কোনো চুক্তি ছাড়াই ভেস্তে গেল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা, এরপর কী?
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ ম্যারাথন আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে।
এরপর এখন কী হবে?
এই ব্যর্থতা ট্রাম্প প্রশাসনকে কয়েকটি অপ্রীতিকর বিকল্পের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখন ওয়াশিংটনকে হয় তেহরানের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সংলাপে যেতে হবে, না হয় এমন একটি যুদ্ধে ফিরতে হবে যা ইতিমধ্যে আধুনিক সময়ের বৃহত্তম জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে এবং যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা ঘোষণা করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি কিনা আলোচনার সময় ফ্লোরিডায় বসে 'আল্টিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ' ম্যাচ উপভোগ করছিলেন।
তবে প্রতিটি পথই অত্যন্ত কঠিন কৌশলগত এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি বহন করছে।
২১ ঘণ্টার এই দীর্ঘ আলোচনায় ঠিক কী কথা হয়েছে, সে বিষয়ে জেডি ভ্যান্স বিস্তারিত কিছু না বললেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করার জন্য একটি 'মেনে নাও নয়তো বিদায় হও' ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং ইরান তা গ্রহণ করেনি। জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, 'আমরা আমাদের 'রেড লাইন' (চূড়ান্ত সীমা) স্পষ্ট করে দিয়েছি এবং কোন কোন বিষয়ে আমরা ছাড় দিতে রাজি আছি তাও জানিয়েছি।' তিনি আরও যোগ করেন, 'তারা আমাদের শর্ত গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।'
এই দিক থেকে দেখলে, এই আলোচনাটি গত ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় হওয়া সেই আলোচনার চেয়ে খুব একটা আলাদা ছিল না যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল। যার জের ধরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে টানা ৩৮ দিনের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেখানে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ, সামরিক ঘাঁটি এবং অস্ত্র তৈরির কারখানাগুলোকে।
পেন্টাগনের তথ্যমতে, ওই অভিযানে ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছিল।
ট্রাম্পের বাজি ছিল যে, আমেরিকার এই বিধ্বংসী সামরিক শক্তি দেখে ইরান নমনীয় হবে এবং তাদের সিদ্ধান্ত বদলাবে। তবে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনো পরিমাণ মার্কিন অস্ত্রশস্ত্র তাদের নতি স্বীকার করতে বাধ্য করতে পারবে না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, 'আমাদের মহান প্রবীণ নেতা, প্রিয়জন এবং দেশবাসীর এই অপূরণীয় ক্ষতি আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় আরও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করেছে।'
হয়তো ভবিষ্যতে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। তবে তেহরানের সাথে কোনো দীর্ঘ ও জটিল আলোচনায় জড়িয়ে পড়ার ভয় ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন, তিনি এই লড়াইয়ে বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাই তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের ভাষায়, ইরানের এখন উচিত কেবল 'আত্মসমর্পণ' করা।
কিন্তু অতীতে এমনটা ঘটেনি। ওবামা প্রশাসনের আমলে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে প্রধান পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন হতে দুই বছর সময় লেগেছিল। এবং সেটি ছিল অসংখ্য আপোসের সংমিশ্রণ, যার মধ্যে ছিল ইরানকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পারমাণবিক মজুদ রাখার অনুমতি দেওয়া এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত তাদের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর থেকে ধাপে ধাপে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া।
কিন্তু জেডি ভ্যান্স যে অচলাবস্থার মুখে পড়েছেন, তা মূলত গত ফেব্রুয়ারিতে ব্যর্থ হওয়া আলোচনারই পুনরাবৃত্তি, যার জন্য ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। (সেই আলোচনা পরিচালনা করেছিলেন স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার, যারা ইসলামবাদের এই ২১ ঘণ্টার বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন)।
সে সময় ইরানিরা তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম কয়েক বছরের জন্য 'স্থগিত' করার প্রস্তাব দিলেও, তাদের হাতে থাকা বোমার উপযোগী ইউরেনিয়াম মজুদ ত্যাগ করতে বা নিজেদের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার পুরোপুরি ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। এনপিটি চুক্তির স্বাক্ষরকারী হিসেবে ইরান একে নিজেদের অধিকার মনে করে। অন্যদিকে, মার্কিনরা মনে করে এটিই প্রমাণ করে যে ইরান সবসময় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি পথ খোলা রাখতে চায়। ৩৮ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এই দুই পক্ষের অবস্থানকে আরও অনড় করে তুলেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে এখন প্রধান অস্ত্র হলো পুনরায় বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দেওয়া। আগামী ২১ এপ্রিল বর্তমানের এই ভঙ্গুর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হবে। তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে খুব একটা সুখকর হবে না এবং ইরানিরা সেটি ভালো করেই জানে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি দিয়েছিলেন মূলত বিশ্ববাজারের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ধাক্কা সামলাতে, যার কারণে গ্যাসোলিনের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং সার ও সেমিকন্ডাক্টর তৈরির কাঁচামাল হিলিয়ামের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। একটি চুক্তির আশায় বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হলেও আবার যুদ্ধ শুরু হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ধস নামবে, সংকট আরও বাড়বে এবং বর্তমানে ৩.৩ শতাংশে থাকা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে থাকবে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া। আলোচনার তালিকায় ইরান এটিকে সবার ওপরে রেখেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, 'গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক ইস্যু, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ সমাপ্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে।'
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তালিকা। কারণ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এবং ইরান অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার বিষয়টি কোনো ইস্যুই ছিল না।
এখন এই জলপথের নিয়ন্ত্রণকে ইরান তাদের অন্যান্য দাবির সঙ্গে যুক্ত করেছে। তারা দাবি করেছে, বোমাবর্ষণের ফলে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং গত দুই দশক ধরে চলা সকল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দাবিটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দ্বিতীয়টি কেবল ধাপে ধাপে কার্যকরের শর্ত দিয়েছে।
জেডি ভ্যান্সের এই সফর একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—উভয় পক্ষই নিজেকে বিজয়ী মনে করছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে তারা বিপুল পরিমাণ বোমা ফেলে জিতেছে, আর ইরান মনে করছে তারা ধ্বংস না হয়ে টিকে থেকেই জয়ী হয়েছে। ফলে কোনো পক্ষই এখন আপোসের মেজাজে নেই।
