‘আমরা কী করব, তা বাইরের কেউ ঠিক করে দিতে পারে না’: ট্রাম্পের চুক্তির প্রস্তাব নিয়ে কিউবার প্রেসিডেন্ট
ভেনেজুয়েলার তেল ও আর্থিক সহায়তা বন্ধের হুমকি দিয়ে কিউবাকে একটি 'চুক্তি' করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্পের এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল বলেছেন, কিউবা কী করবে, তা 'বাইরের' কেউ নির্ধারণ করে দিতে পারে না।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ছিল—খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই কিউবাকে একটি চুক্তিতে আসতে হবে। তার জবাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে কিউবার প্রেসিডেন্ট বলেন, 'আমরা কী করব, তা কেউ বলে দিতে পারে না।'
তিনি বলেন, 'কিউবা ৬৬ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের শিকার হয়ে আসছে। কিউবা কাউকে আক্রমণের হুমকি দেয় না, তবে মাতৃভূমি রক্ষায় শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়তে প্রস্তুত।'
ট্রাম্পের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে দিয়াজ-ক্যানেল বলেন, যারা মানুষের জীবনসহ সবকিছুকেই 'ব্যবসা' হিসেবে দেখে, কিউবার দিকে আঙুল তোলার মতো কোনো নৈতিক অধিকার তাদের নেই।
দশকের পর দশক ধরে জ্বালানি সমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলা থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ও আর্থিক সহায়তা পেয়ে আসছে কিউবা। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক অভিযানে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে।
ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ করবে। এর ফলে কিউবা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিজের প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ট্রাম্প লিখেছেন, 'কিউবা অনেক বছর ধরে ভেনেজুয়েলার তেল ও অর্থের ওপর বেঁচে ছিল। বিনিময়ে তারা ভেনেজুয়েলার গত দুজন স্বৈরশাসককে 'নিরাপত্তা সেবা' দিয়েছে। কিন্তু এটি আর চলবে না!'
ট্রাম্প আরও যোগ করেন, 'কিউবায় আর কোনো তেল বা টাকা যাবে না—একদম শূন্য!' তবে চুক্তির ক্ষেত্রে কিউবাকে ঠিক কী করতে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।
এদিকে কিউবা সরকার জানিয়েছে, মাদুরোকে আটকের জন্য চালানো ওই মার্কিন অভিযানে তাদের ৩২ জন -নাগরিক নিহত হয়েছেন।
ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর পতনের পর কিউবার ওপর এই চাপ প্রয়োগকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের পটপরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে দিয়াজ-কানেল শুরুতেই স্পষ্ট করে দিলেন যে, কোনো চাপের মুখে কিউবা তাদের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেবে না।
এর আগে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ স্পষ্ট করে বলেন, কোনো ধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপ ছাড়াই অন্য দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির 'একচ্ছত্র অধিকার' কিউবার রয়েছে। ভেনেজুয়েলাকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে কিউবা তেল ও অর্থ সহায়তা পেত—ট্রাম্পের এমন দাবিকেও তিনি নাকচ করে দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করে রদ্রিগেজ বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র একটি অপরাধী ও নিয়ন্ত্রণহীন আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে আচরণ করছে। তারা শুধু কিউবা বা এই অঞ্চলের নয়, বরং গোটা বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
এদিকে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিউবার সঙ্গে 'কথা বলা' হচ্ছে। তবে এই আলোচনা ঠিক কোন পর্যায়ে হচ্ছে, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। ট্রাম্প জানান, কিউবা থেকে বাধ্য হয়ে চলে আসা মানুষদের বিষয়টি তিনি আলোচনায় তুলতে চান।
তবে কিউবার প্রেসিডেন্ট সোমবার স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অভিবাসন সংক্রান্ত কিছু 'কারিগরি যোগাযোগ' ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের আর কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের অবরোধ বা 'ব্যর্থ নীতি'র কারণেই কিউবার মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা জানিয়ে দিয়াজ-কানেল বলেন, 'সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে আমরা বর্তমান মার্কিন প্রশাসনসহ যেকোনো সরকারের সঙ্গেই গঠনমূলক আলোচনায় বসতে রাজি। তবে সেটি হতে হবে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে এবং আমাদের স্বাধীনতার প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়ে।'
১৯৬১ সাল থেকে সমাজতান্ত্রিক কিউবায় একদলীয় শাসন চলছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই দেশটিতে ক্ষমতার পরিবর্তন চাইছে। এবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন প্রশাসনে কিউবান বংশোদ্ভূত মার্কো রুবিওকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনোনীত করার পর সেই চাপ আরও জোরালো হয়েছে। মিয়ামির কিউবান নির্বাসিত পরিবারে বেড়ে ওঠা রুবিও শুরু থেকেই কিউবার সমাজতান্ত্রিক শাসনের কট্টর সমালোচক।
ভেনেজুয়েলার তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির পর কিউবার সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। রাজধানী হাভানার বাসিন্দাদের কেউ কেউ চিন্তিত, আবার কেউ বলছেন—তারা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত।
দীর্ঘদিনের মার্কিন অবরোধ আর জ্বালানি সংকটে কিউবার জনজীবন এমনিতেই বিপর্যস্ত। ট্রাম্পের এই নতুন হুঁশিয়ারি দ্বীপরাষ্ট্রটির সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
