'একঘেয়েমি হলো লেখার ওষুধ': রহস্যময়ী আগাথা ক্রিস্টির বিরল সাক্ষাৎকার
আগাথা ক্রিস্টি। নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রহস্য, খুন আর গোয়েন্দাগিরি। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তার লেখা খুনের গল্পগুলো পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে। মৃত্যুর ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে, তবু ব্যক্তি আগাথা ক্রিস্টি আজও এক বড় রহস্য। ১৯৫৫ সালের একটি ধুলো জমা বিবিসি সাক্ষাৎকার হঠাৎ করেই সামনে এনেছে এই লেখকের জীবনের অজানা কিছু অধ্যায়। নিজের লেখা প্লটগুলোর মতোই তার জীবনটাও ছিল জটিল।
ডেম আগাথা ক্রিস্টি ছিলেন চোখের সামনে থেকেও নিজেকে লুকিয়ে রাখার ওস্তাদ। সবার সামনে তিনি ছিলেন পশমি কোট পরা এক হাসিখুশি বয়স্ক নারী, যিনি বাগান করতে, ভালো খেতে, পরিবার আর কুকুর নিয়ে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। কিন্তু এই সাদাসিধে ও আরামদায়ক চেহারার আড়ালেই তিনি পরম আনন্দে বুনতেন বিষ প্রয়োগ, বিশ্বাসঘাতকতা আর রক্তপাতের সব রোমহর্ষক গল্প। নিজের সেই তুখোড় মস্তিষ্কের খোঁজ তিনি বাইরের কাউকে খুব একটা পেতে দিতেন না। ক্রিস্টি ছিলেন স্বভাবগতভাবেই ভীষণ লাজুক।
কিন্তু ১৯৫৫ সালে বিবিসির একটি রেডিও প্রোফাইলের জন্য তিনি লন্ডনের ফ্ল্যাটে এক বিরল সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হন। সেখানে তিনি মুখ খোলেন তার ছকভাঙা শৈশব নিয়ে, জানান কীভাবে সেই শৈশব তার কল্পনার জগত তৈরি করেছিল। কেন উপন্যাস লেখার চেয়ে নাটক লেখা তার কাছে সহজ মনে হতো এবং কীভাবে তিনি মাত্র তিন মাসে একটি আস্ত বই লেখা শেষ করতেন—সবই উঠে এসেছে সেই আলাপে।
১৮৯০ সালে এক সচ্ছল পরিবারে আগাথা মিলারের জন্ম। তার পড়াশোনা মূলত বাড়িতেই। কেন লেখালেখি শুরু করলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ক্রিস্টি বলেছিলেন, 'আমার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, লেখালেখিতে আসার কৃতিত্ব আমি এটাকেই দেব। অবশ্য ১৬ বছর বয়সের দিকে আমি প্যারিসের এক স্কুলে কিছুদিন গিয়েছিলাম। কিন্তু তার আগে সামান্য পাটিগণিত ছাড়া আমার তেমন কোনো পড়ালেখাই ছিল না।'
ক্রিস্টি তার শৈশবকে 'অসাধারণভাবে অলস' বলে বর্ণনা করেছেন। তবে বই পড়ার প্রতি তার ছিল রাক্ষুসে ক্ষুধা। তিনি বলেন, 'আমি নিজে নিজেই গল্প বানাতাম এবং বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতাম। একঘেয়েমি বা অলসতা মানুষকে যেভাবে লিখতে বাধ্য করে, আর কিছু তেমনটা পারে না। তাই ১৬ বা ১৭ বছর বয়সের মধ্যেই আমি বেশ কিছু ছোটগল্প আর একটা লম্বা, একঘেয়ে উপন্যাস লিখে ফেলেছিলাম।'
তিনি জানান, ২১ বছর বয়সে তিনি তার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস লেখা শেষ করেন। বেশ কয়েকবার প্রকাশকদের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ১৯২০ সালে 'দ্য মিস্টেরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস' প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের মাধ্যমেই তার সৃষ্টি করা সবচেয়ে বিখ্যাত চরিত্র এরকুলে পোয়ারোর সঙ্গে দুনিয়ার পরিচয় ঘটে।
