এপস্টিন নথি, রাজনৈতিক চাপ: মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি যেভাবে তার চাকরি হারালেন
গত বুধবার গাড়িতে করে হোয়াইট হাউস থেকে অদূরেই অবস্থিত মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছিলেন প্যাম বন্ডি। এরমধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়ে দেন যে, তাকে অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তবে এরপরও প্রায় ২৪ ঘণ্টা তিনি স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন চালিয়ে যান। গাড়ি থেকে নেমে হাসিমুখে সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত হন এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বিষয়ে শুনানি চলাকালে ট্রাম্পের পাশে বসেন। পরে ট্রাম্পের রাজনৈতিক শত্রুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন নিয়ে ফ্লোরিডার এক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটরের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সেদিন সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্টের জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের সময়েও তিনি উপস্থিত ছিলেন।
বন্ডির সহকারীরা তখনও জোর দিয়ে বলছিলেন, "সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছে।"
কিন্তু, বৃহস্পতিবার দুপুর নাগাদ যখন তার অপসারণের খবর গণমাধ্যমে ফাঁস হয়, তখন প্যাম বন্ডি ইতোমধ্যেই ফ্লোরিডায় স্থানীয় শেরিফদের সঙ্গে একটি পূর্বনির্ধারিত বৈঠকে অংশ নিতে পৌঁছে গেছেন। এভাবেই অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তার ১৪ মাসের আলোচিত দায়িত্বকাল শেষ হয়।
প্যাম বন্ডি এমন একটি বিচার বিভাগ রেখে যাচ্ছেন, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইচ্ছানুযায়ী পুনর্গঠিত হয়েছে। এখানে বন্ডির স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন তার ডেপুটি এবং ট্রাম্পের সাবেক আইনজীবী টড ব্ল্যাঞ্চ। তিনি সাময়িকভাবে অন্তর্বর্তী অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বন্ডির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, তাকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ চিহ্নিত করা কঠিন। তবে কয়েক মাস ধরেই ট্রাম্প তার ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন, বিশেষ করে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট আগ্রাসী মামলা না করার অভিযোগে।
একই সঙ্গে দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন-সম্পর্কিত নথিপত্র ইস্যুটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। এই ইস্যুতে ট্রাম্প নিজেও সমালোচনার মুখে পড়েন, কারণ তার সঙ্গে এপস্টেইনের অতীত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, এই দায়িত্ব বন্ডির ওপর ব্যক্তিগতভাবেও বড় চাপ তৈরি করেছিল। অনেক সময় তাকে এমন কাজ করতে বলা হচ্ছিল, যা তিনি নিজেই প্রায় অসম্ভব বলে মনে করতেন।
তার মেয়াদে বিচার বিভাগ কিছু মামলা আদালতে নিতে সক্ষম হয়েছিল, যা ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করেছিল। এর মধ্যে ছিল সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন-এর বিরুদ্ধে গোপন নথি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে মামলা। এছাড়া ট্রাম্প নিজেই জাতীয় গোপন নথির অব্যবস্থাপয় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে, এনিয়ে বিশেষ কাউন্সেল জ্যাক স্মিথের প্রতিবেদন প্রকাশ ঠেকাতেও ভূমিকা রাখে বিচার বিভাগ।
চাকরিচ্যুতির পর বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে প্যাম বন্ডি জানান, তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি খাতের দায়িত্বে যাচ্ছেন। নতুন চাকরির বিষয়ে "আমি অত্যন্ত উৎসাহী"- বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই সিনেটে অনুমোদন পাওয়ার সময় বন্ডি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।
কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি বিচার বিভাগকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক লক্ষ্য অনুযায়ী পরিচালনা করতে শুরু করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
তার সময়ে বহু অভিজ্ঞ প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং এমন কিছু দপ্তর বন্ধ করা হয় যেগুলো হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় তদন্ত করছিল।
এ সময় ট্রাম্পের নির্দেশে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়, যার মধ্যে ছিলেন সাবেক এফবিআই পরিচালক জেমস কমে, নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস এবং সিনেটর অ্যাডাম স্কিফ।
তবে এসব মামলার অনেকগুলোই আদালতে টেকেনি বা জুরি বোর্ডে খারিজ হয়ে যায়।
বন্ডির এই দুর্বল পারফরম্যান্স তাকে একাধিকবার চাপে ফেলে। জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাকে এবং কিছু মার্কিন অ্যাটর্নিকে "দুর্বল ও অকার্যকর" বলে সমালোচনা করেন।
তখন হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস সাময়িকভাবে তাকে রক্ষা করেন। অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থার প্রধান লী জেলডিন নেপথ্যে এই পদে আসার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানা যায়।
এরপরেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতে বন্ডি শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছেন বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তিনি এবং টড ব্ল্যাঞ্চ প্রেসিডেন্টকে দেখানোর চেষ্টা করেন যে তারা তার অগ্রাধিকার অনুযায়ী কাজ করছেন। এভাবে সম্ভবত তার চাকরি বাঁচানোরও চেষ্টা চালান।
