শিশুদের সোশাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার দাবি জোরাল হচ্ছে ভারতে
১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করা নিয়ে ভারতে আলোচনা জোরদার হচ্ছে। বেশ কয়েকটি রাজ্যের মন্ত্রীরা জানিয়েছেন, তারা অস্ট্রেলিয়ার সম্প্রতি কার্যকর হওয়া একটি আইন খতিয়ে দেখছেন।
সম্প্রতি দক্ষিণাঞ্চলীয় অন্তত দুটি রাজ্যের মন্ত্রীরা জানিয়েছেন, শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে রাখতে এমন নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে, তা তারা যাচাই করে দেখছেন।
গত সপ্তাহে ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি দলের তৈরি বার্ষিক নথি 'ইকোনমিক সার্ভে'-তে সুপারিশ করা হয়েছে যে, ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা। যদিও এই সুপারিশ সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক নয়, তবে নীতি নির্ধারণে এটি সহায়ক হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভারতে এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সহজ হবে না এবং এটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে পারে।
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য অধিকাংশ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করেছে। সেখানে প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো সমালোচনা করেছে। অস্ট্রেলিয়ার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিবিসিকে জানিয়েছে, কোম্পানিগুলো এই নিয়মের আওতায় এসেছে 'অনিচ্ছাসত্ত্বেও এবং হইচই করতে করতে'।
গত সপ্তাহে ফ্রান্সের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের বিল অনুমোদন করেছে, যা এখন সিনেটে পাসের অপেক্ষায়। যুক্তরাজ্যও এমন নিষেধাজ্ঞার কথা ভাবছে।
ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জোট সরকারের শরিক এবং অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের শাসক দল তেলেগু দেশম পার্টির (টিডিপি) সংসদ সদস্য এল এস কে দেভারায়ালু গত সপ্তাহে একটি বিল প্রস্তাব করেছেন। এতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এটি একটি প্রাইভেট মেম্বার বিল হওয়ায় সরকারের নীতি বা আইন হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে এটি পার্লামেন্টে বিতর্ক উসকে দিতে পারে।
এছাড়া অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো পর্যালোচনার জন্য একটি মন্ত্রী পর্যায়ের গ্রুপ গঠন করেছে। তারা মেটা, এক্স, গুগল ও শেয়ারচ্যাটের মতো বড় প্ল্যাটফর্মগুলোকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে কোম্পানিগুলো এ নিয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।
রাজ্যের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী নারা লোকেশ এক্স-এ লিখেছেন, শিশুরা সোশ্যাল মিডিয়ার 'নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহারে আসক্ত' হয়ে পড়ছে, যা তাদের মনোযোগ ও শিক্ষায় প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, 'আমরা সোশ্যাল মিডিয়াকে নিরাপদ স্থান হিসেবে নিশ্চিত করব এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব—বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ওপর—কমিয়ে আনব।'
গোয়ার পর্যটন ও আইটি মন্ত্রী রোহন খাউন্টে বলেছেন, রাজ্য সরকার এমন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন সম্ভব কি না তা খতিয়ে দেখছে। ভারতের সিলিকন ভ্যালি হিসেবে পরিচিত বেঙ্গালুরুর রাজ্য কর্ণাটকের আইটি মন্ত্রী প্রিয়ঙ্ক খাড়গে বিধানসভায় বলেছেন, সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সোশ্যাল মিডিয়ার দায়িত্বশীল ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করছে। তিনি 'ডিজিটাল ডিটক্স' কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন। তবে কোনো আইন বা নির্দিষ্ট বয়সসীমার কথা তিনি স্পষ্ট করেননি।
ডিজিটাল অধিকার কর্মী নিখিল পাহওয়া বলেন, রাজ্য পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা জটিল হতে পারে। 'কোম্পানিগুলো আইপি অ্যাড্রেসের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অবস্থান অনুমান করতে পারে, কিন্তু তা প্রায়ই ভুল হয়। পাশাপাশি দুটি রাজ্যের একটিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলে এবং অন্যটিতে না থাকলে সংঘাত তৈরি হতে পারে।'
তিনি বয়স যাচাইয়ের জটিলতার কথাও উল্লেখ করেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, 'বয়স যাচাই সহজ নয়। এমন নিষেধাজ্ঞা মানতে হলে কোম্পানিগুলোকে ইন্টারনেটের প্রতিটি সেব ব্যবহারকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে যাচাই করতে হবে।'
এমনকি অস্ট্রেলিয়াতেও অনেক শিশু বিবিসিকে জানিয়েছে, তারা ভুয়া জন্মতারিখ দিয়ে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাচ্ছে।
টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের পাবলিক পলিসি বিশেষজ্ঞ প্রতীক ওয়াঘরে বলেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা প্ল্যাটফর্মগুলোর সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে। তিনি বলেন, 'তাত্ত্বিকভাবে আইপি অ্যাড্রেস দিয়ে অবস্থান বোঝা যায়, কিন্তু অ্যাপ পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলো এই নির্দেশনা মানবে নাকি আদালতে চ্যালেঞ্জ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।'
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইনপ্রণেতারা সঠিক সমস্যা চিহ্নিত করলেও নিষেধাজ্ঞা একটি সংকীর্ণ সমাধান হতে পারে। ১ হাজার ২৭৭ জন ভারতীয় কিশোর-কিশোরীর ওপর চালানো একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ভারতে বয়সভিত্তিক বিধিনিষেধ কার্যকর করা আরও কঠিন হতে পারে। কারণ অনেক অ্যাকাউন্ট পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সহায়তায় খোলা হয় এবং ব্যক্তিগত ইমেইলের সঙ্গে যুক্ত থাকে না।
কিছু অভিভাবক অনলাইনে নিষেধাজ্ঞার ধারণাকে স্বাগত জানালেও অন্যরা সমস্যার গভীরে যাওয়ার কথা বলছেন। দুই কন্যাসন্তানের বাবা দিল্লির বাসিন্দা জিতেন্দ্র যাদব বলেন, 'অভিভাবকরা নিজেরাই সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না এবং ব্যস্ত রাখতে তাদের হাতে ফোন তুলে দেন—সমস্যাটা ওখানেই শুরু হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করলেই কাজ হবে কি না আমি নিশ্চিত নই। কারণ অভিভাবকরা সন্তানদের সময় না দিলে বা সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখতে না পারলে, তারা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর পথ খুঁজে বের করবেই।'
