হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া ট্রাম্পের জন্য কঠিন হবে কেন?
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। বর্তমানে অবরুদ্ধ এই জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য মিত্রদের সহায়তা চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একটি বড় জোট গঠন করতে পারলেও ইরানের এই অবরোধ ভাঙা ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান এই সংকীর্ণ জলপথের একপাশে অবস্থান নিয়ে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং মাইনের ব্যবহার শুরু করেছে। এর ফলে প্রতিদিন এই পথ দিয়ে চলাচলকারী বিশালকায় তেল ও গ্যাস ট্যাঙ্কারগুলোর জন্য এই রুটটি অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।
কেন এখন এই পথ বন্ধ করল ইরান?
২০১১ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একজন কমান্ডার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা 'এক গ্লাস পানি খাওয়ার চেয়েও সহজ'।
এরপরের বছরগুলোতেও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিতে থাকে গার্ড বাহিনী। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনার সময়—২০১৬ ও ২০১৮ সালে—এবং গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরও তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা ইরানের জন্য সবসময়ই ছিল 'শেষ বিকল্প'। কারণ এমন পদক্ষেপ নিলে দীর্ঘমেয়াদে ইরানের প্রতিপক্ষ দেশগুলো তাদের কৌশল বদলে ফেলতে পারে। পাশাপাশি পাল্টা হামলার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে, যা ইরানের নিজস্ব জ্বালানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করে যে হামলা শুরু হয়, তার পর সব সমীকরণ বদলে গেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ইরানি কর্মকর্তারা এই সংঘাতকে 'অস্তিত্বের লড়াই' হিসেবে বর্ণনা করছেন। একই সঙ্গে কট্টরপন্থী গার্ড বাহিনী ক্রমেই যুদ্ধকৌশল নির্ধারণে আরও বড় ভূমিকা নিতে শুরু করেছে।
কী ঝুঁকির মুখে?
ইরান ও ওমানের মাঝের সংকীর্ণ জলপথটি উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই পথ কুয়েত, ইরান, ইরাক, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য সমুদ্রপথে জ্বালানি রপ্তানির একমাত্র বের হওয়ার পথ।
এই সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যেই জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। সোমবার তেলের দাম সাময়িকভাবে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। জাতিসংঘের মতে, তেলের দাম বেশি থাকলে আবারও বৈশ্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সংকট তৈরি হতে পারে—যেমনটি ঘটেছিল ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে সার বাজারেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে, যা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
শিপিং বিশ্লেষক সংস্থা 'কেপলার'-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট সারের (সালফার ও অ্যামোনিয়াসহ) প্রায় ৩৩ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে পার হয়। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ১৯৭০-এর দশকের মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে।
কেন এই জলপথ নিরাপদ করা এত কঠিন?
শিপিং ব্রোকার 'এসএসওয়াই গ্লোবাল'-এর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর জাহাজ চলাচলের পথ বা লেনগুলো মাত্র দুই নটিক্যাল মাইল প্রশস্ত। এর ঠিক বিপরীত দিকেই রয়েছে ইরানি দ্বীপপুঞ্জ এবং পাহাড়ি উপকূল, যা ইরানি বাহিনীকে লুকিয়ে থেকে অতর্কিত হামলা চালানোর সুযোগ করে দেয়।
ব্রিটিশ নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কমান্ডার টম শার্পের মতে, ইরানের প্রচলিত নৌবাহিনী অনেকটা ধ্বংস হয়ে গেলেও দেশটির বিপ্লবী গার্ডের কাছে এখনও অনেক বিকল্প রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুতগামী ছোট নৌকা, খুদে সাবমেরিন, মাইন এবং এমনকি বিস্ফোরক বোঝাই 'জেট স্কি'। অলাভজনক গবেষণা সংস্থা 'সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্স'-এর তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন তৈরির সক্ষমতা রয়েছে।
টম শার্প মনে করেন, সাত বা আটটি ডেস্ট্রয়ার ব্যবহার করে আকাশপথে সুরক্ষা দিয়ে দিনে তিন-চারটি জাহাজকে পাহারা দিয়ে পার করা স্বল্প মেয়াদে সম্ভব। তবে এটি কতটা টেকসই হবে তা নির্ভর করছে খুদে সাবমেরিনের ঝুঁকি কতটা কমানো গেল তার ওপর।
এছাড়া কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে এই সুরক্ষা দিয়ে যাওয়া অনেক বেশি সম্পদ সাপেক্ষ ব্যাপার। 'ইউরোপীয় ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকান স্টাডিজ'-এর পরিচালক আদেল বাকাওয়ান বলেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ভাসমান মাইন মোতায়েনের ক্ষমতা ধ্বংস করা গেলেও জাহাজগুলো 'আত্মঘাতী অভিযানের' হুমকির মুখে থাকবে।
তবে রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের প্রকাশনা 'রুসি জার্নাল'-এর সম্পাদক কেভিন রল্যান্ডস বলেন, যদি যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, তবে কোনো না কোনো ধরণের সুরক্ষা ব্যবস্থা বা 'এসকর্ট' গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, 'বিশ্বের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেলের প্রবাহ সচল রাখা জরুরি, তাই সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা চলছে।'
ট্রাম্পের চাওয়া ও মিত্রদের অবস্থান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত রোববার অনেক দেশ থেকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন এবং তাদের প্রতি জোরালো দাবি জানিয়েছেন। তার প্রশাসন ইতিমধ্যে সাহায্যের বিষয়ে সাতটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এর আগে গত সপ্তাহে তিনি মার্কিন ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কর্পোরেশনকে শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য বিমা ও গ্যারান্টি প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এ নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং জানিয়েছেন যে লন্ডন মিত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা লোহিত সাগরে হুতিদের হাত থেকে জাহাজ রক্ষা করার মিশন নিয়ে আলোচনা করলেও হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত সেই মিশন সম্প্রসারণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তের আভাস মেলেনি।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ট্রাম্পের দাবির আগেই জানিয়েছিলেন যে, বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় ও এশীয় দেশ যৌথভাবে জাহাজ সুরক্ষার পরিকল্পনা করছে, তবে তা হবে কেবল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে।
জার্মানি লোহিত সাগরের মিশন জোরদার করার বিষয়েও সংশয় প্রকাশ করে বলেছে যে, এটি খুব একটা কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। অন্যদিকে জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া সোমবার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ পাহারার জন্য কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে না।
আঞ্চলিক অন্যান্য নৌপথের অভিজ্ঞতা
ইয়েমেনের হুতিরা ইরানের মিত্র হলেও সামরিক দিক থেকে অনেক ছোট শক্তি। তা সত্ত্বেও তারা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে লোহিত সাগরের অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নৌবাহিনীর প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও বড় শিপিং কোম্পানিগুলো এখনও আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করছে।
সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যু মোকাবিলায় ইউরোপীয় নেতৃত্বাধীন বাহিনী সফল হলেও সেই পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। কারণ জলদস্যুরা ইরানের বিপ্লবী গার্ডের মতো এতো সুসজ্জিত ও প্রশিক্ষিত নয়।
বিকল্প কোনো পথ আছে কি?
সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব হরমুজ প্রণালীর বিকল্প হিসেবে নতুন নতুন তেলের পাইপলাইন তৈরির চেষ্টা করেছে। তবে সেই পথগুলো বর্তমানে পুরোপুরি কার্যকর নয়। বিশেষ করে ২০১৯ সালে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হুতি মিলিশিয়াদের হামলা প্রমাণ করেছে যে, এই বিকল্পগুলোও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
