ক্রিপ্টো অপরাধীরা যেভাবে সাধারণ মানুষের ৭০ কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছে
ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা চুরি হওয়ার কষ্টটা একেবারেই আলাদা। সব লেনদেন 'ব্লকচেইন' নামের একটি ডিজিটাল হিসাবের খাতায় রেকর্ড করা থাকে। তাই কেউ যদি টাকা চুরি করে নিজের ক্রিপ্টো ওয়ালেটে নিয়েও যায়, তবুও তা অনলাইনে দিব্যি দেখা যায়।
হেলেন (ছদ্মনাম) চোরদের হাতে হারিয়েছেন প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার ডলার (প্রায় ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা)। তিনি বলেন, 'পাবলিক ব্লকচেইনে নিজের টাকা দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু তা ফেরত পাওয়ার জন্য কিছুই করার নেই।'
তিনি এই পরিস্থিতিকে তুলনা করেছেন এমন এক চোরের সঙ্গে, যে আপনার মূল্যবান সম্পদ চুরি করে নিয়ে একটি দুর্লঙ্ঘ্য খাদের ওপারে জমা করে রেখেছে আর আপনি তা শুধু তাকিয়ে দেখছেন।
যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা হেলেন এবং তার স্বামী রিচার্ড (আসল নাম নয়) গত সাত বছর ধরে 'কার্ডানো' নামের এক ক্রিপ্টো কয়েন কিনছিলেন এবং জমাচ্ছিলেন।
তারা এমন একটি ডিজিটাল সম্পদে বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন যার মূল্য নাটকীয়ভাবে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রথাগত সঞ্চয়ে সচরাচর দেখা যায় না। তারা জানতেন এতে ঝুঁকি আছে, তাই তারা তাদের ডিজিটাল চাবি বা পাসওয়ার্ড সাবধানে রেখেছিলেন।
কিন্তু কোনোভাবে হ্যাকাররা তাদের ক্লাউড স্টোরেজ অ্যাকাউন্টে ঢুকে পড়ে, যেখানে তারা তাদের ক্রিপ্টো ওয়ালেটের তথ্য এবং প্রবেশের নিয়মকানুন লিখে রেখেছিলেন।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ছোট একটি পরীক্ষামূলক ট্রান্সফারের পর, অপরাধীরা অত্যন্ত দ্রুত ও নিঃশব্দে ওই দম্পতির সব কয়েন নিজেদের ডিজিটাল ওয়ালেটে সরিয়ে ফেলে।
এরপর মাসের পর মাস ওই দম্পতি অসহায়ভাবে দেখেছেন তাদের টাকা এক ওয়ালেট থেকে আরেক ওয়ালেটে ঘুরছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির সহজাত বৈপরীত্য হলো, এখানে সব লেনদেন জনসমক্ষে ট্র্যাক করা যায়, কিন্তু ব্যবহারকারীরা চাইলে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে পারেন।
হেলেন এবং রিচার্ড বিত্তশালী নন। হেলেন একজন ব্যক্তিগত সহকারী এবং রিচার্ড একজন সুরকার। কার্ডানোতে বিনিয়োগ নিয়ে তাদের অনেক বড় স্বপ্ন ছিল।
রিচার্ড বলেন, 'আমরা অনেক দিন ধরে এই কয়েনগুলো কিনছিলাম... আমাদের জমানো সব টাকা দিয়ে আরও কয়েন কিনতাম। আমার বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর এই চুরি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা।'
তখন থেকেই হেলেন টাকা উদ্ধারের মিশনে নেমেছেন। তিনি বিভিন্ন পুলিশ বাহিনী এবং কার্ডানো ডেভেলপারদের কাছ থেকে বিস্তারিত প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছেন। এখন অপরাধীদের ওয়ালেট ঠিকানা তার কাছে থাকলেও তাদের মুখোশ খোলার ক্ষমতা কারও নেই।
তাদের পরিকল্পনা হলো, হ্যাকারদের খুঁজে বের করতে ব্যক্তিগত গোয়েন্দা বা প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর নিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত টাকা জমানো।
হেলেন বলেন, 'এটি আপনাকে অসহায় করে দেয়, কিন্তু আমি চেষ্টা চালিয়ে যাব।'
ক্রিপ্টো অপরাধের বিস্ফোরণ
ফিনান্সিয়াল কন্ডাক্ট অথরিটি (এফসিএ)-এর জন্য ২০২৪ সালের আগস্টে করা এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্রিপ্টো-সম্পদ রয়েছে—যার সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ।
বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৫৬ কোটি মানুষ এখন ক্রিপ্টো মালিক। কিন্তু মালিকানা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে চুরির ঘটনাও। মহামারির সময় ক্রিপ্টো কয়েনের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই খাতে হামলার ঘটনাও ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান 'চেইনালিসিস'-এর তদন্তকারীদের মতে, ২০২৫ সাল ছিল ক্রিপ্টো অপরাধীদের জন্য আরেকটি 'বাম্পার' বছর। এ বছর মোট চুরির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪০ কোটি ডলারেরও (২৫০ কোটি পাউন্ড) বেশি। ২০২০ সাল থেকেই এই বাৎসরিক চুরির পরিমাণ প্রায় একই রকম রয়েছে।
চুরির বেশিরভাগ টাকাই খোয়া যাচ্ছে ক্রিপ্টো কোম্পানিগুলোর ওপর বড় ধরনের সাইবার হামলার মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ 'বাইবিট' থেকে ১৫০ কোটি ডলার হাতিয়ে নেয়।
এই ধরনের এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিশাল ধনী ক্রিপ্টো ফার্মগুলো ক্ষতির দায়ভার বহন করে, ফলে ব্যক্তি পর্যায়ে খুব একটা প্রভাব পড়ে না। তবে ২০২৫ সালে ব্যক্তিগত ক্রিপ্টো বিনিয়োগকারীদের ওপর হামলার সংখ্যাও বেড়েছে।
চেইনালিসিসের গবেষণা বলছে, এই ব্যক্তিগত হামলার ঘটনা ২০২২ সালের ৪০ হাজার থেকে বেড়ে গত বছর ৮০ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
হ্যাকিং, প্রতারণা বা জোর করে আদায়—এসবের মাধ্যমে চুরি হওয়া মোট ক্রিপ্টো সম্পদের প্রায় ২০ শতাংশ খোয়া গেছে, যার আনুমানিক মূল্য ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
তবে কোম্পানিটি যোগ করেছে যে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। কারণ সব ভুক্তভোগী চুরির কথা প্রকাশ্যে জানান না। আর এমনটা ঘটলে আপনাকে একাই সব সামলাতে হতে পারে।
প্রথাগত অর্থ ব্যবস্থায় অনেক চুরি বা জালিয়াতির দায়ভার ব্যাংক বা কার্ড কোম্পানিগুলো নেয়। যুক্তরাজ্যে ফিন্যান্সিয়াল অমবুডসম্যান সার্ভিসে অভিযোগ করা যায় এবং ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমপেনসেশন স্কিমের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণও পাওয়া যেতে পারে।
এফসিএ বলছে, 'যুক্তরাজ্যে ক্রিপ্টো এখনো অনেকাংশে অনিয়ন্ত্রিত এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। যদি কোনো অঘটন ঘটে, তবে সুরক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই আপনার সব টাকা হারানোর মানসিক প্রস্তুতি থাকা উচিত।'
অনলাইনে 'বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকড' লিখে খুঁজলেই এর নির্মম সত্যটা বোঝা যায়। বাইন্যান্স বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ, যুক্তরাজ্যে যার ১৪ লাখ ব্যবহারকারী রয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু তাদের ওয়েবসাইটে চুরির শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরামর্শ দেওয়ার পাতাটি যুক্তরাজ্যে ব্লক বা বন্ধ করা আছে।
এফসিএ-র অনুমোদন না থাকায় ২০২৩ সাল থেকে কোম্পানিটি যুক্তরাজ্যে নতুন গ্রাহক নিচ্ছে না। কিন্তু অপরাধীরা ভুক্তভোগীর অবস্থান নিয়ে মাথা ঘামায় না, তারা বিশ্বজুড়ে নির্বিচারে মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
চেইনালিসিস ব্যক্তিগত পর্যায়ের এই হামলাগুলোকে 'ক্রিপ্টো অপরাধের অলিখিত অধ্যায়' হিসেবে বর্ণনা করেছে।
