অন্ধ নয় গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর, আয়ু নিয়েও রয়েছে সংশয়: রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানীদের নতুন তথ্য
দেখতে ভয়ংকর কোনো শিকারির চেয়ে বরং পুরনো এক পাটি ছিঁড়ে যাওয়া মোজার মতোই বেশি মনে হয়। এর চলাচলের গতি চলন্ত সিঁড়ির চেয়েও ধীর। অধিকাংশের বর্ণনায় গ্রিনল্যান্ড শার্ক বা হাঙ্গর আর্কটিক বা উত্তর মেরুর গোধূলি বেলায় জলে ভেসে বেড়ানো একটি আনাড়ি ও প্রায়-অন্ধ ধ্বংসাবশেষ, যা অলসভাবে খাবারের অবশিষ্টাংশ খুঁজে বেড়ায়।
এই হাঙ্গর সম্পর্কে একজন গবেষক ভালোবেসে বলেছিলেন, 'এটি দেখতে এমন যেন এটি আগেই মরে গেছে।' এটি এই গ্রহের সবচেয়ে কম বোঝা যাওয়া এবং জৈবিকভাবে রহস্যময় এক প্রজাতি।
তবে চলতি মাসে বিজ্ঞানীরা এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন: এই হাঙ্গরগুলো আসলে অন্ধ নয়। নতুন প্রকাশিত এই তথ্যটি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বিশ্বাসকে পাল্টে দিয়েছে এবং এই হাঙ্গরকে নিয়ে গবেষণার চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। একইসঙ্গে এই গবেষণা দ্রুত পরিবর্তনশীল জলবায়ু কীভাবে এই রহস্যময় মাছটির ক্ষতি বা উপকার করতে পারে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাসের সংকটকেও স্পষ্ট করেছে।
কানাডিয়ান সামুদ্রিক পরিবেশবিদ জেনা এডওয়ার্ডস বলেন, 'গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর মানেই এক পরম রহস্য। এমনকি আমরা যা জানি বলে মনে করি, তা নিয়েও আমরা এখনও কিছুটা নিশ্চিত নই। এদের সম্পর্কে সবকিছুই যেন একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন।'
দশক ধরে ২০ ফুট লম্বা এই ছোপ ছোপ দাগযুক্ত প্রাণিটি সম্পর্কে খুবই কম তথ্য জানা গেছে। এদের মন্থর গতির বর্ণনার সাথে বৈপরীত্য দেখা যায় যখন এদের পেটে বলগা হরিণ (ক্যারিবু), মেরু ভাল্লুক, মুস হরিণ এবং নারওয়াল ও বেলুগা তিমির অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, এর সবগুলোই কেবল মৃত পশু খেয়ে পাওয়া নয়।
জেনা এডওয়ার্ডস বলেন, 'আমরা অন্ধকারে ঢিল ছুড়ছি। আমাদের কাছে এত কম তথ্য আছে যে আমরা যা জানি তার ওপর ভিত্তি করে একটি হাইপোথিসিস বা অনুমান তৈরি করি, কিন্তু এই হাঙ্গরগুলোর সাথে আসলে কী ঘটছে তা পুরোপুরি বুঝতে আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন।'
গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে দুটি বিশ্বাস করে আসছিলেন: এরা দীর্ঘজীবী মেরুদণ্ডী প্রাণী এবং এরা কার্যত অন্ধ। উত্তর মেরুর শীতল পানিতে যেখানে আলো খুব কম এবং মন্থর গতিকে ধীর মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়ার সমার্থক ধরা হয়, সেখানে এই দুটি ধারণা বেশ যৌক্তিক মনে হয়েছিল।
কিন্তু জানুয়ারির শুরুতে বিশ্বের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখেছেন যে, হাঙ্গরগুলোর রেটিনা গঠনগতভাবে ত্রুটিমুক্ত এবং আলো ও বৈপরীত্য (কনট্রাস্ট) শনাক্ত করতে সক্ষম। যদিও অধিকাংশ গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরের চোখ ঘোলাটে থাকে এবং কর্নিয়া থেকে কৃমির মতো পরজীবী 'কোপেপড' ঝুলতে দেখা যায়, তবুও হাঙ্গরের রেটিনার গঠন, জেনেটিক সিকোয়েন্সিং এবং আণবিক কার্যকারিতার ওপর বিস্তৃত গবেষণা বলছে—এরা পরজীবীর আক্রমণ এবং আর্কটিকের কঠোর পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গ্রিনল্যান্ড শার্ক বিশেষজ্ঞ নাইজেল হাসির কাছে এই ফলাফলগুলো সমুদ্রের তলদেশে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়। এটি তার এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে যে, এরা 'একেবারে অবিশ্বাস্য প্রাণী' এবং প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে 'আমরা এদের অনেক কম মূল্যায়ন করি'।
পাঁচ বছর আগে নরওয়ের স্বালবার্ড উপকূলে একটি সাবমার্সিবলে বসে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরগুলো জলপৃষ্ঠ এবং সমুদ্রের তলদেশের মধ্যে প্রায় লম্বালম্বিভাবে ডাইভ দিচ্ছে। এটি আগে যা ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল চলাচল। গবেষণার জন্য তলদেশে রাখা কয়েকশ পাউন্ড মাছের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেতে এরা তাঁদের চলাচলকে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করছিল।
