‘আমি নির্দোষ, কোনো অপরাধ করিনি; আমিই আমার দেশের প্রেসিডেন্ট’: মার্কিন আদালতে মাদুরো
ক্ষমতাচ্যুত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সোমবার মাদকসংক্রান্ত অভিযোগে নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন।
৬৩ বছর বয়সী মাদুরো ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে ইউএস ডিস্ট্রিক্ট বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন তাকে থামিয়ে দেওয়ার আগে একজন দোভাষীর মাধ্যমে বলেন, 'আমি নির্দোষ। আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি একজন ভদ্র মানুষ। আমি এখনও আমার দেশের প্রেসিডেন্ট।'
মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ মার্চ।
প্রায় আধা ঘণ্টার এই শুনানির আগে আদালতের বাইরে মাদুরো সমর্থক ও বিরোধী—উভয় পক্ষের কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী জড়ো হয়েছিলেন।
৫ জানুয়ারি স্থানীয় সময় সকাল ৭টার কিছু পরে ব্রুকলিনের একটি আটক কেন্দ্র থেকে মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে সশস্ত্র পাহারায় একটি হেলিকপ্টারে তোলা হয়। সেখান থেকে তাদের ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দুপুর ১২টায় তাদের প্রাথমিক শুনানি শুরু হয়।
মাদুরোর বিরুদ্ধে একটি আন্তর্জাতিক কোকেন চোরাচালান নেটওয়ার্ক তদারকি করার অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। অভিযোগ রয়েছে, এই নেটওয়ার্কটি মেক্সিকোর কুখ্যাত সিনালোয়া ও জেতাস কার্টেল, কলম্বিয়ার 'ফার্ক' বিদ্রোহী এবং ভেনেজুয়েলার অপরাধী চক্র 'ট্রেন ডি আরাগুয়া'র মতো সহিংস গোষ্ঠীগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করত।
তবে ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার দাবি, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এসব বানোয়াট অভিযোগ সাজিয়েছে।
১৯৮৯ সালে পানামা আক্রমণের পর লাতিন আমেরিকায় এটিই সবচেয়ে বড় মার্কিন হস্তক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। গত শনিবার মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা হেলিকপ্টারে করে কারাকাসে মাদুরোর নিরাপত্তা বলয় ভেঙে সরাসরি তার 'সেফ রুম' থেকে তাকে আটক করে।
এদিকে, মাদুরোকে আটক করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নজিরবিহীন অভিযানের বৈধতা নিয়ে জাতিসংঘে আলোচনার প্রস্তুতি চলছে।
উল্লেখ্য, কারাকাসে মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তিনি মাদুরোর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে নামার কোনো ইঙ্গিত দেননি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক গোপন প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দাদের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে—মাদুরোর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী সরকার পরিচালনার জন্য রদ্রিগেজই সবচেয়ে উপযুক্ত অবস্থানে রয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদো কিংবা এক সময়ের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেসের মতো বিরোধী নেতাদের বৈধতা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
যদিও অনেক মাদুরোবিরোধী কর্মী মনে করেছিলেন এটিই তাদের জন্য উপযুক্ত সময়, বাস্তবে ট্রাম্প আপাতত ভেনেজুয়েলার বিরোধীদের একপাশে সরিয়ে রেখেছেন বলেই মনে হচ্ছে। বরং তিনি এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
কারাকাসে ৩ কোটি মানুষের এই দক্ষিণ আমেরিকান তেল উৎপাদনকারী দেশের দায়িত্বে এখনো মাদুরোর ১৩ বছর পুরোনো সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই বহাল রয়েছেন। তারা কখনো ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করছেন, আবার কখনো সহযোগিতার বার্তাও দিচ্ছেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই গোয়েন্দা মূল্যায়নে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শিক বিরোধীদের প্রভাবশালী অবস্থান থাকা একটি সরকারের ভেতরে রদ্রিগেজ এবং ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীরাই দেশটির শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম অল্প কয়েকজন নেতার মধ্যে অন্যতম।
এদিকে, রদ্রিগেজের ভাই হোর্হে রদ্রিগেজ সোমবার মাদুরো-পন্থী ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি মাদুরোকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে 'সমস্ত পদ্ধতি, ফোরাম এবং ক্ষেত্র' ব্যবহারের অঙ্গীকার করেছেন।
ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায়নি। বরং তার ভাষায়, 'আমরা যুদ্ধ করছি সেইসব মানুষের বিরুদ্ধে, যারা মাদক বিক্রি করে।'
ট্রাম্প আরও বলেন, যেকোনো নতুন নির্বাচনের আগে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা প্রয়োজন হবে। তিনি ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাবকে অবাস্তব বলে আখ্যা দেন।
এনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, 'আমাদের আগে দেশটিকে ঠিক করতে হবে। এখনই নির্বাচন করা সম্ভব নয়। মানুষের পক্ষে ভোট দেওয়াও কোনোভাবেই সম্ভব নয়।'
