কাভার করা যাবে না, তার তালিকাও এরপর থেকে আরও বেড়েছে।
জিও টিভির রিপোর্টার আজাজ সাঈদ বলেন, 'তারা (পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ) মূলধারার গণমাধ্যমকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।'
তিনি বলেন, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সামান্য সম্পর্ক আছে—এমন খবরও, যেমন সম্প্রতি প্রতিরক্ষা গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ নিয়ে করা একটি প্রতিবেদন—তারপরই অজানা নম্বর থেকে ফোন এসে সতর্ক করা হয়েছে যেন আর এগোনো না হয়।
জাহাঙ্গীর বলেছেন, সম্পাদকরাও কখনো কখনো তাকে নির্দিষ্ট কিছু খবর কাভার না করতে বলেছেন।
তিনি বলেন, 'সম্পাদকরা এটি মজা করার জন্য করছেন না। তারা মূলত মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। কিন্তু টিকে থাকার জন্যই তারা এটি করছেন।'
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্যান্য গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা বিবিসিকে বলেছেন, এখন নিউজরুমগুলোতে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ একটি সাধারণ চর্চায় পরিণত হয়েছে।
তাদের একজন বলেন, 'অতীতে এমন সময় ছিল যখন সম্পূর্ণ সেন্সরশিপ ছিল। এখন আত্মনিয়ন্ত্রণ চলছে, যা অনেক দিক থেকেই খারাপ। কারণ আমরা নিজেরাই দর্শকদের প্রতারিত করছি।'
বিবিসি মন্তব্যের জন্য সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।
নিরাপত্তা সংস্থার একাধিক সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, আইএসপিআর—সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ শাখা 'গণমাধ্যমের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে না, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে না, বেসামরিক সাংবাদিকতায় হস্তক্ষেপ করে না এবং তার আইনসম্মত যোগাযোগমূলক ভূমিকার বাইরে জনপরিসরের আলোচনা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ক্ষমতাও তাদের নেই।'
পাকিস্তানের প্রাচীনতম পত্রিকা ডন—যা ১৯৪১ সালে দেশের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর হাতে প্রতিষ্ঠিত—তার প্রতিবেদনের জন্য আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ডিসেম্বর মাসে ডন মিডিয়া গ্রুপ জানায়, হঠাৎ করে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; প্রথমে পত্রিকায়, পরে তাদের টিভি ও রেডিও মাধ্যমে।
সংবাদপত্র সম্পাদকদের পরিষদ বলেছে, এ সিদ্ধান্ত 'প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে'।
সম্পাদকদের পরিষদ জানায়, 'রাষ্ট্রের ভেতরের কেউ কেউ হয়তো মনে করেন, নিয়ম মেনে না চলা গণমাধ্যমকে শাস্তি দিলে সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বর দমে যাবে, কিন্তু আধুনিক যুগে এটি কার্যত অসম্ভব।'
তথ্যমন্ত্রী আতা তারার ডনকে সরকারি বিজ্ঞাপন থেকে বঞ্চিত করার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
একাধিক সাংবাদিক বলেছেন, ২০২৫ সালের শুরুতে পাকিস্তানের প্রিভেনশন অব ইলেকট্রনিক ক্রাইমস অ্যাক্টে আনা পরিবর্তন পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে সেই 'ডিজিটাল সন্ত্রাসবাদ' মোকাবিলায়, যাকে সামরিক বাহিনী বহুবার উল্লেখ করেছে—অর্থাৎ রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে 'অরাজকতা ও ভুয়া তথ্য' ছড়ানো।
নিরাপত্তা সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, দেশের সংবিধান যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতার আওতায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেন, 'পাকিস্তান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করে—এ দাবি ভিত্তিহীন।'
তিনি উদাহরণ হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে আর্থিক জালিয়াতি ও সন্ত্রাসী নিয়োগের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, 'আমরা সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়মের মধ্যে আনতে চাই, গোটা দুনিয়াই এটি করছে।'
কিন্তু অন্যরা বলছেন, এসব নিয়ম সাংবাদিকদের রিপোর্টিংয়ের ক্ষমতা সীমিত করতে ব্যবহৃত হতে পারে।
ইসলামাবাদভিত্তিক গণমাধ্যম বিশ্লেষক আদনান রেহমাত বলেন, 'আইনে পরিবর্তন এনে এখন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করা, বিচার বিভাগের সমালোচনা করাকে স্পষ্টতই অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং জাতীয় স্বার্থের সংজ্ঞা আরও অস্পষ্ট হয়েছে। জরিমানার অঙ্ক বিস্ময়করভাবে বেশি এবং শাস্তিও অসমভাবে বাড়ানো হয়েছে।'
তিনি বলেন, একটি হচ্ছে আনুষ্ঠানিক নিয়ম, পাশাপাশি রয়েছে আরও কিছু অলিখিত নিয়ম, 'সীমাটা কোথায়, তা বোঝা খুবই কঠিন—এটি সবসময় পরিবর্তিত হচ্ছে'।
পাকিস্তানে সাংবাদিকদের ওপর কড়াকড়ি নতুন নয়। ইমরান খানের সরকার আমলেও সাংবাদিকরা প্রকাশনা ও সম্প্রচারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন।
সাঈদ বর্তমান পরিস্থিতিকে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেন।
জাহাঙ্গীরও ইতিহাসের ধারাবাহিকতার কিছু অংশ দেখেন জানিয়ে বলেন, 'আমি বলতে পারি না এটি সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল। তবে এটুকু বলা যায়, আমাদের জন্য পরিস্থিতি ভালোও হয়নি।'
সমালোচকদের সীমিত করা ও ভয় দেখানোর প্রচেষ্টা আগেও হয়েছে, তবে কেউ কেউ মনে করেন এবার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক সংঘাত, অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা নিয়ে কাজ করা এক গবেষণার পরিচালক আজিমা চীমা বলেন, 'মনে হচ্ছে কিছু একটা বদলে গেছে।'
তিনি বলেন, 'কারণ এবার আদালতকে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠান-বহির্ভূত পন্থা নয় এটি।'
পাকিস্তানের বাইরে অনলাইনে কাজ করা ব্যক্তিরাও কর্তৃপক্ষের নজরে আছেন।
জানুয়ারির শুরুতে সাতজন পাকিস্তানি সাংবাদিক ও ইউটিউবার—যাদের মধ্যে দুইজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা—তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার শেষে 'ডিজিটাল সন্ত্রাসবাদ'-এর অভিযোগে যাবজ্জীবন দণ্ড পান।
২০২৩ সালের ৯ই মে ইমরান খানের প্রথম গ্রেপ্তারের পর হওয়া বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে অভিযোগ আনা হয় যে তারা 'রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা' ও 'উসকানি' দিয়েছেন।
এক্স-এ এক পোস্টে দণ্ডপ্রাপ্তদের একজন আদিল রাজা লিখেছেন, 'ক্ষমতাবানদের সামনে সত্য বলাকে এখন পাকিস্তানে ডিজিটাল সন্ত্রাসবাদ বলা হচ্ছে।'
সাঈদ ও চীমা উভয়েই এ ঘটনাকে কঠোর শাস্তির একটি বিশেষ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
চীমা বলেন, 'ধীরে ধীরে একটি উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে রাষ্ট্র অত্যধিকভাবে এবং বিন্দুমাত্র দুঃখপ্রকাশ না করে কঠোর শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুত।'
এরপর সেই কঠোরতা কার ওপর নেমে আসবে—এটাই এখন অনেকে বোঝার চেষ্টা করছেন।
