‘আমরা বিক্রির জন্য নই’: ট্রাম্পের দখলের হুমকিতে গ্রিনল্যান্ডবাসীর ক্ষোভ ও শঙ্কা
'গ্রিনল্যান্ডের মানুষ আমেরিকান হতে চায় না। আমরা বিক্রির জন্য নই।' বিবিসিকে এভাবেই নিজের ক্ষোভের কথা জানালেন গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মিয়া চেমনিৎজ। ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক মন্তব্যের বিষয়ে একই সুরে নিজেদের শঙ্কার কথা জানিয়েছেন গ্রিনল্যান্ডবাসীরা।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ডেনমার্কের অংশ হিসেবে থাকা এই অঞ্চলটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে হোয়াইট হাউসের 'সক্রিয়' আলোচনার খবরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, প্রয়োজনে তারা এটি জোর করে দখল করতেও প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর থেকে গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। মাদুরোকে আটকের পরপরই হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার স্ত্রী ইঙ্গিত দেন যে, এরপরই গ্রিনল্যান্ডের পালা।
কানাডায় বসবাসরত ৪০ বছর বয়সী গ্রিনল্যান্ডার টুপার্নাক কোপেক বলেন, 'তখনই মনে হলো বিষয়টি আর নিছক কল্পনা নয়। আমি আমার বোনকে ফোন করে বললাম, যদি কখনো অকল্পনীয় কিছু ঘটে, তবে তোমরা আমাদের কাছে চলে এসো।'
বিশ্বের সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ণ এই দ্বীপটি মূলত বরফে ঢাকা। কিন্তু এর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও আর্কটিকের মাঝখানে হওয়ায় কৌশলগত দিক থেকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে যাওয়ায় এখানকার বিরল খনিজ সম্পদ আহরণ সহজ হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের অন্যতম কারণ।
গ্রিনল্যান্ডের পত্রিকা 'সারমিৎসিয়াক'-এর সম্পাদক মাসানা এগেডে বলেন, 'মাত্র ৫৬ হাজার মানুষের একটি জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির কাছ থেকে এমন হুমকি পাওয়া মোটেও সুখকর নয়। নাগরিকরা আতঙ্কিত, কারণ আমরা এটাকে হালকাভাবে নিচ্ছি না।'
ডেনমার্কের পার্লামেন্টে গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিত্বকারী এমপি আজা চেমনিৎজ ট্রাম্প প্রশাসনের মন্তব্যকে 'পরিষ্কার হুমকি' হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, 'ন্যাটোর এক মিত্র দেশকে দখলের চিন্তা করাটা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চরম অসম্মানজনক।'
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সহজেই সামরিকভাবে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে পারে, কিন্তু এর ফলে ন্যাটো জোট ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। ছয়টি ইউরোপীয় দেশ ইতিমধ্যেই বিবৃতি দিয়ে বলেছে, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র এর জনগণের।
অবশ্য প্রত্যন্ত উত্তরাঞ্চলীয় শহর কানাকের ইনুইট শিকারি অ্যালেকাসিয়া পিয়ারি (৪২) যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানা নিয়ে তেমন বিচলিত নন। তিনি বলেন, 'এটা এক প্রভুর হাত থেকে আরেক প্রভুর হাতে যাওয়ার মতো। আমরা তো ডেনমার্কের অধীনে একটি কলোনি। ডেনিশ সরকারের অধীনেও আমরা অনেক কিছু হারিয়েছি।'
তবে অধিকাংশ গ্রিনল্যান্ডার ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় যেতে নারাজ। গ্রিনল্যান্ড বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের ক্রিশ্চিয়ান কেলডসেন বলেন, 'গ্রিনল্যান্ডের মানুষ এতে বিরক্ত। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা করতে প্রস্তুত, কিন্তু তারা আমাদের দখল করে নেবে—এটা মানা যায় না।'
মিয়া চেমনিৎজ বলেন, 'আমরা একটি কার্যকর গণতন্ত্র। আমরা ন্যাটোর মিত্র এবং ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে এখানে সামরিক ঘাঁটি রাখতে দিয়েছি। তাই আবারও বলছি: আমরা বিক্রির জন্য নই, তবে ব্যবসার জন্য আমাদের দরজা খোলা।'