গল্পে বিষ দিয়ে মানুষ মারার যে পদ্ধতি তিনি বেছে নিয়েছিলেন, তা তার আকাশকুসুম কল্পনা ছিল না; বরং তা এসেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে। তার প্রথম স্বামী আর্চি ক্রিস্টি তখন ফ্রান্সে যুদ্ধে ছিলেন। ক্রিস্টি তখন দেশে আহত সৈন্যদের হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী নার্স হিসেবে কাজ করতেন। তিনি হাসপাতালের ফার্মেসিতে সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানেই তিনি ওষুধ ও নানা ধরনের বিষ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পান। তার গল্পগুলোতে ৪১টি খুন, হত্যাচেষ্টা ও আত্মহত্যার ঘটনায় বিষ ব্যবহার করা হয়েছে।
ক্রিস্টির রহস্য উপন্যাসের ধরন সাধারণত একই রকম। একই সামাজিক বৃত্তের একদল সন্দেহভাজন ব্যক্তি, তারপর একটি খুন, যা থেকে বেরিয়ে আসে নানা সূত্র। কেন্দ্রে থাকেন একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ বা গোয়েন্দা, যেমন এরকুলে পোয়ারো বা মিস মার্পল। শেষ দৃশ্যে নাটকীয়ভাবে তিনি রহস্য ভেদ করেন এবং সবার সামনে সত্য তুলে ধরেন। এই পরিচিত কিন্তু সবসময় নতুনের স্বাদ দেওয়া গঠনই ক্রিস্টির কাজকে এত দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
১৯২৬ সালে তিনি 'দ্য মার্ডার অফ রজার অ্যাকরয়েড' প্রকাশ করেন। এই বইটি তার পেশাগত খ্যাতি শক্ত করে। কিন্তু সেই বছরই তার ব্যক্তিগত জীবন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। তার মা মারা যান। ওদিকে স্বামী আর্চি স্বীকার করেন যে তিনি অন্য এক নারীর প্রেমে পড়েছেন এবং বিবাহবিচ্ছেদ চান।
শোক আর 'রাইটার্স ব্লক' বা লিখতে না পারার যন্ত্রণায় ভুগে ক্রিস্টি নিজেই এক রহস্যের জন্ম দেন। ডিসেম্বরের এক হাড়কাঁপানো রাতে তার বিধ্বস্ত গাড়িটি সারের এক নির্জন জায়গায় পাওয়া যায়। গাড়িটি একটি খড়িমাটির খাদের ওপর বিপজ্জনকভাবে ঝুলে ছিল। পুলিশ গাড়িতে তার পশমি কোট আর ড্রাইভিং লাইসেন্স পায়। কিন্তু আগাথা ক্রিস্টির কোনো চিহ্ন ছিল না।
ব্রিটেনের ইতিহাসের অন্যতম বড় 'নিখোঁজ সংবাদ' হয়ে ওঠে এটি। একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার জন্য এটি ছিল দারুণ মসলাদার খবর। বিখ্যাত ক্রাইম ঔপন্যাসিক নিখোঁজ, পেছনে ফেলে গেছেন কিছু সূত্র, ঘরে তার সাত বছরের মেয়ে, আর সুদর্শন স্বামী জড়িয়েছেন এক কম বয়সী নারীর প্রেমে। এমনকি শার্লক হোমস-এর স্রষ্টা স্যার আর্থার কনান ডয়েলও এতে জড়িয়ে পড়েন। আগাথার একটি দস্তানা ব্যবহার করে তার খোঁজ পাওয়ার জন্য তিনি এক আধ্যাত্মিক মাধ্যম বা সাইকিক নিয়োগ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণ ও নতুন অধ্যায়
