ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুমকির পর কানাডায় উদ্বেগ, এবার কি তাদের পালা?
বেশ কয়েক মাস ধরে কানাডিয়ানরা আশা করেছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের দেশটিকে ৫১তম মার্কিন রাজ্যে পরিণত করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। ওয়াশিংটন আর বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থা ওলটপালট করা নিয়েই তো তার ব্যস্ততা। কিন্তু সেই আশা এখন কমে আসছে।
হঠাৎ করেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে ট্রাম্পের কড়া কথায় ভয় বেড়েছে কানাডায়। দেশটির সার্বভৌমত্ব নিয়ে ট্রাম্পের পুরোনো হুমকিগুলো এখন আর হেলাফেলা করার মতো মনে হচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণা—'এই গোলার্ধ আমাদের'—কানাডাকে ভাবিয়ে তুলেছে। আগে মনে হতো, ট্রাম্প হয়তো সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে খোঁচা দিতে বা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে দর কষাকষির কৌশল হিসেবে কানাডা দখলের কথা বলছেন। কিন্তু এখন আর তা নিছক কথার কথা মনে হচ্ছে না।
কানাডার সবচেয়ে বড় জাতীয় দৈনিক গ্লোব অ্যান্ড মেইলে প্রকাশিত একটি কলাম এই সপ্তাহে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে সতর্ক করা হয়েছে, ট্রাম্প হয়তো কানাডার বিরুদ্ধে 'সামরিক জবরদস্তি' করতে পারেন। লেখকদের পরামর্শ: রাশিয়ার বিরুদ্ধে ফিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নিন। সিভিল ডিফেন্স ফোর্স বাড়ান। ইউক্রেনের উদাহরণ মেনে জাতীয় ড্রোন কৌশল তৈরি করুন। আর ভাবুন সেই অকল্পনীয় পরিস্থিতির কথা।
নিবন্ধের অন্যতম লেখক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক টমাস হোমার-ডিক্সন বলেন, 'পুরো ব্যাপারটা হলো হিসাব-নিকাশ বদলে দেওয়া। আমাদের বিরুদ্ধে যদি সামরিক জবরদস্তির চেষ্টা করা হয়, তবে এটা স্পষ্ট করে দিতে হবে যে এর চড়া মূল্য দিতে হবে।'
এই ভয় থেকে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ডার্ক কমেডি বা তিক্ত রসিকতা। স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক ওয়েবসাইট 'দ্য বিভারটন'-এর একটি গল্পের শিরোনাম ছিল—'মার্ক কার্নি ফোনের জিওলোকেশন বন্ধ করে দিয়েছেন, যদি কিছু হয়।'
ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে বিশ্বনেতারা এমনিতেই তটস্থ, কিন্তু কানাডিয়ানদের ভয়ের কারণটা একটু আলাদা। গ্রিনল্যান্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, ট্রাম্প এমন একটি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ চাইছেন—এমনকি সামরিক পদক্ষেপের কথাও ভাবছেন—যা গণতান্ত্রিক, আর্কটিক অঞ্চলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ন্যাটোর অংশ। কানাডাও ঠিক তা-ই।
নিরাপত্তা ও সীমান্ত বিষয়ে কানাডা সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ওয়েসলি ওয়ার্ক বলেন, 'আমার মনে হয় অটোয়ার অনেক কর্মকর্তা বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে আমরা এমন পরিস্থিতিতে আছি, প্রমাণ যা-ই হোক না কেন।' ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের পদক্ষেপকে তিনি কানাডার জন্য 'চূড়ান্ত সতর্কবার্তা' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো নেই।
কিন্তু ট্রাম্পকে নিরস্ত করতে কানাডা কী করতে পারে, তা স্পষ্ট নয়। গত বছর কার্নি নির্বাচনে জিতেছিলেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে। তিনি বলেছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট 'আমাদের ভেঙে দিতে চান, যাতে আমেরিকা আমাদের মালিক হতে পারে।' তবে নির্বাচনের পর থেকে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিবাদ এড়িয়ে চলছেন। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছেন। কার্নি এই সপ্তাহে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তবে কানাডা নিয়ে ট্রাম্পের পুরোনো হুমকির বিষয়ে টুঁ শব্দটিও করেননি।