কয়েনের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর মানুষ বিনিয়োগকারী হিসেবে ক্রিপ্টোজগতে প্রবেশ করায় অপরাধের মাত্রা বেড়েছে বলে তারা মনে করেন। তাদের যুক্তি, বড় বড় পরিষেবাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার হওয়ায় হামলাকারীরা এখন 'সহজ লক্ষ্য' হিসেবে সাধারণ মানুষকে বেছে নিচ্ছে।
এ ছাড়া আরেকটি বিষয় হলো, আপনার কাছে যত বেশি ক্রিপ্টো থাকবে এবং আপনি তা নিয়ে যত বেশি জানাজানি করবেন, আপনার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঝুঁকি তত বাড়বে। ছোট বিনিয়োগকারী বা 'হডলার'রা (কমিউনিটিতে যাদের এই নামে ডাকা হয়) আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে কম থাকেন।
চুরি, ছিনতাই এবং 'রেঞ্চ অ্যাটাক'
আর চোরদের কথা বললে, তারা যেকোনো জায়গায় ওত পেতে থাকতে পারে।
অক্টোবরে ক্রিপ্টো বিশ্লেষণকারী কোম্পানি 'ইলিপটিক'-এর ব্লকচেইন গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকাররা ধনী ক্রিপ্টো মালিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। অন্যান্য দেশেও প্রচুর তরুণ প্রতারক ও হ্যাকার রয়েছে।
গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে ২২ বছর বয়সী ইভান ট্যাংগেম্যান ক্রিপ্টো চোরদের একটি দলের সদস্য হিসেবে নিজের দোষ স্বীকার করেছেন। 'সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্টারপ্রাইজ' নামের এই দলটি ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে ২৬ কোটি ডলারেরও বেশি চুরির দায়ে অভিযুক্ত।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, তারা হ্যাক করা ডেটাবেজ ব্যবহার করে ধনী ক্রিপ্টো মালিকদের টার্গেট করত। ভুক্তভোগীদের বোকা বানিয়ে নিজেদের ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিত এবং কয়েন ট্রান্সফার করতে বাধ্য করত।
দলের সদস্যরা সবাই ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ। শোনা যায়, তারা চুরি করা কয়েন দিয়ে ব্যক্তিগত জেট, দামি গাড়ি এবং বিলাস বহুল হাতব্যাগ কিনত, যা তারা নাইটক্লাবে বিলিয়ে দিত।
কিছু ক্ষেত্রে, প্রসিকিউটররা জানান, দলটি ক্রিপ্টো ভাণ্ডারের পাসওয়ার্ড বা 'কি' থাকা হার্ডওয়্যার চুরি করতে বাড়িতে ডাকাতিরও আয়োজন করত।
চুরি ও ছিনতাই এতটাই সাধারণ হয়ে গেছে যে ক্রিপ্টো কমিউনিটিতে এর জন্য একটি আলাদা নাম তৈরি হয়েছে—'রেঞ্চ অ্যাটাক'। কারণ অপরাধীরা ভুক্তভোগীদের রেঞ্চ বা স্প্যানার দিয়ে ভয় দেখায় বলে জানা গেছে।
গত এপ্রিলে স্পেনে ক্রিপ্টো অপরাধীরা এক নারী ও পুরুষকে তাদের ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করে।
স্প্যানিশ পুলিশ জানায়, লোকটির পায়ে গুলি করা হয়েছিল এবং অপরাধীরা তাদের ক্রিপ্টো ওয়ালেটে ঢোকার চেষ্টার সময় ওই দম্পতিকে কয়েক ঘণ্টা জিম্মি করে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত নারীটি মুক্তি পেলেও তার সঙ্গী নিখোঁজ ছিলেন। পরে জঙ্গলে তার লাশ পাওয়া যায়।
এই ঘটনায় স্পেনে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ডেনমার্কে আরও চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
ফ্রান্সেও এমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে একটি অপহরণ চেষ্টার ঘটনা ভিডিওতে ধরা পড়েছিল।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে আরেকটি ঘটনায় ক্রিপ্টোকারেন্সি সিকিউরিটি কোম্পানি 'লেজার'-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড ব্যাল্যান্ড এবং তার স্ত্রীকে মধ্য ফ্রান্সের বাড়ি থেকে অপহরণ করা হয়।