দশ দিন পর তাকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে ২৩০ মাইল দূরে নর্থ ইয়র্কশায়ারের হ্যারোগেট-এর একটি হোটেলে পাওয়া যায়। এ নিয়ে নানা তত্ত্ব ডালপালা মেলে। তার স্মৃতিশক্তি কি হারিয়ে গিয়েছিল? নাকি স্বামীকে লজ্জিত করার জন্য এটি কোনো চাল ছিল? অথবা শুধুই প্রচার পাওয়ার কৌশল? ক্রিস্টি তার আত্মজীবনীতে এই রহস্য পরিষ্কার করেননি। তিনি শুধু লিখেছিলেন, 'তাই অসুস্থতার পর এল দুঃখ, হতাশা আর মন ভাঙার পালা। এ নিয়ে আর কথা বাড়ানোর দরকার নেই।'
কাজের ধরন নিয়েও তিনি ছিলেন বেশ সোজাসাপ্টা। ১৯৫৫ সালে বিবিসিকে তিনি বলেন, 'হতাশাজনক সত্য হলো আমার তেমন কোনো ধরাবাঁধা পদ্ধতি নেই। আমি আমার বহু বছরের পুরোনো বিশ্বস্ত টাইপরাইটারে নিজেই খসড়া টাইপ করি। ছোটগল্প বা নাটকের কোনো অংশ নতুন করে সাজানোর জন্য ডিক্টাফোন বেশ কাজের মনে হয়। কিন্তু উপন্যাস লেখার মতো জটিল কাজের জন্য নয়।'
১৯৩০ সালে ক্রিস্টি প্রত্নতাত্ত্বিক ম্যাক্স ম্যালোয়ানকে বিয়ে করেন। ম্যাক্স তার চেয়ে ১৪ বছরের ছোট ছিলেন। ইরাক ভ্রমণের সময় তাদের পরিচয় হয়। প্রাচীন সংস্কৃতির প্রতি তাদের দুজনেরই আগ্রহ ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ভ্রমণ 'ডেথ অন দ্য নাইল'-এর মতো গল্পের জন্ম দেয়। বইটি ১৯৩৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। নতুন করে পাওয়া এই সুখ তার কাজে গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তী নয় বছরে তিনি ১৭টি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লেখেন।
ক্রিস্টির কাছে লেখার আসল আনন্দ ছিল তার চমৎকার প্লট বা কাহিনি সাজানো। তিনি বলেন, 'আমার মনে হয় আসল কাজটা হলো গল্পের বিকাশ নিয়ে ভাবা। যতক্ষণ না সেটা ঠিকঠাক হচ্ছে, ততক্ষণ দুশ্চিন্তা করা। এতে বেশ সময় লাগতে পারে। তারপর যখন সব উপকরণ হাতে চলে আসে, তখন শুধু লেখার সময় বের করাটাই বাকি থাকে। তিন মাস সময়কে একটা বই শেষ করার জন্য বেশ যুক্তিসঙ্গত মনে হয়, যদি কেউ ঠিকঠাক কাজে বসে।'
১৯৫৫ সালের সেই রেডিও প্রোফাইলে থিয়েটার প্রযোজক স্যার পিটার সন্ডার্স কথা বলেন। তিনি ক্রিস্টির বিখ্যাত নাটক 'দ্য মাউসট্র্যাপ' প্রযোজনা করেছিলেন। তিনি বলেন, ক্রিস্টির মাথায় দৃশ্য ও গল্প সাজানোর এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। সন্ডার্স বলেন, 'আমি একবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ''নতুন নাটকের কী খবর?'' তিনি বললেন, ''শেষ হয়ে গেছে।'' কিন্তু যখন আমি পড়ার জন্য চাইলাম, তিনি খুব সহজভাবে উত্তর দিলেন, ''ওহ, আমি তো ওটা এখনো লিখিনি।'' তার মানে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো নাটকটি তার মাথায় একদম শেষ পর্যায় পর্যন্ত সাজানো ছিল। লেখাটা ছিল শুধুই শারীরিক পরিশ্রম।'
