গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক-হুমকি: পাল্টা পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের যে হুমকি দিয়েছেন, তা থেকে তাকে বিরত রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূতরা। তবে ইইউ কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত যদি শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত তারা।
শনিবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ড কিনতে না দেওয়া পর্যন্ত তিনি ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ইইউ সদস্য ডেনমার্ক, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের পাশাপাশি ব্রিটেন ও নরওয়ের ওপর ধাপে ধাপে শুল্ক আরোপ করবেন। ইউরোপের প্রধান দেশগুলো ট্রাম্পের এই অবস্থানকে 'ব্ল্যাকমেইল' হিসেবে অভিহিত করেছে।
এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে জরুরি বৈঠকে বসছেন ইইউ নেতারা। আলোচনার সম্ভাব্য একটি পথ হলো—যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা ৯৩ বিলিয়ন ইউরো (১০৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ। ছয় মাসের স্থগিতাদেশ শেষে এই শুল্ক আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হতে পারে।
আরেকটি বিকল্প হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে এখন পর্যন্ত অব্যবহৃত 'অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট' (এসিআই)। এর আওতায় সরকারি টেন্ডার, বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার সীমিত করা যেতে পারে। পাশাপাশি সেবা খাতে বাণিজ্য সংকুচিত করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে, যেখানে ডিজিটাল সেবাসহ ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।
ইইউর একটি সূত্র জানায়, এসিআইয়ের তুলনায় প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে শুল্ক আরোপের প্যাকেজটিই বেশি সমর্থন পাচ্ছে। এসিআই নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আপাতত 'মিশ্র প্রতিক্রিয়া' দেখা যাচ্ছে।
দাভোসে বৈঠক
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, ইইউ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনায় ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতি তাদের দৃঢ় সমর্থন এবং যেকোনো ধরনের জবরদস্তির বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লারস লোকে রাসমুসেন অসলোতে নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে বলেন, ডেনমার্ক কূটনৈতিক পথেই সমাধানে অগ্রাধিকার দেবে। তিনি ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি 'ওয়ার্কিং গ্রুপ' গঠনের সাম্প্রতিক চুক্তির কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র মানেই কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন। আমেরিকার ব্যবস্থার মধ্যেই ভারসাম্য রক্ষার কাঠামো (চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স) রয়েছে।'
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (দাভোস) সম্মেলনে ইইউর আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে এই কূটনৈতিক উদ্যোগ। ছয় বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বুধবার সেখানে মূল ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের।
ইইউর কৌশল ব্যাখ্যা করে এক কূটনীতিক বলেন, 'সব বিকল্পই খোলা রাখা হয়েছে। দাভোসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হবে, এরপর নেতারা পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করবেন।'
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে, লক্ষ্যবস্তু হওয়া আটটি দেশ গ্রিনল্যান্ডে সীমিতসংখ্যক সেনা সদস্য পাঠিয়েছে। এসব দেশ ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ১০ ও ১৫ শতাংশ শুল্কের আওতায় রয়েছে।
রোববার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো বলেছে, 'শুল্কের হুমকি ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ককে দুর্বল করে এবং পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দেয়।' তারা জানায়, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার নীতির ভিত্তিতে আলোচনায় বসতে তারা প্রস্তুত।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এক বিবৃতিতে বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া সমর্থনের বার্তায় তিনি আশান্বিত। তিনি বলেন, 'ইউরোপকে ব্ল্যাকমেইল করা যাবে না।'
শুল্ক আরোপের হুমকির প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারেও। ডলারের বিপরীতে ইউরো ও পাউন্ডের দর কমেছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, তিনি এসিআই সক্রিয় করার পক্ষে চাপ দিচ্ছেন। তবে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন বলেন, ইইউ যে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা নিশ্চিত; কিন্তু এসিআই এখনই কার্যকর করা হলে তা 'অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো' হবে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি শুল্কের হুমকিকে 'ভুল সিদ্ধান্ত' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্পের সঙ্গে তার কথা হয়েছে এবং তিনি নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
ব্রিটেন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ব্রিটিশ সংস্কৃতিমন্ত্রী লিসা নন্দী স্কাই নিউজকে বলেন, মিত্রদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই বিরোধ মেটাতে হবে। তিনি বলেন, 'গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। তবে কথার লড়াই নয়, একসঙ্গে কাজ করাই সবার স্বার্থে।'
তবে, এই শুল্ক হুমকি মে মাসে ব্রিটেনের সঙ্গে এবং জুলাই মাসে ইইউর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা বাণিজ্য চুক্তিগুলোকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। এসব সীমিত পরিসরের চুক্তি আগে থেকেই একপাক্ষিক বলে সমালোচিত ছিল। কারণ, এতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উচ্চ শুল্ক বজায় রেখেছে, আর অংশীদার দেশগুলোকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করতে হয়েছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টও ইইউ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কাজ স্থগিত করতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। আগামী ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি ইইউর অনেক আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ে ভোট হওয়ার কথা ছিল। তবে পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টির নেতা ম্যানফ্রেড ওয়েবার বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অনুমোদন সম্ভব নয়।
এদিকে জার্মান খ্রিষ্টান ডেমোক্র্যাট দলের আইনপ্রণেতা যর্গেন হার্ডট বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান বদলাতে শেষ বিকল্প হিসেবে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপ বয়কটের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
