ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী সরকারে থাকলে তেলের টাকা হারাবে ইরাক: হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের
ইরাকের পরবর্তী সরকারে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অন্তর্ভুক্ত হলে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি এর আওতায় ইরাকের তেল রাজস্বও আটকে দেওয়া হতে পারে। চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাকে ইরানের প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে যে প্রচারণা চালাচ্ছেন, এই সতর্কবার্তা তারই সর্বশেষ এবং কঠোরতম উদাহরণ। বাগদাদ দীর্ঘদিন ধরেই তার দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে।
তিনজন ইরাকি কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, গত দুই মাসে বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জশুয়া হ্যারিস ইরাকি কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী শিয়া নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বারবার এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান-সমর্থিত কিছু গোষ্ঠীর প্রধানদের কাছেও এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
হ্যারিস এবং মার্কিন দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। সূত্রগুলো গোপনীয় আলোচনার বিষয়ে কথা বলার জন্য নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছে।
দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পর থেকে ট্রাম্প ইরান সরকারকে দুর্বল করার পদক্ষেপ নিয়েছেন, যার মধ্যে প্রতিবেশী ইরাকের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগও অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকি কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অর্থনীতি সচল রাখতে ইরাককে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং দীর্ঘদিন ধরে বাগদাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসন এই ডলার প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করেছে এবং গত কয়েক বছরে ডজনখানেক ইরাকি ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
তবে ওয়াশিংটন কখনোই ইরাকের তেল রাজস্ব থেকে আসা ডলারের প্রবাহ বন্ধ করেনি। ওপেকভুক্ত শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক হয়ে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যায়। ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের পর থেকে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই দেশটির তেল রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানির কার্যালয়, ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং জাতিসংঘের ইরান মিশন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের সার্বভৌমত্ব এবং অঞ্চলের প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করে। এতে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের কোনো ভূমিকা থাকা উচিত নয়, যারা ক্ষতিকর স্বার্থ হাসিল করতে চায়, সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি করে এবং পুরো অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ ছড়ায়।' তবে নিষেধাজ্ঞার হুমকির বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
সূত্রগুলো জানায়, হ্যারিসের বার্তাটি প্রধানমন্ত্রী সুদানি, শিয়া নেতা আম্মার হাকিম, হাদি আল-আমিরি এবং কুর্দি নেতা মাসরুর বারজানিকে জানানো হয়েছে। নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সুদানির রাজনৈতিক জোট এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোও ভালো ফল করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নজরে ইরান-সংশ্লিষ্ট বলে বিবেচিত ৫৮ জন সংসদ সদস্যকে ঘিরেই এই বার্তা দেওয়া হয়েছে। এক ইরাকি কর্মকর্তা বলেন, 'আমেরিকানদের বক্তব্য ছিল, ওই ৫৮ জন এমপির কেউ যদি মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব করেন, তবে তারা নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থগিত করবে।' সংখ্যাগরিষ্ঠতা গঠন নিয়ে জটিলতার কারণে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
বিস্তারিত জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, 'তারা বলেছে, এর মানে হলো তারা ওই সরকারের সঙ্গে কোনো লেনদেন করবে না এবং ডলার স্থানান্তর স্থগিত করবে।'
লন্ডনের চ্যাথাম হাউস থিংক ট্যাংকের ইরাক ইনিশিয়েটিভের পরিচালক রেনাদ মনসুর বলেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরাকের বিশাল আমলাতন্ত্রের পদগুলো থেকে লাভবান হচ্ছে, তাই তারা ডলার প্রবাহ বন্ধের হুমকিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বড় ধরনের লিভারেজ বা ক্ষমতা রয়েছে। ডলারের প্রবাহ বন্ধ করার হুমকি ইরাকের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ তেল বিক্রির ওপরই দেশটির অর্থনীতি নির্ভরশীল।'
যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির তালিকায় রয়েছেন আদনান ফাইহান। তিনি শক্তিশালী ইরান-সমর্থিত রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠী 'আসায়িব আহল আল-হক' (এএএইচ)-এর সদস্য এবং ডিসেম্বরের শেষ দিকে সংসদের প্রথম ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র এই পদে ফাইহানের নিয়োগের বিরোধিতা করেছে।
চাপের মুখে এএএইচ নেতা কায়েস আল-খাজালি ফাইহানকে ডেপুটি স্পিকার পদ থেকে সরিয়ে দিতে রাজি হয়েছেন বলে ইরাকি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে ফাইহান এখনো তার পদে বহাল আছেন। এ বিষয়ে এএএইচ মিডিয়া অফিস বা ফাইহান তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।
বিগত সরকারে এএএইচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় সামলেছিল এবং ইরাকি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা পরবর্তী সরকারেও অংশ নিতে চায়। রয়টার্সের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এএএইচ একটি অত্যাধুনিক তেল পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যা ইরান ও তার প্রোক্সিদের জন্য বছরে অন্তত ১০০ কোটি ডলার আয় করত।
২০১৯ সালে ওয়াশিংটন এএএইচ-এর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে খাজালির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এর মধ্যে ওই বছর বিক্ষোভকারীদের হত্যা এবং ২০০৭ সালে পাঁচ মার্কিন সেনাকে হত্যার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় খাজালি এই নিষেধাজ্ঞাকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
ইরাক তার তেল রপ্তানি আয়ের বড় অংশ নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা রাখে। এটি ইরাক রাষ্ট্রের সার্বভৌম অ্যাকাউন্ট হলেও, এই ব্যবস্থার ফলে ইরাকের রাজস্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কার্যত নিয়ন্ত্রণ থাকে। ফলে বাগদাদকে ওয়াশিংটনের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হয়।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, 'অঞ্চলে স্থিতিশীলতা অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে নিরাপত্তা অর্জনের ওপর নিবদ্ধ।'
বাগদাদের ওপর ডলার স্থগিতের এই চাপের বিষয়টি এমন সময় সামনে এলো যখন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল বাজারজাতকরণ শুরু করেছে। এর আগে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাস থেকে আটক করে এবং মাদক সংক্রান্ত অভিযোগে বিচারের জন্য নিউ ইয়র্কে নিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির সব অর্থ প্রাথমিকভাবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ব্যাংকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