পেঙ্গুইন বুকসের প্রতিষ্ঠাতা স্যার অ্যালান লেনও একই কথা বলেন। ২৫ বছরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে তিনি একবারও ক্রিস্টির টাইপরাইটারের আওয়াজ শোনেননি। অথচ তিনি নিয়মিত প্রচুর লেখা উৎপাদন করতেন। লেন বলেন, মেসোপটেমিয়ার মরুভূমিতে অভিযানের সময় ক্যাম্পের কাজ গোছানো বা সন্ধ্যায় সেলাই করার সময়ও ক্রিস্টির মাথায় হয়তো নতুন কোনো নাটক বা উপন্যাসের কাজ চলত।
ক্রিস্টি বিশ্বাস করতেন তিন মাসে একটা বই লেখা সম্ভব। তবে তিনি বলতেন নাটক 'দ্রুত লেখাই ভালো'। ১৯৫৫ সালে যখন এই বিবিসি প্রোফাইল তৈরি হয়, তখন লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডে তার তিনটি নাটক চলছিল। 'দ্য মাউসট্র্যাপ' প্রিমিয়ারের মাত্র তিন বছর পরেই বক্স অফিসের রেকর্ড ভাঙছিল। এই নাটকটি ১৯৪৭ সালে 'থ্রি ব্লাইন্ড মাইস' নামে একটি বিবিসি রেডিও ড্রামা হিসেবে শুরু হয়েছিল। রানি মেরির ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে এটি প্রচার করা হয়।
ক্রিস্টির মতে, 'বই লেখার চেয়ে নাটক লেখা অনেক বেশি মজার।' তিনি বলেন, 'এখানে জায়গা বা মানুষের দীর্ঘ বর্ণনা নিয়ে ভাবতে হয় না। আবার কাহিনি কীভাবে ছড়াবেন তা নিয়েও ভাবতে হয় না। আর মেজাজ ঠিক রাখতে এবং সংলাপগুলো স্বাভাবিক রাখতে আপনাকে বেশ দ্রুতই লিখতে হয়।'
যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় চলা নাটক
১৯৭৩ সালে লন্ডনের স্যাভয় হোটেলে 'দ্য মাউসট্র্যাপ'-এর ২১তম জন্মদিন পালিত হয়। ক্রিস্টি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন মূল অভিনেতা রিচার্ড অ্যাটেনবরো। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এটি 'আরও ২১ বছর চলতে পারে'। তিনি বলেন, 'আমি একে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালের কাতারে ফেলব না। তবে আমেরিকানরা লন্ডনে এলে ঠিক করে রাখে যে তারা ''দ্য মাউসট্র্যাপ'' দেখবেই।' ১৯৫৭ সালেই এটি যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা নাটকের খেতাব পায়। ২০২০ সালে কোভিড মহামারির কারণেই কেবল এটি থামানো গিয়েছিল। ২০২৫ সালের মার্চে এটি তার ৩০,০০০তম প্রদর্শনী উদযাপন করেছে এবং আজও চলছে।
১৯৫৫ সালের বিবিসি প্রোফাইলে অ্যাটেনবরোর সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, অপরাধ, সহিংসতা বা রক্তহিম করা নাটকের সঙ্গে ক্রিস্টির নামটাই সবার শেষে আসার কথা। তার চিরস্থায়ী রহস্যের সারসংক্ষেপ করে তিনি বলেন, 'আমরা কিছুতেই এটা বিশ্বাস করতে পারতাম না যে, এই শান্ত, গোছানো ও সম্ভ্রান্ত নারী আমাদের গা ছমছমে অনুভূতি দিতে পারেন। তিনি সাসপেন্স বা উত্তেজনার ওপর তার দখল দিয়ে সারা বিশ্বকে মুগ্ধ করেছেন। মঞ্চ ও পর্দায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরিতে তার জুড়ি নেই।'
ক্রিস্টির এই বিবিসি সাক্ষাৎকার তার লেখার পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের চমৎকার ধারণা দেয়। কোনো কঠোর নিয়ম না থাকা, কল্পনার ওপর নির্ভরতা এবং প্লট সাজানোর আনন্দ—সবই এখানে উঠে এসেছে। তবুও নিজে আজও এক রহস্য হয়েই বেঁচে আছেন।
