ইরানে অস্থিরতা: ট্রাম্পের পদক্ষেপের অপেক্ষায় নীরব ইসরায়েল
ইরানে চলমান বিক্ষোভের ঢেউ যখন দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, তখন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইসরায়েল এক রহস্যজনক নীরবতা অবলম্বন করছে। বছরের পর বছর ধরে ইরানকে প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া ইসরায়েল এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং এই সুযোগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কী পদক্ষেপ নেন, তার জন্য অপেক্ষা করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত কয়েক দিনে ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু নিরাপত্তা বৈঠক করেছেন। তবে তার মন্ত্রীদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা রয়েছে যেন তারা এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করেন। অথচ এই নেতানিয়াহুই গত গ্রীষ্মে ইরানে আকস্মিক হামলা চালিয়েছিলেন।
বিক্ষোভের শুরুতে ইসরায়েলের বিজ্ঞান মন্ত্রী গিলা গামলিয়েল এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি সেলফি পোস্ট করেছিলেন, যেখানে তাকে 'মেক ইরান গ্রেট এগেইন' লেখা একটি ক্যাপ পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। তিনি ইরানের শেষ সম্রাটের পুত্র রেজা পাহলভিকে ট্যাগ করে বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে একটি ভিডিও বার্তাও দিয়েছিলেন। এর পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অন্তত দুবার মন্ত্রীদের চুপ থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রোববার মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে নেতানিয়াহু কেবল এটুকুই বলেছেন যে, ইসরায়েল ইরানের ঘটনাবলি 'নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ' করছে এবং বিক্ষোভকারীদের 'স্বাধীনতার সংগ্রামকে' সমর্থন করে। তবে তেহরান বা সে দেশের সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো হুঁশিয়ারি দেননি তিনি।
একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, 'সামগ্রিক নির্দেশনা হলো চুপ থাকা। আমাদের ধারণা, আমরা যদি এখন কোনো পদক্ষেপ নেই তবে তা কেবল পরিস্থিতিকে জটিলই করবে।'
ইরানে দুই সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ বর্তমানে ১৮০টিরও বেশি শহর ও জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে। মূলত আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির কারণে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও দ্রুতই তা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়। ইরান সরকার শুরু থেকেই এই অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা করছে।
ইসরায়েলের হস্তক্ষেপ করার অর্থ হলো তেহরানকে সেই সুযোগ করে দেওয়া যা তারা সবচেয়ে বেশি চাচ্ছে। অর্থাৎ, অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বিদেশি শত্রুর দিকে আঙুল তোলা।
ইসরায়েলের একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, 'ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে, হস্তক্ষেপ করার জন্য এটি সঠিক সময় নয়। এই মূহুর্তে জান্তা সরকারকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। তাদের কোনো অজুহাত দেওয়া ঠিক হবে না যার মাধ্যমে তারা দেশের মানুষের সমর্থন আদায় করতে পারে।'
রাজনীতিবিদরা নীরব থাকলেও ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমগুলোতে গত দুই সপ্তাহ ধরে ইরানের খবরই প্রাধান্য পাচ্ছে। গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার স্মৃতি এখনো ইসরায়েলিদের মনে টাটকা। ফলে নতুন করে উত্তেজনার আশঙ্কায় মধ্য ইসরায়েলের বেশ কিছু পৌরসভা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে নাগরিকদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র (শেল্টার) খোলা রাখার কথা জানিয়েছে।
তবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এখনই বড় কোনো হামলার আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছে। সোমবার আইডিএফ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফফি ডেফরিন এক্স-এ লিখেছেন, 'ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে গত কয়েক দিনে অনেক গুজব ছড়াচ্ছে। ইরানে বিক্ষোভ একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছি এবং কোনো পরিবর্তন হলে আপডেট জানানো হবে।'
রামাত গান শহরের মেয়র কারমেল শামা ফেসবুকে লিখেছেন, 'এবার পরিস্থিতি আমাদের ওপর কম এবং ইরানের পরিস্থিতি বা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর বেশি নির্ভর করছে। ইরানি জনগণের জন্য শুভকামনা। তাদের স্বাধীনতা লাভ আমাদেরও সাফল্য।'
ইরানের এই বিক্ষোভ ইসরায়েলের সামরিক পরিকল্পনাকেও কিছুটা জটিল করে তুলেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহকে ইরানের অস্ত্র সহায়তা এবং তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম নিয়ে নেতানিয়াহু সরকার উদ্বিগ্ন ছিল। ইসরায়েলি সূত্রের মতে, এই কার্যক্রমগুলো ঠেকাতে আগে থেকেই যেসব সামরিক অভিযান নিয়ে আলোচনা চলছিল, তা এখন নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ইসরায়েল বর্তমানে 'রক্ষণাত্মক এবং প্রতিক্রিয়াশীল' অবস্থান বজায় রাখছে।
সাবেক ওই নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, 'যেকোনো সামরিক অভিযান এখন তেহরানকে দেশের ভেতরের অস্থিরতা থেকে দৃষ্টি সরানোর অজুহাত এনে দিতে পারে এবং ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।'
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগের সাবেক প্রধান এবং ইন্সটিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (আইএনএসএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক সিমা শাইন বলেন, এই বিক্ষোভের ফলে ইরানে ফের হামলার যেকোনো পরিকল্পনা ইসরায়েল কার্যত 'স্থগিত' রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দেওয়ার পর থেকে ইসরায়েলের এই কৌশলী অবস্থানকে স্বাভাবিক মনে করছেন সিমা শাইন। তিনি বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন নিজেই বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ভাবছেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করছেন, তখন ইসরায়েলের হস্তক্ষেপ করার কোনো কারণ নেই।'
তবে তিনি এ-ও সতর্ক করেছেন যে, ট্রাম্প যদি ইরানে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পদক্ষেপের জবাবে ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালানোর হুমকি বাস্তবায়ন করে।