বেশির ভাগ বিশ্লেষক অবশ্য মনে করেন না যে মার্কিন সেনাবাহিনী কানাডায় হামলা চালাবে। অটোয়ার কার্লটন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক এবং সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক স্টেফানি কারভিন বলেন, 'আমি এখনো বিশ্বাস করি এটা সায়েন্স ফিকশনের রাজ্যে আছে।' তবে তিনি যোগ করেন, 'কিন্তু আমি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাস করি যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্টের খেয়ালখুশি মতো কানাডার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে প্রস্তুত।'
ভেনেজুয়েলার তেলভাণ্ডারের ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘটনা তাকে আরও সাহসী করেছে বলে মনে করেন কারভিন। তিনি বলেন, 'প্রেসিডেন্ট এখন পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য বিস্তারের জন্য আরও দুঃসাহসী অভিযানে নামতে আগ্রহী হবেন।'
কার্লটন ইউনিভার্সিটির প্রতিরক্ষা নীতি বিশেষজ্ঞ ফিলিপ লাগাসে বলেন, একটি বিশ্বাসযোগ্য দৃশ্যপট হতে পারে এমন কোনো সমস্যা যা কানাডা একা সামলাতে পারবে না। যেমন বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ সরবরাহে হামলা। তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র তখন আপনার হয়ে সমস্যাটি সমাধান করবে, অন্তত এই প্রশাসনের অধীনে। এবং তারা হয়তো আর ফিরে যাবে না। অথবা তারা আপনার কাছে নানা দাবি করতে পারে।' তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'নিজের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি কানাডায় হস্তক্ষেপ করতে চায়, তবে তা ঠেকাতে কানাডা কী করতে পারে?'
কানাডার সেনাবাহিনী বৈরী বিশ্বের জন্য প্রস্তুত নয়। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এই ভূখণ্ড রক্ষায় তাদের নিয়মিত ও রিজার্ভ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা এক লাখেরও কম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং লাটভিয়ার মতো জায়গায় ন্যাটো মিশনে সেনা মোতায়েন করতে গিয়ে তাদের সম্পদ এমনিতেই টানটান অবস্থায় আছে।
কার্নি সরকার সেনা নিয়োগ বাড়াতে বেতন বাড়াচ্ছে এবং নতুন যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন ও অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য হাজার কোটি ডলার বরাদ্দ দিচ্ছে। এর মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত কানাডা জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের ন্যাটোর শর্ত পূরণ করতে পারবে। কানাডিয়ান মিডিয়ায় খবর এসেছে, ১ লাখ রিজার্ভ ও ৩ লাখ সাপ্লিমেন্টারি রিজার্ভ সেনা তৈরির পরিকল্পনা চলছে। কিন্তু এসব বাস্তবায়নে কয়েক বছর লেগে যাবে।
এরই মধ্যে কানাডার রাজনীতিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের শঙ্কাও উঁকি দিচ্ছে।
তেলসমৃদ্ধ আলবার্টা প্রদেশ অটোয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকতে দীর্ঘদিন ধরেই নারাজ। সেখানে স্বাধীনতার গণভোটের দিকে এগোচ্ছে পরিস্থিতি। কিছু তথাকথিত ট্রাম্প সমর্থক শুধু কানাডা ছাড়তেই চায় না, তারা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখে। বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা জেফরি রাথ ব্লুমবার্গ নিউজকে জানিয়েছেন, তিনি তিনবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং তারা তার উদ্দেশ্যকে সমর্থন দিচ্ছেন। তবে তিনি কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ করেননি এবং পররাষ্ট্র দপ্তরও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
