২৭ বছর ধরে পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণ: অবশেষে বাড়ি ফেরার পথে 'মিশ্র অনুভূতি' কার্ল বুশবির
ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন ১৯৯৮ সাল। দক্ষিণ আমেরিকার চিলি থেকে হাঁটা শুরু করেছিলেন ব্রিটিশ যুবক কার্ল বুশবি। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, পায়ে হেঁটেই বিশ্ব ঘুরে নিজের শহর 'হাল'-এ ফিরবেন। কোনো বাস, ট্রেন বা বিমানে চড়বেন না। সেই প্রতিজ্ঞা রাখতে গিয়ে একে একে কেটে গেছে দীর্ঘ ২৭টি বছর। পার করেছেন ৫৮ হাজার কিলোমিটার (৩৬ হাজার মাইল) পথ। অবশেষে সেই মহাযাত্রার শেষ ম্যাপটি হাতে নিয়েছেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক এই প্যারাট্রুপার।
শুরুতে কার্ল ভেবেছিলেন এই পথ পাড়ি দিতে ১২ বছর লাগবে। কিন্তু বিশ্বরাজনীতি, যুদ্ধ আর ভিসা জটিলতায় সময় লাগল দ্বিগুণেরও বেশি। গত বড়দিনের আগেই তিনি পৌঁছেছেন হাঙ্গেরির গিয়র শহরে। সেখান থেকে অস্ট্রিয়া সীমান্ত আর মাত্র কয়েক দিনের হাঁটা পথ। সব ঠিক থাকলে আগামী অক্টোবরেই তিনি বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছাবেন, দেখা করবেন মা অ্যাঞ্জেলার সঙ্গে।
তবে একনাগাড়ে হাঁটার সুযোগ তার নেই। ভিসার নিয়ম রক্ষার চক্করে পড়ে তাকে এখন অবস্থান করতে হচ্ছে মেক্সিকোতে। সেখান থেকেই কার্ল জানালেন, আগামী মার্চে তিনি আবার হাঙ্গেরি ফিরে যাবেন এবং অস্ট্রিয়া সীমান্ত থেকে হাঁটা শুরু করবেন।
দীর্ঘ এই পথচলা শেষ হওয়ার আগে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে কার্ল বলেন, 'বিষয়টি এখন শেষ করা দরকার। তবে আমার মধ্যে মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে। হুট করে এই থামাটা বেশ কঠিন হবে; এটা তো একটা জীবনের সমাপ্তি। এরপর কী হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে।'
তার এই যাত্রা বারবার থমকে গেছে বিভিন্ন দেশের কঠোর নিয়মের কারণে। কার্ল জানান, অনেক দেশে ১৮০ দিনের মধ্যে ৯০ দিনের বেশি থাকার নিয়ম নেই। তিনি বলেন, 'আমার নিজের হাতে থাকলে আমি হয়তো না থেমেই চলতাম। কিন্তু নিয়মের বেড়াজালে পড়ে আমাকে বারবার ভিসা নবায়ন করতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছুটতে হয়।'
দক্ষিণ আমেরিকা জয়ের পথটা মোটেও সহজ ছিল না। পানামা ও কলম্বিয়ার মাঝে 'দারিয়েন গ্যাপ'-এর গহীন জঙ্গলে অপরাধী চক্র বা গ্যাংদের চোখ এড়িয়ে তাকে এগোতে হয়েছে। এরপর ২০০৬ সালে বরফজমা বেরিং প্রণালি পার হয়ে তিনি যখন সাইবেরিয়ার দিকে এগোবেন, তখনই বাধা হয়ে দাঁড়ায় ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দা।
পুরোনো দিনের কথা মনে করে বুশবি বলেন, 'অর্থনৈতিক ধসের কারণে আমি স্পনসর হারিয়ে ফেলি। সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য মেক্সিকোকেই তখন আদর্শ জায়গা মনে হয়েছিল। শেষমেশ সেখানে দুই বছর আটকে থাকি।'
মেক্সিকোর জীবন নিয়ে তিনি বলেন, 'এখানে জীবনযাত্রার খরচ কম, মানুষগুলোও অসাধারণ। আর আমার তো টি-শার্ট, হাফপ্যান্ট আর একজোড়া স্যান্ডেল হলেই চলে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে কাছেই আমার এক স্পনসরও আছেন।'
মেক্সিকোতে এখন তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন আর শেষবারের মতো নিজেকে প্রস্তুত করছেন। তিনি বলেন, 'অস্ট্রিয়ায় ঢুকতে আর বেশি দেরি নেই। এরপর জার্মানি, বেলজিয়াম ও ফ্রান্স হয়ে সোজা বাড়ি।'
বয়স বেড়েছে, তাই হাঁটার গতিও কিছুটা কমেছে। তিনি জানান, আগে দিনে ৩০ কিলোমিটার (১৯ মাইল) হাঁটতেন, এখন তা কমে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটারে (১২ থেকে ১৬ মাইল) নেমে এসেছে।
যুক্তরাজ্যে ঢোকার জন্য তিনি চ্যানেল টানেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা করছেন। তার ইচ্ছা, সাগরতলের সার্ভিস টানেল ব্যবহার করে হেঁটেই তিনি তার দেশে প্রবেশ করবেন।
