ব্রিজিত মাখোঁকে সাইবার বুলিংয়ের দায়ে ১০ জন দোষী সাব্যস্ত
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর স্ত্রী ব্রিজিত মাখোঁকে সাইবার বুলিং (অনলাইন হয়রানি) করার দায়ে প্যারিসের একটি আদালত ১০ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। খবর বিবিসির।
আসামিদের বিরুদ্ধে ব্রিজিতের লিঙ্গ ও যৌনতা নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি এই দম্পতির মধ্যকার ২৪ বছরের বয়সের ব্যবধান নিয়ে 'বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য' করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
দোষী সাব্যস্তদের অধিকাংশকে সর্বোচ্চ আট মাসের স্থগিত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে আদালতে হাজির না হওয়ায় একজনকে তাৎক্ষণিকভাবে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া কয়েকজনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়েছে।
বিচারক বলেন, ওই আটজন পুরুষ এবং দুজন নারী ব্রিজিত মাখোঁর ক্ষতি করার স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করেছিলেন এবং অনলাইনে অত্যন্ত অবমাননাকর ও অপমানজনক মন্তব্য করেছিলেন।
বিবাদীদের মধ্যে দুইজন—স্বঘোষিত স্বাধীন সাংবাদিক নাতাশা রে এবং ইন্টারনেট ভাগ্যগণনাকারী আমান্দিন রয়—২০২৪ সালে মানহানির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। তারা দাবি করেছিলেন যে, ফ্রান্সের ফার্স্ট লেডির (ব্রিজিত মাখোঁর) কোনো অস্তিত্বই নেই।
তাদের দাবি ছিল, ব্রিজিতের ভাই জঁ-মিশেল ত্রোনিউ নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করেছেন এবং ব্রিজিতের নাম ব্যবহার করা শুরু করেছেন।
পরবর্তীতে আপিলের মাধ্যমে তারা খালাস পান। আপিল আদালত তাদের খালাস দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তি দিয়েছিল যে, কেউ লিঙ্গ পরিবর্তন করেছেন এমন কথা বলা মানেই তার 'সম্মানের ওপর আঘাত' করা নয়।
মাখোঁ দম্পতি এখন সেই মামলাটি উচ্চতর আপিল আদালতে নিয়ে যাচ্ছেন।
রায় ঘোষণার পর ব্রিজিত মাখোঁর আইনজীবী জঁ এনোশি বলেন, অভিযুক্তদের জন্য প্রতিরোধমূলক প্রশিক্ষণ কোর্স এবং তাদের কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট স্থগিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এএফপি বার্তা সংস্থার খবরে এ তথ্য জানানো হয়।
এর আগে বিচার চলাকালে ব্রিজিত ম্যাক্রোঁর আগের সংসারের মেয়ে তিফান ওজিয়ের আদালতকে জানান, সাইবার বুলিং তার মায়ের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তিনি (টিফেন অজিয়ের) বলেন যে তার মাকে এখন তার পোশাক এবং শারীরিক অঙ্গভঙ্গি বা বসার ভঙ্গি সম্পর্কে খুব সতর্ক থাকতে হয়... কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোকে সমর্থন করার জন্য তার ছবি ব্যবহার করা হবে।
অজিয়ের বলেন, তার মা যদিও এই পরিস্থিতির সাথে 'বেঁচে থাকতে শিখে গেছেন', কিন্তু তার নাতি-নাতনিদের ওপর এর বিরূপ প্রভাব তাকে কষ্ট দেয়। কারণ তাদের স্কুলে গিয়ে উপহাস ও টিটকিরির শিকার হতে হয়।
ফ্রান্সে সোমবার দেওয়া এই রায়টি যুক্তরাষ্ট্রে হতে যাওয়া আরও বড় একটি মামলার পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেখানে মাখোঁ দম্পতি ডানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সার ক্যান্ডেস ওয়েন্সের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন। ক্যান্ডেস ওয়েন্সও ফার্স্ট লেডির লিঙ্গ নিয়ে ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব প্রচার করেছেন।
তারা অভিযোগ করেন, ক্যান্ডেস ওয়েন্স তার দাবিকে খণ্ডন করে এমন সব বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপেক্ষা করেছেন এবং বরং পরিচিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচারকারী ও প্রমাণিত মানহানিকারীদের বক্তব্য প্রচারের সুযোগ দিয়েছেন।
ওয়েন্স নিয়মিতভাবে তার পডকাস্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব দাবি পুনরাবৃত্তি করেছেন। ২০২৪ সালের মার্চে তিনি বলেন, ফ্রান্সের ফার্স্ট লেডি 'আসলে একজন পুরুষ'—এই বিশ্বাসের পক্ষে তিনি তার 'পুরো পেশাগত সুনাম' বাজি রাখতে প্রস্তুত।
প্রথমদিকে প্রেসিডেন্ট দম্পতিকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যে অনলাইনে ছড়ানো এসব গুজব উপেক্ষা করাই সবচেয়ে ভালো পথ, কারণ আইনি পদক্ষেপ নিলে সেগুলো আরও বেশি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে গত বছর এই বিষয়ে তাদের অবস্থানে আমূল পরিবর্তন আসে।
মাখোঁ দম্পতি সিদ্ধান্ত নেন যে অনলাইনে চালানো আক্রমণের মাত্রা এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন প্রকাশের ঝুঁকি থাকলেও তারা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা লড়াইয়ে নামার সিদ্ধান্ত নেন।
২০১৭ সালে তার স্বামী প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ব্রিজিত মাখোঁ একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী—এমন একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনলাইনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ব্রিজিত মাখোঁর সাথে তার বর্তমান স্বামীর প্রথম দেখা হয়েছিল যখন তিনি তার (ইমানুয়েল মাখোঁর) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।
২০০৭ সালে যখন এই দম্পতি বিয়ে করেন, তখন হবু ফরাসি প্রেসিডেন্টের বয়স ছিল ২৯ বছর এবং ব্রিজিতের বয়স ছিল ৫০-এর কোঠায়।
