কেন ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির লাখ লাখ ডলার কাতারের ব্যাংকে রেখেছেন
ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্র যে লাখ লাখ ডলার সংগ্রহ করছে, তা বর্তমানে কাতারে সরিয়ে রাখা হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় অতি প্রয়োজনীয় অর্থ দ্রুত পৌঁছানোর এটি একটি পরোক্ষ উপায়। তবে এই অর্থের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেলের প্রথম বিক্রির কথা জানায় এবং এ থেকে ৫০ কোটি (৫০০ মিলিয়ন) ডলার পাওয়া গেছে বলেও নিশ্চত করে। আগামীতেও বিক্রির মাধ্যমে কয়েক বিলিয়ন ডলার আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট এক সাবেক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, এই অর্থ মার্কিন কোনো ব্যাংকে না রেখে বা সরাসরি ভেনেজুয়েলায় না পাঠিয়ে কাতারে পাঠানো হয়েছে। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বুধবার সন্ধ্যায় জানান, তেল বিক্রির এই অর্থ বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) থেকেই ভেনেজুয়েলায় পৌঁছাতে শুরু করবে। ভেনেজুয়েলার আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানিয়েছে, দেশটির ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যে নগদ অর্থের বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে তেলের অর্থ দেশটিতে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলা গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। গত কয়েক দশকে দেশটির সরকার সেখানকার তেলসম্পদ দখলে নেয়, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের ক্ষতিপূরণ দাবি করে আসছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের তেলসম্পদ চুরি হওয়ার অভিযোগ তুললেও তিনি বলেছেন, তেল বিক্রির অর্থ যেন সরাসরি ভেনেজুয়েলার জনগণের উপকারে আসে এবং যাদের ভেনেজুয়েলার তেল থেকে আয়ের ওপর দাবি রয়েছে, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রের সংগ্রহ করা এই অর্থে হাত দিতে না পারে।
গত শুক্রবার ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে—এই তহবিলের ওপর কোনো লিয়েন (পাওনা আদায়ের অধিকার), ক্রোক বা আইনি রায় কার্যকর করা যাবে না। আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়, এই অর্থ যদি আইনি জটিলতামুক্ত রাখা না যায়, তবে তা ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় বাধা সৃষ্টি করবে।
মূলত পশ্চিমা ব্যবসায়ী এবং পাওনাদারদের নাগালের বাইরে রাখতে অর্থ কাতারের একটি অ্যাকাউন্টে রাখা হয়েছে।
ল্যাটিন আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলা বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'এটি একটি বড় সমস্যা। ভেনেজুয়েলা সবার কাছেই ঋণী।' তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আগেও কাতার দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা সরকারের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে।
অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাইডেন প্রশাসনের সময়ও কাতার একই ধরণের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল, যখন ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে তেল বিক্রির অর্থ পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
ল্যাটিন ও দক্ষিণ আমেরিকান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'ইকোঅ্যানালিটিকা'র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আলেজান্দ্রো গ্রিসান্তি জানান, কাতারি ব্যাংকগুলোকে এই অর্থ ভেনেজুয়েলার ব্যাংকগুলোর কাছে নিলাম করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে খাদ্য, ওষুধ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই অর্থ ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংগ্রহ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত অনুযায়ী বণ্টন করা হবে।
ট্রেজারি সেক্রেটারি বেসেন্ট বলেন, এই অর্থ ভেনেজুয়েলার সরকারি কার্যক্রম, নিরাপত্তা এবং খাদ্য সংস্থানের জন্য ব্যয় করা হবে। তবে অর্থ কাতারে পাঠানোর বিষয়ে হোয়াইট হাউজ সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
তবে প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, 'ভেনেজুয়েলা দীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং আমরা বিদ্যমান আইনি বিধিনিষেধগুলো পর্যালোচনা করছি।'
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের ফলে পাওনাদাররা অর্থ আটকাতে না পারলেও, অর্থ কাতারে রাখার ফলে এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশেষজ্ঞ বলেন, 'যদি এই অর্থ তদারকির জন্য কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা বা দুর্নীতিবিরোধী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকে, তবে এটি একটি 'স্লাশ ফান্ড' (গোপন বা অননুমোদিত তহবিল) হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।'
তাদের মতে, এর অর্থ এই নয় যে ট্রাম্প প্রশাসন এই অর্থ দিয়ে কোনো খারাপ কিছু করবে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দুর্নীতিবাজ অংশ, আধা-সামরিক বাহিনী বা মাদক চক্রকে অর্থায়ন করে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারেন।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন। তিনি বলেন, 'মার্কিন সামরিক বাহিনী কর্তৃক জব্দ করা সম্পদ বিক্রি করে তা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো অফশোর অ্যাকাউন্টে রাখার কোনো আইনি ভিত্তি প্রেসিডেন্টের নেই। এই পদক্ষেপ একজন দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকের কাছে আকর্ষণীয় বলে মনে হবে।'
