মার্কিন ডলারের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন; আরও কমার আভাস; কিন্তু কেন?
২০২৫ সালটি শুরু হয়েছিল নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর ডলারের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। এরপর মুদ্রাবাজারের ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, পরিস্থিতি হয়তো কিছুটা শান্ত হয়ে আসবে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের চিত্র সেই স্বস্তি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
গত মঙ্গলবার বিভিন্ন মুদ্রার ঝুড়িতে ডলারের মান গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডের বিপরীতে ডলারের দর ছিল কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। মাত্র এক সপ্তাহেই ডলারের মান কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ।
গত দু-এক দিনে এই পতনের গতি কিছুটা কমলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এই স্বস্তি সাময়িক। ডাচ ব্যাংক আইএনজির আর্থিক বাজার গবেষণা বিভাগের প্রধান ক্রিস টার্নার বলেন, 'বেশির ভাগ মানুষই মনে করছেন এই বছর ডলারের মান আরও কমবে। পতনটা কখন ঘটবে তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ডলার যে দুর্বল হচ্ছে—তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।'
ডলার দুর্বল হওয়ার অর্থ হলো আমেরিকানদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। বিদেশ ভ্রমণে যাওয়া আমেরিকানরা ইতিমধ্যে এই ধাক্কা টের পেতে শুরু করেছেন। ডলারের এই দরপতন অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ আমদানিকৃত পণ্য কিনতে মার্কিনিদের আগের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করতে হবে।
ডলারের এই পতন আরও একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। গত কয়েক দশক ধরে বিশ্ববাজারের প্রধান মুদ্রা হিসেবে ডলারের যে একক আধিপত্য ছিল, তা কি এখন হুমকির মুখে? এই আধিপত্যের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এত দিন বিশ্ববাজার থেকে তুলনামূলক কম খরচে ঋণ পাওয়ার সুবিধা ভোগ করে আসছে।
কিন্তু হঠাৎ কেন ডলারের এই দরপতন এবং এর প্রভাবই বা কী হতে যাচ্ছে?
গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্ববাজারে ডলার ছিল বেশ শক্তিশালী। বিশেষ করে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ডলারের মান দ্রুত বেড়েছিল। অতিমারি-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সুদের হার বেশি থাকায় বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলারের চাহিদা ছিল তুঙ্গে।
তবে গত বছর বিভিন্ন মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান নির্দেশক সূচক প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। ২০১৭ সালের পর ডলারের এমন করুণ দশা আর দেখা যায়নি। গত বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের 'লিবারেশন ডে' উপলক্ষে শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর থেকেই ডলারের এই বড় পতন শুরু হয়।
চলতি মাসে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা বাড়ার পর ডলারের মান আরও কমেছে। এছাড়া বাজারজুড়ে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে, ডলারকে আরও দুর্বল করতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। জাপানি মুদ্রা ইয়েনকে শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান মিলে ডলার বিক্রি করে দিতে পারে—এমন আলোচনাও ডলারের দরপতনে ভূমিকা রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের এই দরপতনের পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের সাবেক কৌশলবিদ এবং ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো রবিন ব্রুকস বলেন, 'বাজার আসলে ট্রাম্প প্রশাসনের অগোছালো ও অস্থির নীতির প্রতিক্রিয়ায় এভাবে সাড়া দিচ্ছে। এই তারা কঠোর হচ্ছে, আবার পরক্ষণেই নরম হচ্ছে।' শুল্ক নীতি এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিতর্কের দিকে আঙুল তুলে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
রবিন ব্রুকসের মতে, ডলারের এই পতন মূলত বাজারের একটি বার্তা। বাজার বলতে চাইছে, 'যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশৃঙ্খল বা অস্থির অবস্থান অন্য কারও চেয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই বেশি ক্ষতি বয়ে আনছে।'
তবে ডলারের এই পতনের পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো বিদেশের বাজারে বিনিয়োগের ভালো সুযোগ তৈরি হওয়া। এছাড়া সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জাপানের বন্ড বাজারে বড় ধরনের ধস বা শেয়ার বিক্রির হিড়িক ডলারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
জাপানি বন্ড বাজারের এই অস্থিরতার কারণে অনেক ব্যবসায়ী ডলার ও ইয়েনের বিনিময় মূল্যের পার্থক্যের সুযোগ নিয়ে করা (ক্যারি ট্রেড) তাদের পুরোনো বিনিয়োগগুলো তুলে নিতে শুরু করেছেন। এতে ডলারের বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
অবশ্য চলতি সপ্তাহে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জাপানি ইয়েনকে সহায়তা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের খবর অস্বীকার করেছেন। তার এই বক্তব্যে ডলারের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন পরবর্তীতে কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, তা নিয়ে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, যা ডলারের ভবিষ্যৎকে কিছুটা ঝাপসা করে তুলছে।
