গাজায় থাকা সর্বশেষ জিম্মির দেহাবশেষ উদ্ধারের কথা জানাল ইসরায়েল
গাজা উপত্যকায় থাকা সর্বশেষ ইসরায়েলি বন্দি রান গিভিলির দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এর ফলে গত অক্টোবরে সই হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়ার পথ উন্মুক্ত হলো।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আভিখাই আদ্রায়ি বলেন, 'ইসরায়েল পুলিশ ও সামরিক র্যাবাইনেটের সহযোগিতায় ন্যাশনাল সেন্টার অব ফরেনসিক মেডিসিনে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এরপর সামরিক প্রতিনিধিরা প্রয়াত রান গিভিলির পরিবারকে জানিয়েছেন, দাফনের জন্য তার মরদেহ ফিরিয়ে আনা হয়েছে।'
আদ্রায়ি আরও বলেন, 'এর মধ্য দিয়ে গাজা উপত্যকায় আটক থাকা সব জিম্মিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলো।'
ধারণা করা হয়, ইসরায়েলি পুলিশ সদস্য গিভিলি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার সময় নিহত হন। তার মরদেহ ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মৃত বা জীবিত মোট ২৫১ জনকে ইসরায়েলে ফেরত দেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা হামাসের ছিল, তা সম্পন্ন হলো।
সোমবার দিনের শেষভাগে মধ্য গাজার আল-আকসা শহীদ হাসপাতাল জানিয়েছে, ইসরায়েলের মুক্তি দেওয়া নয়জন জীবিত ফিলিস্তিনি বন্দি তাদের কাছে পৌঁছেছেন।
এক বিবৃতিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, 'দখলদার বাহিনী আজ মুক্তি দেওয়ার পর রেড ক্রসের মাধ্যমে গাজার নয়জন ফিলিস্তিনি বন্দি কিছুক্ষণ আগে হাসপাতালে পৌঁছেছেন।'
যুদ্ধবিরতির শর্ত পুরোপুরি মানার আহ্বান হামাসের
গাভিলির মরদেহ উদ্ধারের পর এক বিবৃতিতে হামাস জানায়, এ ঘটনা যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপে তাদের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি 'জোরালোভাবে প্রমাণ করে'। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হামাস 'স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীলভাবে তাদের সব বাধ্যবাধকতা পূরণ করেছে'।
হামাসের ভাষ্য, 'বিনিময়ে আমরা জোর দিয়ে বলছি যে, [ইসরায়েলকে] অবশ্যই যুদ্ধবিরতি চুক্তির সব বিধান কোনো কাটছাঁট বা বিলম্ব ছাড়াই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এর ফলে সৃষ্ট সব দায়বদ্ধতা মেনে চলতে হবে।'
বিবৃতিতে বিশেষভাবে রাফাহ ক্রসিং কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই উভয় দিক থেকে খুলে দেওয়া, গাজা উপত্যকায় প্রয়োজনীয় সামগ্রী পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া, কোনো কিছুর ওপর নিষেধাজ্ঞা না রাখা, গাজা উপত্যকা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার এবং অঞ্চলটির প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় কমিটির কাজ সহজতর করার দাবি জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির আওতায় ইসরায়েলে ফেরত পাঠানোর জন্য সর্বশেষ বন্দির মরদেহ কোথায় থাকতে পারে—সে বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীদের 'সব তথ্য' দেওয়া হয়েছে বলে হামাসের সামরিক শাখা জানানোর পরই এই ঘোষণা আসে।
সর্বশেষ বন্দিকে ফিরিয়ে আনাকে স্বাগত জানিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে 'ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্য অসাধারণ অর্জন' বলে অভিহিত করেন।
গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক হিন্দ খুদারি জানান, শেষ বন্দি ফেরত যাওয়ার ঘটনাটি 'ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত'।
তিনি বলেন, 'এখন মাঠপর্যায়ে অনেক পরিবর্তন আসা উচিত—রাফাহ ক্রসিং খুলে দেওয়া, গাজা উপত্যকায় পুনর্নির্মাণ সামগ্রী প্রবেশের অনুমতি দেওয়া এবং ইয়েলো লাইন থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা, যাতে ফিলিস্তিনিরা সেখানে গিয়ে তাদের ঘরবাড়ি ও লাইনের ওপারের সবকিছু দেখতে পারে।'
খুদারি আরও বলেন, 'অবশ্যই, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিদিন ৬০০টি [ত্রাণবাহী] ট্রাক গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার চুক্তি। অথচ বাস্তবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৩০টি ট্রাকই প্রবেশ করেছে।'
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে সব বন্দিকে ফেরত না পাওয়ার অজুহাতে যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে বিলম্বকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে আসছিল। তবে এখন আর 'সে যুক্তির কোনো ভিত্তি নেই'।
এর আগে ইসরায়েল জানিয়েছিল, শেষ বন্দিকে খুঁজে পাওয়ার পরই তারা গাজা ও মিশরের সংযোগকারী রাফাহ ক্রসিং খুলে দেবে। তবে একই সঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলেছে, ক্রসিংটি 'শুধুমাত্র মানুষের যাতায়াতের জন্য সীমিত পরিসরে' খোলা হবে।
এদিকে দুই সপ্তাহ আগে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ঘোষণা দেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করা হয়েছে। এই ধাপে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া হবে।
