ইসরায়েলি হামলায় সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর নতুন প্রধান বেছে নিতে যাচ্ছে হামাস
ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস চলতি মাসেই তাদের নতুন প্রধান নির্বাচন করতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে ইসরায়েলি হামলায় ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে। রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে হামাসের দুটি সূত্র।
নতুন নেতা হিসেবে আলোচনায় সবচেয়ে এগিয়ে আছেন খলিল আল-হায়া ও খালেদ মেশাল। বর্তমানে তারা দুজনেই কাতারে অবস্থান করছেন। ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর থেকে হামাসের যে পাঁচ সদস্যের কাউন্সিল সংগঠনটি পরিচালনা করছে, আল-হায়া ও মেশাল উভয়েই সেই কাউন্সিলের সদস্য।
হামাসের একটি সূত্র জানিয়েছে, নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। হামাসের নীতিনির্ধারণী ফোরাম 'শুরা কাউন্সিল'-এর ৫০ সদস্যের গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নতুন নেতা বেছে নেওয়া হবে। এই কাউন্সিলে গাজা উপত্যকা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং প্রবাসে থাকা হামাস প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
তবে নতুন নেতার নাম ঘোষণার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে। কারণ, সিনওয়ারের আগের নেতা ইসমাইল হানিয়াকে ২০২৪ সালে ইরানে এবং পরবর্তীতে সিনওয়ারকেও হত্যা করে ইসরায়েল। ফলে নতুন যিনি দায়িত্ব নেবেন, তিনিও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পর থেকে দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধে হামাস বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহল থেকে সংগঠনটিকে নিরস্ত্রীকরণেরও দাবি উঠছে। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে নতুন নেতৃত্ব বেছে নিতে যাচ্ছে হামাস। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি সংগঠনটির মুখপাত্র।
নতুন প্রধান নির্বাচনের পাশাপাশি চলতি মাসে একজন উপ-প্রধানও বেছে নিতে যাচ্ছে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস। ২০২৪ সালে লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত সালেহ আল-আরুরির স্থলাভিষিক্ত হবেন নতুন এই উপ-প্রধান।
হামাস সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংগঠনের ভেতরে কেউ কেউ সম্মিলিত নেতৃত্বের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের মাধ্যমেই নেতা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
হামাসের নেতৃত্ব নিয়ে পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণে দুই ধরনের ধারা দেখা যাচ্ছে। সম্ভাব্য দুই প্রার্থীর মধ্যে খালেদ মেশালকে দেখা হয় মধ্যপন্থী ও বাস্তববাদী নেতা হিসেবে। সুন্নি মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে খলিল আল-হায়া হামাসের প্রধান আলোচক হিসেবে পরিচিত এবং তিনি ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষপাতী।
১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে হামাস। গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর লড়াই কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনো নাজুক। গাজা উপত্যকার প্রায় অর্ধেক এলাকা এখনো ইসরায়েলের দখলে। সেখানে থাকা ২০ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত মানবেতর।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ সমালোচনাও বাড়ছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত দুই বছরের যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৭১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং পুরো উপত্যকা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ জন অপহৃত হন।
এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা হামাসের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। ট্রাম্পের প্রস্তাবে হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণের কথা বলা হয়েছে।
তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুদ্ধ পরবর্তী গাজা পরিচালিত হবে টেকনোক্র্যাট প্রশাসকদের মাধ্যমে, যা 'বোর্ড অব পিস' নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তদারকি করবে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো হামাসকে 'সন্ত্রাসবাদী সংগঠন' হিসেবে তালিকাভুক্ত করলেও তারা এখনই অস্ত্র ছাড়তে রাজি নয়। হামাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সশস্ত্র সংগ্রামের বিষয়টি সব ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার বিষয়।
কেবল একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হলেই তারা অস্ত্র সমর্পণের কথা বিবেচনা করতে পারে। তবে ইসরায়েল শুরু থেকেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
হামাসের নতুন প্রধান হওয়ার দৌড়ে যে দুজন সবচেয়ে এগিয়ে আছেন, তারা দুজনেই এর আগে ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন।
গাজায় জন্ম নেওয়া খলিল আল-হায়াকে গত সেপ্টেম্বরে কাতারে এক বিমান হামলায় হত্যার চেষ্টা করে ইসরায়েল। তবে ওই ঘটনার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কাতারের আমিরের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক যৌথ ফোনালাপে নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দেন যে ভবিষ্যতে কাতারের মাটিতে এমন হামলা আর চালানো হবে না।
অন্যদিকে, খালেদ মেশাল প্রায় দুই দশক হামাসের নেতৃত্বে ছিলেন। ১৯৯৭ সালে জর্ডানে তাকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টা করেছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। ২০১২ সালে সিরিয়ার আসাদ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হলে ইরানের সঙ্গেও মেশালের দূরত্ব তৈরি হয়।
মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ফিলিস্তিনি শাখা হিসেবে জন্ম হয়েছিল হামাসের। বর্তমানে তারা ফিলিস্তিনের ৯০ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফাতাহ আন্দোলনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
যদিও হামাসের মূল নীতিতে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার কথা বলা হয়েছে, তবে বিভিন্ন সময়ে তারা ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে। যদিও ইসরায়েল বিষয়টিকে হামাসের একটি 'চাল' হিসেবে দেখে থাকে।
