বিনা বিচারে ২০ বছর আটক, নির্যাতন: গুয়ান্তানামোর বন্দিকে ‘বড় অঙ্কের’ ক্ষতিপূরণ দিল যুক্তরাজ্য
সিআইএ-এর নির্যাতনের শিকার এবং প্রায় ২০ বছর ধরে বিনা বিচারে গুয়ান্তানামো বে-তে আটক এক ব্যক্তিকে যুক্তরাজ্য সরকার 'বড় অঙ্কের' ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। খবর বিবিসি'র।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর সিআইএ-এর তথাকথিত 'কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ' পদ্ধতির শিকার হওয়া প্রথম ব্যক্তি ছিলেন আবু জুবাইদাহ। সে সময় দাবি করা হয়েছিল, তিনি আল-কায়েদার একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য। তবে পরবর্তী সময়ে মার্কিন সরকার ওই অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়।
জুবাইদাহর ওপর চরম নির্যাতন চালানো হচ্ছে—এমন তথ্য জানা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-ফাইভ ও এমআই-সিক্স তাকে জিজ্ঞাসাবাদের কাজে ব্যবহারের জন্য সিআইএ-এর কাছে প্রশ্ন পাঠিয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার ওপর সংঘটিত নির্যাতনে 'সহায়তা' করেছে—এ অভিযোগে জুবাইদাহ যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেন। শেষ পর্যন্ত মামলাটি একটি আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।
জুবাইদাহর আন্তর্জাতিক আইনজীবী অধ্যাপক হেলেন ডাফি বলেন, 'এই ক্ষতিপূরণ গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এটি পর্যাপ্ত নয়।'
তিনি যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য সরকার, যাদের ওপর জুবাইদাহর 'চলমান নির্যাতন ও বেআইনি আটকের দায়ভার' রয়েছে, তাদের প্রতি তাকে মুক্ত করার আহ্বান জানান।
ডাফি বলেন, 'তার অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি কেবল অতীতের ঘটনা নয়; এটি এখনও অব্যাহত রয়েছে।'
এমআই-সিক্সের তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা গোয়েন্দা সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবে না।
আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে জুবাইদাহ ঠিক কত পরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাচ্ছেন, তা প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে জানান ডাফি। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি 'বড় অঙ্কের অর্থ', এবং অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে জুবাইদাহ নিজে ওই অর্থ ব্যবহার করতে পারছেন না।
জুবাইদাহর মামলাটি পর্যালোচনা করা একটি সংসদীয় তদন্ত কমিটির প্রধান ডমিনিক গ্রিভ বলেন, এই আর্থিক সমঝোতা একটি 'খুবই অস্বাভাবিক' ঘটনা। তবে তার মতে, জুবাইদাহর সঙ্গে যা ঘটেছে, তা 'স্পষ্টতই' ভুল ছিল।
সৌদি আরবে জন্ম নেওয়া ফিলিস্তিনি নাগরিক জুবাইদাহ ২০০৬ সাল থেকে কিউবার গুয়ান্তানামো বে-তে অবস্থিত মার্কিন সামরিক কারাগারে বিনা অভিযোগে এবং কোনো দণ্ড ছাড়াই বন্দি রয়েছেন।
তার ওপর চালানো বাজে আচরণের বিস্তারিত বিবরণসংবলিত একাধিক আদালতের রায় ও সরকারি প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও, বর্তমানে সেখানে আটক থাকা ১৫ জন বন্দির একজন তিনি। তাকে ব্যাপকভাবে 'চিরস্থায়ী বন্দি' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
জুবাইদাহ প্রথম ২০০২ সালে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক হন। এরপর লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ডসহ ছয়টি দেশে সিআইএ পরিচালিত বিভিন্ন 'ব্ল্যাক সাইটে' (গোপন কারাগার) তাকে চার বছর ধরে আটক রাখা হয়।
'ব্ল্যাক সাইট' বলতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এমন গোপন আটক কেন্দ্রকে বোঝানো হয়, যা মার্কিন বিচারব্যবস্থার আওতার বাইরে পরিচালিত হতো। জুবাইদাহ ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যাকে এ ধরনের কোনো কেন্দ্রে আটক রাখা হয়েছিল।