পিএইচডি শিক্ষার্থী এরিক স্টে ম্যারি, যিনি হাসির সাথে সেই অভিযানে ছিলেন, বলেন— 'গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর নিয়ে পড়াশোনা করা মানে হলো এক মুঠো পাজল মেলাতে গিয়ে হঠাৎ উপলব্ধি করা যে এটি আসলে হাজার টুকরোর একটি পাজল। আমরা তাদের জীবনের খুব সামান্য একটি অংশ দেখে এই প্রাণিটির একটি সম্পূর্ণ ছবি তৈরির চেষ্টা করছি।'
ওই অভিযানে এই জুটি আরও লক্ষ্য করেন যে, হাঙ্গরগুলো তাদের পাখনাগুলো বেলুগা তিমির মতো সূক্ষ্ম নড়াচড়ার জন্য ব্যবহার করে। এই অভিজ্ঞতা হাসিকে হাঙ্গরের সম্পর্কে প্রচলিত অনেক বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে—যার মধ্যে অন্যতম হলো এদের ৫০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার ধারণা।
২০১৬ সালের একটি বহুল আলোচিত গবেষণায় কার্বন ডেটিং ব্যবহার করে গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরের দীর্ঘায়ুর একটি উচ্চসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। গবেষকদের সেই হিসাব অনুযায়ী, সমুদ্রের কিছু হাঙ্গর উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বা গ্যালিলিওর সমসাময়িক হতে পারে। তবে হাসির মতে, হাজার হাজার বছরের পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের কাল নির্ধারণে কার্বন ডেটিং পদ্ধতি কার্যকর হলেও স্বল্প সময়ের ক্ষেত্রে এতে ত্রুটির সম্ভাবনা থাকে।
হাসি বলেন, 'শয়ে শয়ে বছর বেঁচে থাকা প্রাণীর বয়স নির্ধারণে এই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। এক অর্থে, গবেষণাটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল 'সায়েন্স'-এ প্রকাশিত হওয়াটা ছিল আশ্চর্যের। এই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিটির আরও যাচাই বা ভ্যালিডেশন প্রয়োজন।'
এমনকি 'গ্রিনল্যান্ড শার্ক' নামটিও বিভ্রান্তিকর হতে পারে। সাধারণ বিশ্বাস অনুযায়ী এরা কেবল গভীর সমুদ্রে থাকে, কিন্তু উচ্চ উত্তর অক্ষাংশের শীতল তাপমাত্রার কারণে প্রাণিগুলো প্রায়ই অগভীর পানিতে চলে আসে। ক্যারিবিয়ান সাগরে এই হাঙ্গর পাওয়ার খবর মানেই যে এরা পথ হারিয়েছে তা নয়, বরং এটি ইঙ্গিত দেয় যে এই প্রজাতিটি সম্ভবত বিশ্বজুড়ে পরিভ্রমণ করে এবং বাণিজ্যিক মৎস্য আহরণ অঞ্চলের অনেক গভীরে এদের অস্তিত্ব রয়েছে।
এডওয়ার্ডস বলেন, 'এরা যদি মাত্র ১০০ বছরও বাঁচে, তবে সেই সময়ের মধ্যে তারা কত দূর ভ্রমণ করতে পারে? আমাদের ব্যবস্থাপনার পরিধি কতটা বড় হওয়া উচিত? আমাদের কি এটা ভাবা উচিত যে একটি প্রাণী তার জীবনকালে পুরো আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে পারে?'
হাঙ্গর নিয়ে এই গভীর অজানা বিষয়গুলো আর্কটিকের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কারণে আরও ঘনীভূত হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলটি পৃথিবীর অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে।
নাইজেল হাসি বলেন, 'এরা এমন একটি প্রজাতি যারা যেকোনো কিছু খেতে পারে। এমনকি যদি পুরো খাদ্যশৃঙ্খল বদলে যায় এবং তাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়, তবুও তারা টিকে থাকবে।' আর্কটিকের তাপমাত্রা বাড়লে গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরগুলো সম্ভবত আরও গভীর ও শীতল পানির দিকে সরে যাবে।
তবে হাসি চিন্তিত এই হাঙ্গরের প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যের অভাব নিয়ে। ১৯৫০ সালে শেষবারের মতো একটি অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী হাঙ্গরের তথ্য নথিবদ্ধ করা হয়েছিল। এর ৭৫ বছর পরেও বিজ্ঞানীরা জানেন না যে এই হাঙ্গরগুলো কোথায় বংশবৃদ্ধি করে অথবা একবারে কয়টি বাচ্চা জন্ম দেয়।
এই হাঙ্গরগুলো মানুষের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে এবং জ্ঞানের শূন্যতাকে স্পষ্ট করে।
নাইজেল হাসি বলেন, 'আমরা ধরাবাঁধা ধারণায় অন্ধ হয়ে পড়ি। আমি মনে করি এরা বেশ চতুর, তীক্ষ্ণ এবং আমার সন্দেহ এরা আসলে অত্যন্ত দক্ষ শিকারি।'
তিনি ও স্টে ম্যারি ইনুইট শিকারিদের মৌখিক ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে দেখা গেছে এই হাঙ্গরগুলো অগভীর পানিতে শিকারি আক্রমণ চালায়। হাসির মতে, এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা যখন ঘুমায় বা বরফের শ্বাস নেওয়ার ছিদ্রে আসে, তখন এরা ওৎ পেতে আক্রমণ (অ্যাম্বুশ) করে।
হাসি পরিশেষে বলেন, 'যদি তারা কেবল মরা পশুই খেয়ে বেড়াতে পারত, তবে এই গ্রহে তারা এতকাল কীভাবে টিকে থাকল? আমি মনে করি এটি কেবল সময়ের ব্যাপার, যখন আমরা আবারও জানতে পারব যে আমরা এদের কতটা কম মূল্যায়ন করেছিলাম।'
