ইরানজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত, নিহত ৫১; ‘জাতীয় স্বার্থ’ রক্ষার অঙ্গীকার সেনাবাহিনীর
ইরানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক গ্রেপ্তার এবং ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যেই দেশটির সেনাবাহিনী কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে। শনিবার (১০ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, 'জাতীয় স্বার্থ' রক্ষায় তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আধা-সরকারি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে ইসরায়েল এবং 'শত্রু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে' দেশের জননিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টার জন্য দায়ী করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, 'সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনায় সেনাবাহিনী অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে মিলে এই অঞ্চলে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ, দেশের কৌশলগত অবকাঠামো এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষা ও সুরক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকবে।'
গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ বর্তমানে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপি যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, শনিবার তেহরানের উত্তরাঞ্চলে জনতা আতশবাজি ফাটিয়ে এবং থালাবাসন পিটিয়ে ক্ষমতাচ্যুত রাজতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছে। এ ছাড়া রাশত, তাবরিজ, শিরাজ এবং কেরমান শহরেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৫১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৯ জন শিশু রয়েছে। আহত হয়েছেন কয়েকশ। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, অন্তত ২০০ জন 'দাঙ্গাবাজ' নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট শাটডাউনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি মূলত মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রকৃত চিত্র আড়াল করার চেষ্টা।
ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের 'সৃষ্টিকর্তার শত্রু' হিসেবে গণ্য করা হবে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ওয়াশিংটন বিক্ষোভকারীদের সাহায্যে প্রস্তুত রয়েছে। এর আগে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র 'খুব কঠিনভাবে' আঘাত করবে।
ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহের ছেলে রেজা পাহলভি যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক ভিডিও বার্তায় ইরানীদের শহরগুলোর কেন্দ্রস্থল দখল করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিক্ষোভকারীদের 'ভাঙচুরকারী' বা 'স্যাবোটিয়ার' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র লাখ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এটি পিছু হটবে না।
২০২২-২৩ সালে কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর পর এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি তৌহিদ আসাদি জানান, শুরুতে বিক্ষোভ বিক্ষিপ্ত থাকলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা বেড়েছে, বিশেষ করে রাজধানীতে।
আসাদি বলেন, 'রাষ্ট্র প্রথমে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার স্বীকার করেছিল। কিন্তু পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার পর সরকার বিক্ষোভকারী এবং যাদের তারা "নাশকতাকারী" বলছে, তাদের মধ্যে পার্থক্য টানার চেষ্টা করছে।'
তিনি আরও জানান, সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য মাসিক ৭ ডলার ভর্তুকি চালু করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে কাতার জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মেহরান কামরাভা আল জাজিরাকে বলেন, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির (বেসরকারি হিসেবে ৬০%) সামনে এই সামান্য ভর্তুকি জনগণের ক্ষোভ প্রশমনে খুব একটা কাজে আসবে না।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ বর্তমান আন্দোলন দমন করতে পারলেও তারা অস্থিরতার 'মূল কারণগুলো সমাধান করতে পারবে না।' তিনি বলেন, 'তারা কেবল রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে পরবর্তী সংঘাত পর্যন্ত সময় কিনছে।'