প্রথমবার হেফাজতে নেওয়ার পর সিআইএ কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, তাকে আজীবনের জন্য বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা উচিত।
এমআই-সিক্সের অভ্যন্তরীণ বার্তাগুলোতে দেখা যায়, সংস্থাটির ধারণা ছিল—জুবাইদাহর ওপর যে ধরনের আচরণ করা হয়েছে, তা যদি মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের সদস্যদের ওপর প্রয়োগ করা হতো, তবে তাদের ৯৮ শতাংশই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ত। তা সত্ত্বেও, বন্দি অবস্থায় তার সঙ্গে কেমন আচরণ করা হচ্ছে সে বিষয়ে কোনো আশ্বাস চাইতে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা চার বছর সময় নিয়েছিল।
জুবাইদাহর আটককে তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ব্যক্তিগতভাবে এই আটকের বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করেন। তিনি দাবি করেন, জুবাইদাহ আল-কায়েদার একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য, যিনি 'হত্যাকাণ্ডের ছক ও পরিকল্পনা করছিলেন'। পরে মার্কিন সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয় এবং বর্তমানে আর তারা দাবি করে না যে তিনি আল-কায়েদার সদস্য ছিলেন।
৯/১১ হামলার পর সিআইএ যে অত্যন্ত বিতর্কিত জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করেছিল, তার 'গিনিপিগ' হিসেবেই জুবাইদাহকে বর্ণনা করা হয়।
সিআইএ-এর আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন সিনেট সিলেক্ট কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুবাইদাহ নিয়মিত এমন আচরণের শিকার হতেন, যা যুক্তরাজ্যের মানদণ্ড অনুযায়ী নির্যাতনের শামিল। এর মধ্যে রয়েছে ৮৩ বার ওয়াটারবোর্ডিং (পানিতে ডুবিয়ে শ্বাসরোধের অনুভূতি সৃষ্টি করা), কফিনের মতো বাক্সে আটকে রাখা এবং শারীরিক নির্যাতন।
ডাফি বলেন, যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জুবাইদাহকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠিয়ে কার্যত এই নির্যাতনের 'সমারোহ তৈরি করেছিল'।
জুবাইদাহর সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছিল, তা নিয়ে সিনেটের প্রতিবেদনে তীব্র সমালোচনা করা হয়। একইভাবে, যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কমিটির ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কঠোর সমালোচনা উঠে আসে।
৯/১১ হামলার কথিত মূল পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মোহাম্মদের ক্ষেত্রে এমআই-ফাইভ ও এমআই-সিক্সের ভূমিকা নিয়েও সংসদীয় কমিটি প্রশ্ন তোলে। কমিটির মতে, তিনিও হয়তো একইভাবে আইনি দাবি তুলতে পারেন।
কোনো মামলা দায়ের বা নিষ্পত্তি হয়েছে কি না—বিবিসির এমন প্রশ্নের জবাবে সরকার কিংবা মোহাম্মদের আইনজীবী কেউই মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গ্রিভ বলেন, যুক্তরাজ্যের কাছে এমন প্রমাণ ছিল যে 'আমেরিকানরা এমন আচরণ করছিল, যা আমাদের জন্য সত্যিকার অর্থেই গভীর উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত ছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জোরালোভাবে তোলা উচিত ছিল এবং প্রয়োজনে সহযোগিতা বন্ধ করে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে আমরা তা করতে ব্যর্থ হয়েছি।'
ডাফি জানান, জুবাইদাহ তার মুক্তি নিশ্চিত করতে এবং নতুন করে জীবন শুরু করতে অত্যন্ত আগ্রহী।
তিনি বলেন, 'আমি আশাবাদী যে, এই বড় অঙ্কের অর্থ তাকে নতুন জীবন গড়তে এবং বাইরের জগতে নিজের খরচ চালাতে সহায়তা করবে।'
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সবকিছুই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আদৌ তার মুক্তি নিশ্চিত করছে কি না, তার ওপর।