প্রাথমিক জরিপে দেখা গেছে, আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদীরা হেরে যেতে পারে। কিন্তু এই গণভোট বিদেশি হস্তক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে মনে করেন হোমার-ডিক্সন ও তার সহকর্মী অ্যাডাম গর্ডন। তারা এমন এক পরিস্থিতির কথা বলছেন, যেখানে 'গ্রে মাগা মানি' বা অস্পষ্ট উৎসের টাকা এবং অপপ্রচার ব্যবহার করে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাহায্য করা হতে পারে। অথবা স্বাধীনতার চেষ্টা ব্যর্থ হলে ফলাফলের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করা হতে পারে। তারা বলছেন, কানাডিয়ানদের ভাবা উচিত, আলবার্টার ভোটের পর যুক্তরাষ্ট্র যদি উত্তর মন্টানায় সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার ফল কী হবে।
ট্রাম্পের মনোযোগ এখন অন্য দিকে থাকলেও তা আবার কানাডার দিকে ঘুরবে। দুই দেশ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে স্বাক্ষরিত 'ইউএসএমসিএ' বাণিজ্য চুক্তির পর্যালোচনা শুরু করতে যাচ্ছে। এটি অটোয়ার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের সব ক্ষোভ ঝাড়ার মঞ্চ হতে পারে। উত্তরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কানাডার কম সামরিক উপস্থিতি বা কৃষিখাতের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কথা উঠতে পারে। আর ট্রাম্পের দর কষাকষির কৌশল তো আছেই—ছোট বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করা।
বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ শুল্কমুক্ত। ট্রাম্পের ৩৫ শতাংশ আমদানি শুল্কের হাত থেকে কানাডা রেহাই পেয়েছে। কিন্তু এই সুবিধাই এখন কানাডার মাথার ওপর ডেমোক্লিসের তলোয়ারের মতো ঝুলছে। কারণ এই সুবিধা বাতিলের বা চুক্তি ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিয়েই ট্রাম্প কানাডায় তোলপাড় সৃষ্টি করতে পারেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করলে মার্কিন অর্থনীতির ক্ষতি হবে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে এটি কানাডার জন্য হবে বিপর্যয়কর। কারণ কানাডা তার রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই পাঠায় যুক্তরাষ্ট্রে।
এই নির্ভরতা কমাতে কার্নি গত অক্টোবরে ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী এক দশকে অন্য দেশে কানাডার রপ্তানি দ্বিগুণ করা হবে। অর্থনৈতিক এই ভারসাম্য আনতে হলে কূটনৈতিক চালে বড় পরিবর্তন দরকার। গত এপ্রিলে চীনকে দেশের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি বললেও, কার্নি আগামী সপ্তাহে প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথম কানাডিয়ান নেতা হিসেবে চীন সফরে যাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে কার্নি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন, যা ট্রুডোর আমলে বিষিয়ে উঠেছিল। তিনি পূর্বসূরির দেওয়া কিছু পাল্টা শুল্ক ও ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স তুলে নিয়েছেন। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে ন্যাটোর অংশীদারদের নিয়ে ট্রাম্পের প্রধান অভিযোগেরও সুরাহা করেছেন।
কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এত ছাড় দিয়েও শুল্কের বিষয়ে কোনো সুরাহা হয়নি। উল্টো এতে কানাডার সার্বভৌমত্ব ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
লাগাসে বলেন, 'আমরা কি ইতিমধ্যেই একটি করদ রাজ্যে পরিণত হয়েছি, যা আমরা নিজেরাও স্বীকার করছি না? আমার ভয় হয়, বাজার সুবিধা ধরে রাখতে আপনি যত ছাড় দেবেন, হুমকি এড়াতে যত কিছু ত্যাগ করতে রাজি হবেন, শেষ পর্যন্ত আপনি এমন অবস্থায় পৌঁছাবেন যেখানে আপনি কার্যত একটি আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হবেন।'