কয়েক দিন পর পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। কিন্তু চাঁদা আদায়ের চেষ্টার সময় ব্যাল্যান্ডের হাতের আঙুল কেটে ফেলেছিল দুর্বৃত্তরা।
এরপর গত মাসে যুক্তরাজ্য পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। অক্সফোর্ড ও লন্ডনের মধ্যে চলাচলকারী একটি গাড়ি থামিয়ে মুখোশধারী ব্যক্তিরা আরোহীদের একজনকে ১৫ লাখ পাউন্ড মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রান্সফার করতে বাধ্য করেছিল।
ব্লকচেইন ইন্টেলিজেন্স ফার্ম 'টিআরএম ল্যাবস'-এর ইউকে পাবলিক সেক্টর রিলেশনস ডিরেক্টর ফিল আরিস আগেই বলেছিলেন, যেসব অপরাধী গোষ্ঠী সহিংসতা ব্যবহারে অভ্যস্ত, তাদের ক্রিপ্টোর দিকে ঝোঁকার সম্ভাবনাই বেশি ছিল।
'যতদিন চুরি করা সম্পদ পাচার বা নগদায়নের পথ খোলা আছে, ততদিন অপরাধীর কাছে লক্ষ্যবস্তু দামি ঘড়ি নাকি ক্রিপ্টো ওয়ালেট—তাতে খুব একটা পার্থক্য নেই।'
'ক্রিপ্টোকারেন্সি এখন মূলধারায় শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে। ফলে শারীরিক হুমকি ও ডাকাতি সম্পর্কে আমাদের সনাতন ধারণা সেই অনুযায়ী বদলাতে হবে।'
'রেঞ্চ অ্যাটাক' কতটা ব্যাপক, তা সঠিকভাবে বলা কঠিন, কারণ খুব কম ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে। তবে মনে করা হয়, ব্যক্তিগত ক্রিপ্টো চুরির ক্রমবর্ধমান সমস্যার একটি ছোট অংশ হলো এই ধরনের হামলা।
আর অনেক অপরাধীই হ্যাকিং বা প্রতারণার সেই পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত কৌশলগুলোর ওপর নির্ভর করে। কোম্পানিগুলোতে বড় ধরনের সাইবার হামলায় চুরি হওয়া তথ্যের প্রাচুর্য তাদের এই কাজ আরও সহজ করে দিচ্ছে।
'বিটকয়েন মিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বাড়ছে অহরহ'
ক্রিপ্টো সিকিউরিটি ফার্ম 'হেভেন'-এর প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথিউ জোনস বলেন, 'তথ্য এখন একটি সাধারণ সমস্যা। বিটকয়েন মিলিয়নিয়ারের সংখ্যা অহরহ বাড়ছে এবং চুরি হওয়া ডেটাবেজগুলো সব সময় টার্গেট তালিকা সমৃদ্ধ করছে।'
বিবিসির সাক্ষাতকারে এক হ্যাকার জানান, গুচি ও ব্যালেন্সিয়াগার মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের মূল কোম্পানি 'কেরিং'-এ ডেটা চুরির ঘটনা এর একটি বড় উদাহরণ।
লাখ লাখ গ্রাহকের নাম ও যোগাযোগের তথ্যের পাশাপাশি এই ডেটাবেজগুলো দেখায় যে মানুষ ওই দোকানগুলোতে কত টাকা খরচ করেছে।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা হ্যাকারটি জানান, সবচেয়ে বেশি খরচ করা ব্যক্তিদের টার্গেট করার জন্য তিনি ৩ লাখ ডলার (২ লাখ ২৪ হাজার পাউন্ড) দিয়ে ওই স্প্রেডশিটগুলো কিনেছিলেন।
তিনি দাবি করেন, এই তথ্যের সঙ্গে অন্য একটি চুরি হওয়া ডেটাবেজের তথ্য মিলিয়ে তিনি একাধিক 'কয়েনবেস' ব্যবহারকারীর কাছ থেকে অন্তত ১৫ লাখ ডলারের (১১ লাখ পাউন্ড) ক্রিপ্টো হাতিয়ে নিয়েছেন।
ওই অপরাধী নিশ্চিত করেছেন যে তার কাছে চুরি হওয়া ডেটা ছিল এবং বিবিসিকে প্রমাণ দিয়েছেন যে তার কাছে ৭ লাখ ডলারের (৫ লাখ ২২ হাজার পাউন্ড) বিটকয়েন রয়েছে, যা তিনি এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে পেয়েছেন বলে দাবি করেন।
তিনি দাবি করেন, 'আমি হ্যাক করা ডেটাবেজ কিনি এবং ধনীদের খুঁজে বের করতে ও তাদের সচল ফোন নম্বর বা ইমেইল পেতে অন্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। আমি এখনো তালিকা ধরে কাজ করছি এবং খুব দ্রুত আমার টাকা তিনগুণ করে ফেলেছি।'
ওই হ্যাকার নিজের সম্পর্কে কোনো তথ্য দেননি, শুধু জানিয়েছেন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো তিনি নিজেকে হ্যাকার নাকি প্রতারক মনে করেন, তিনি বললেন, 'কোনোটাই না, আমি শুধু টাকা বানাতে আগ্রহী।'
এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কেরিং সাড়া দেয়নি। তবে আগে বিবিসিকে তারা জানিয়েছিল যে ডেটা চুরির পর তাদের আইটি সিস্টেম সুরক্ষিত করা হয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলেছিল যে ওই হামলায় কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য বা সরকারি পরিচয়পত্র নম্বর চুরি হয়নি।
হেভেনের ম্যাথিউ জোনস জানান, তার নিজের ক্রিপ্টোও চুরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বাড়তি সুরক্ষাসহ একটি ক্রিপ্টো ওয়ালেট তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ হন।
তিনি বলেন, এখন এমন ফিচার দরকার যেখানে মালিক ছাড়া অন্য কেউ কয়েন পাঠাতে পারবে না তা নিশ্চিতে ক্রমাগত বায়োমেট্রিক চেক করা হবে। এ ছাড়া জিওফেন্সিং প্রযুক্তি দরকার, যাতে বাড়ি বা অফিসের বাইরে কোনো লেনদেন হলে তা আটকে দেওয়া যায়। তিনি ডিজিটাল ওয়ালেটে একটি 'প্যানিক বাটন'ও যুক্ত করছেন।
তিনি বলেন, 'মানুষ আজকাল পকেটে লাখ লাখ ডলারের ক্রিপ্টো নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওয়ালেটে কত টাকা রাখা যাবে তার কোনো সীমা নেই—আবার একবারে কত টাকা চুরি হতে পারে তারও কোনো সীমা নেই।'
'নিজের ব্যাংক নিজেই' হওয়ার বিড়ম্বনা
ম্যাথিউ জোনসের ক্রিপ্টো ওয়ালেটটি মূলত 'সেলফ কাস্টডি' বা নিজস্ব জিম্মার ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা এই শিল্পে বেশ জনপ্রিয়।
হেভেনের অ্যাপটি মেটামাস্ক এবং ট্রাস্টওয়ালেটের মতোই। ট্রেজর এবং লেজারের মতো অন্য কোম্পানিগুলো ইউএসবি মেমোরি স্টিকের মতো হার্ডওয়্যার ডিভাইস দেয়। তবে মূল ধারণা একই: আপনি নিজেই নিজের ব্যাংক হতে পারেন।
কিন্তু এই বাড়তি স্বাধীনতার সঙ্গে আসে বাড়তি ঝুঁকি, কারণ এখানে আপনার কোনো সুরক্ষাই নেই।
আপনার নিজের ওয়ালেট থেকে কয়েন চুরি হলে আপনি কোনো ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে গিয়ে অভিযোগও করতে পারবেন না।
'নিজের ব্যাংক নিজেই' হওয়ার স্বাধীনতা কি ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? জোনস জোর দিয়েই বললেন, 'হ্যাঁ'।
তার যুক্তি, 'ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছে সত্যিকার অর্থে দায়বদ্ধ নয়। তারা ঢালাও বা অস্পষ্ট কারণ দেখিয়ে যেকোনো সময় আপনার অ্যাকাউন্ট জব্দ বা বন্ধ করার ক্ষমতা রাখে।'
তিনি আরও বলেন, প্রথাগত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন জিজ্ঞেস করে তিনি কেন অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরাচ্ছেন, তখন তার আপত্তি থাকে।
হেলেন ও রিচার্ড নিজেদের ব্যাংক নিজেরাই হতে চেয়েছিলেন, আর তাতেই হারিয়েছেন সব কয়েন। বিষয়টি আরও বেশি বেদনাদায়ক হওয়ার কারণ, এই টাকার বড় একটা অংশ এসেছিল রিচার্ডের মায়ের মৃত্যুর পর তার বাড়ি বিক্রির টাকা থেকে।
রিচার্ড বলেন, 'আমার মায়ের টাকাটা চলে গেছে। আমার ভবিষ্যতের জন্য তিনি হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যা জমিয়েছিলেন, সব চুরি হয়ে গেল। আমাদের বাদ্যযন্ত্র ও গাড়ি বিক্রি করতে হয়েছে। এমনকি কিছুদিনের জন্য আমরা গৃহহীনও হয়ে পড়েছিলাম।'
এত কিছুর পরও তারা ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর পুরোপুরি আস্থা হারাননি। যদি হারানো টাকা ফেরত পান বা পর্যাপ্ত সঞ্চয় করতে পারেন, তবে আবারও সরাসরি ক্রিপ্টোতেই বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা তাদের।