ভোট জালিয়াতির প্রমাণহীন অভিযোগ তদন্ত না হওয়ায় ট্রাম্প যখন ক্ষুব্ধ ছিলেন, তখন বন্ডি জর্জিয়ার প্রসিকিউটরদের ফুলটন কাউন্টির নির্বাচন কার্যালয় থেকে ব্যালট জব্দের জন্য তল্লাশি পরোয়ানা চাওয়ার অনুমতি দেন। পাশাপাশি সাবেক কংগ্রেসম্যান ড্যান বিশপকে দেশজুড়ে সব নির্বাচনসংক্রান্ত তদন্ত তদারকির দায়িত্ব দেন।
এপস্টেইন ইস্যুতে নতুন করে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে তিনি আইনপ্রণেতাদের জন্য একটি বন্ধদ্বার বৈঠকের আয়োজন করেন। কিন্তু সেই বৈঠক ভেস্তে যায় এবং ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা আধা ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াকআউট করেন।
সূত্রগুলোর মতে, তথাকথিত 'অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন' (রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারব্যবস্থার ব্যবহার রোধ) সংক্রান্ত বৈঠকও বেড়ে যায়, একই সঙ্গে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত তদন্তগুলোর ওপর প্রসিকিউটরদের ওপর চাপও বৃদ্ধি পায়।
এছাড়া এই সপ্তাহে বন্ডি শেষ চেষ্টা হিসেবে ট্রাম্পকে দেখাতে চান যে তিনি প্রেসিডেন্টের কাঙ্ক্ষিত মামলাগুলো এগিয়ে নিতে পারবেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি মায়ামির মার্কিন অ্যাটর্নি জেসন রেডিং-সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠান, যেখানে সাবেক সিআইএ পরিচালক জন ব্রেনান-এর বিরুদ্ধে তদন্তের অগ্রগতি ও সময়সীমা নিয়ে আলোচনা হয়।
এপস্টেইন ফাইলস: বড় ধাক্কা
বন্ডির জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে ওঠে এপস্টেইন নথিসংক্রান্ত ইস্যু।
এপস্টেইন নথি হলো মার্কিন অর্থদাতা, বিনিয়োগকারী এবং কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন ও তার সহযোগী ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে পরিচালিত ফৌজদারি তদন্ত, আইনি লড়াই এবং তাদের কার্যকলাপের সাথে সম্পর্কিত হাজার হাজার পৃষ্ঠার গোপন নথি, ফ্লাইট লগ, ইমেল ও ডিজিটাল রেকর্ড।
২০২৫ সালের শেষের দিকে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, মার্কিন বিচার বিভাগ এই সম্পর্কিত ৩০ লক্ষের বেশি পৃষ্ঠার নথি অবমুক্ত করেছে, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে আরও নথি প্রকাশের চাপের মুখে রয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ। এতে করে এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতার অনেক তথ্য প্রকাশ পাবে বলে ট্রাম্প আশঙ্কা করছেন।
কিন্তু, সংকটের শুরুটা হয় প্যাম বন্ডির অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যেই, যখন তিনি ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, জেফরি এপস্টেইন একটি 'ক্লায়েন্ট তালিকা' "এই মুহূর্তে আমার ডেস্কে রয়েছে।"
সূত্রগুলো মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-কে জানিয়েছে, এই মন্তব্যে হোয়াইট হাউসও বিস্মিত হয়েছিল। পরে বন্ডি বলেন, তিনি আসলে এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিপত্রকে সাধারণভাবে বোঝাতে চেয়েছিলেন।
তবে ততক্ষণে সাক্ষাৎকারটি সামাজিক মাধ্যমে তীব্র আলোড়ন তোলে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয় যে, বহুদিনের গুঞ্জন থাকা এমন প্রমাণ অবশেষে প্রকাশ হতে যাচ্ছে—যা এপস্টেইনের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবে।
কিন্তু পরে বিচার বিভাগ জানায়, এমন কোনো 'ক্লায়েন্ট তালিকা' আদৌ নেই। ফলে একটি টেলিভিশন মন্তব্য থেকে শুরু হওয়া বিষয়টি বড় ধরনের জনসংযোগ সংকটে রূপ নেয়।
পরবর্তী কয়েক মাসের জনমতের চাপে মার্কিন কংগ্রেস বা প্রতিনিধি পরিষদ একটি নতুন আইন পাস করে, যাতে বিচার বিভাগকে এপস্টেইন-সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশ করতে বলা হয়। তবে আইনটি অতিরিক্ত বিস্তৃত এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় যথেষ্ট নয়—এমন সমালোচনাও উঠে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা বন্ডির এই ইস্যু সামাল দিতে ব্যর্থতায় ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে হোয়াইট হাউস সাময়িকভাবে তাকে ফক্স নিউজে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত রাখে এবং বিচার বিভাগের জনসংযোগ ও কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব টড ব্ল্যাঞ্চ-এর ওপর দেয়।
এনিয়েও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ব্যক্তিগতভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেন, কারণ তিনি এই ইস্যুর দ্রুত সমাধান চান।
গত মাসে এপস্টেইন নথি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য বন্ডিকে সমন জারি করা হয়—যা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা হয়। সম্প্রতি পদ হারানোর পরও তাকে সেখানে হাজিরা দিতে হবে।
এদিকে অন্তর্বর্তী অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে প্রথম জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যে টড ব্ল্যাঞ্চে বলেন, এপস্টেইন ফাইলসের সঙ্গে বন্ডির অপসারণের কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, "গত এক বছরে বিচার বিভাগের জন্য এপস্টেইন নথি একটি বিষয় ছিল, কিন্তু ভবিষ্যতে এটি আর কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে আমি মনে করি।"
এ সময় অনুষ্ঠানের সঞ্চালক জেসি ওয়াটারস হাসতে হাসতে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, "আমি মনে করি না, মানুষ এই বিষয়টি নিয়ে কী মনে করে তা আপনি পুরোপুরি বুঝতে পারছেন।"
