ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫,০০০ ডলার ছাড়াল
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে এই মূল্যবান ধাতুর দাম ৬০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার পর এই ঐতিহাসিক রেকর্ড তৈরি হলো। খবর বিবিসি'র।
গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা এবং আর্থিক ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এই দাম বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতিও বাজারকে উদ্বিগ্ন করেছে। গত শনিবার তিনি হুমকি দেন, যদি কানাডা চীনের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য চুক্তি করে, তবে তিনি দেশটির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন।
অনিশ্চয়তার সময় বিনিয়োগকারীরা সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুকে 'নিরাপদ সম্পদ' হিসেবে বিবেচনা করেন। গত শুক্রবার রূপার দামও প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত বছর প্রায় ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
মূল্যবান ধাতুর এই আকাশছোঁয়া চাহিদার পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মার্কিন ডলারের দুর্বল অবস্থান এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার প্রবণতা।
এছাড়া ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ এ বছর আবারও সুদের হার কমাতে পারে। পাশাপাশি ইউক্রেন ও গাজা সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনাও সোনার দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে।
সোনার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর আপেক্ষিক দুষ্প্রাপ্যতা। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে মাত্র ২ লাখ ১৬ হাজার ২৬৫ টন সোনা খনি থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। এই পরিমাণ সোনা দিয়ে বড়জোর ৩–৪টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুল ভর্তি করা সম্ভব। খনি শিল্পের উন্নত প্রযুক্তি এবং নতুন খনি আবিষ্কারের কারণে ১৯৫০ সালের পর থেকেই এর সিংহভাগ উত্তোলন করা হয়েছে।
মার্কিন জিওলজিক্যাল সার্ভের অনুমান অনুযায়ী, মাটির নিচে আরও প্রায় ৬৪ হাজার সোনা মজুত রয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছরগুলোতে সোনার বৈশ্বিক সরবরাহ একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে এসে থমকে যেতে পারে।
এবিসি রিফাইনারির প্রাতিষ্ঠানিক বাজার বিভাগের প্রধান নিকোলাস ফ্র্যাপেল বলেন, 'যখন আপনি সোনার মালিক হন, তখন এটি অন্য কারও ঋণের সঙ্গে জড়িত থাকে না, যেমনটা বন্ড বা শেয়ারের ক্ষেত্রে হয়। শেয়ারের পারফরম্যান্স কোম্পানির ওপর নির্ভর করে, কিন্তু সোনা তেমন নয়।'
তিনি আরও বলেন, 'এই চরম অনিশ্চিত বিশ্বে বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনতে সোনা একটি অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম।'
২০২৫ সাল সোনার বাজারের জন্য এক অভিনব বছর ছিল। ১৯৭৯ সালের পর এবারই সোনা বার্ষিক সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে এই মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝুঁকেছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্পর্কিত শেয়ারের অতিরিক্ত দাম নিয়ে আশঙ্কার কারণে আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে সোনার দাম বারবার নতুন রেকর্ড গড়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান মেটালস ফোকাস-এর নিকোস কাভলিস বলেন, 'আমার মনে হয় এর একটি বড় কারণ হলো মার্কিন নীতি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা।'
অর্থনৈতিক উদ্বেগের পাশাপাশি সুদের হার কমার সম্ভাবনা থাকলেও সোনার দাম বাড়ে। সাধারণত সুদের হার কমলে বন্ডের মতো খাতে মুনাফা কমে যায়, তাই বিনিয়োগকারীরা সোনা ও রুপার মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে নজর দেন।
শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীই নয়, ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও তাদের মজুদে শত শত টন সোনা যোগ করেছে।
কাভলিস বলেন, 'মার্কিন ডলার থেকে সরে আসার একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা সোনার দাম বৃদ্ধিতে দারুণ সাহায্য করছে।'
এ বছরের শুরুতেও সোনার দাম বাড়ার প্রবণতা বজায় রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ ফ্র্যাপেল সতর্ক করে বলেছেন, বাজার যেহেতু সংবাদের ওপর নির্ভরশীল, তাই কোনো অভাবনীয় ইতিবাচক খবর এলে সোনার দাম কমতেও পারে।
