ভেনেজুয়েলার তেলের মজুতের নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে; এর অর্থ কী দাঁড়াতে পারে?
ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের খনির নিয়ন্ত্রণ থাকবে এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। শনিবার এমনটাই জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার 'বিধ্বস্ত তেলশিল্পকে চাঙ্গা করতে' শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে মার্কিন কোম্পানিগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্যমতে, ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে রয়েছে ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল। যা বিশ্বের মোট তেলের মজুতের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। দেশটির ভবিষ্যতের জন্য এই তেলের ভাণ্ডার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাপ্তাহিক ছুটির কারণে তেলের বাজার এখন বন্ধ। তাই এই ঘোষণার ফলে তেলের দামে তাৎক্ষণিক কী প্রভাব পড়বে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আপাতত ভেনেজুয়েলার সরকার পরিচালনা করবে যুক্তরাষ্ট্রই।
ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, 'আমাদের বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো সেখানে (ভেনেজুয়েলা) যাবে। তারা শত শত কোটি ডলার খরচ করে দেশটির ভেঙে পড়া তেল অবকাঠামো মেরামত করবে।'
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প সংস্কার করা হলে দেশটি আবারও জ্বালানি তেলের বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে। এতে পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোর জন্য বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বিশ্ববাজারে তেলের দামও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তবে দাম অতিরিক্ত কমে গেলে মার্কিন কোম্পানিগুলো তেল উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে।
যদি কালই ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রগুলো পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়, তবুও পুরোদমে উৎপাদন শুরু করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। খরচ হবে বিপুল অর্থ। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানি পিডিভিএসএ জানিয়েছে, গত ৫০ বছরে তাদের পাইপলাইনগুলো সংস্কার করা হয়নি। তেলশিল্পকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হলে অন্তত ৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলার খরচ করতে হবে।
প্রাইস ফিউচার গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক ফিল ফ্লিন বলেন, 'তেলের বাজারে এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হতে পারে। মাদুরো সরকার ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ মূলত ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে লুটপাট করে ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন।'
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুত ভেনেজুয়েলায়। কিন্তু মজুতের তুলনায় উৎপাদন খুবই নগণ্য। বর্তমানে দেশটি দিনে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ।
২০১৩ সালে মাদুরো যখন ক্ষমতায় আসেন, তখনকার তুলনায় এখন উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে। আর সমাজতান্ত্রিক শাসন শুরুর আগে দেশটি দিনে ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। বর্তমান উৎপাদন তার তিন ভাগের এক ভাগেরও কম।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) বলছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আর গভীর অর্থনৈতিক সংকটে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের আজ এই হাল। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, বছরের পর বছর বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই ধুঁকছে খাতটি। নষ্ট হয়ে গেছে অবকাঠামো, কমে গেছে তেল উৎপাদনের সক্ষমতা।
সহজ কথায়, বিশ্ববাজারে বড় কোনো প্রভাব ফেলার মতো তেল এখন আর উৎপাদন করতে পারে না ভেনেজুয়েলা।
চলতি বছর তেলের দাম বেশ নিয়ন্ত্রণেই ছিল। ওপেক দেশগুলো উৎপাদন বাড়ালেও মহামারি-পরবর্তী ধাক্কা ও মূল্যস্ফীতির কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের চাহিদা কিছুটা কমেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন যখন ভেনেজুয়েলার তেলের জাহাজ জব্দ করা শুরু করে, তখন মার্কিন তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলে ৬০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে পরে তা আবার কমে ৫৭ ডলারে নেমে আসে। তাই এই অভিযানের ফলে তেলের বাজারে বড় কোনো অস্থিরতার আশঙ্কা নেই বললেই চলে।
বিশ্লেষক ফিল ফ্লিন বলেন, 'মানসিকভাবে হয়তো বাজারে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার তেলের অভাব বিশ্বের অন্য উৎপাদনকারীরা সহজেই পূরণ করে দিতে পারবে।'
ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের দখল কেন নিল যুক্তরাষ্ট্র?
ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে যে তেল (ক্রুড অয়েল) রয়েছে, তা বেশ ভারী ও ঘন। এই তেল উত্তোলনের জন্য বিশেষ যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর সেই সক্ষমতা থাকলেও এত দিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা দেশটিতে কাজ করতে পারেনি।
বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের তেল সাধারণত হালকা। এই তেল দিয়ে পেট্রল ভালো হয়। কিন্তু ডিজেল, কারখানার জ্বালানি কিংবা রাস্তার পিচ (অ্যাসফাল্ট) তৈরির জন্য ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের বিকল্প নেই। ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণেই বিশ্বজুড়ে এখন ডিজেলের সংকট চলছে।
ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষ লাভজনক। কারণ, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছে এবং এই তেল বেশ সস্তাও। যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ তেল শোধনাগার বা রিফাইনারিগুলো মূলত ভেনেজুয়েলার এই ভারী তেল শোধনের উপযোগী করেই বানানো হয়েছিল। বাজার বিশ্লেষক ফিল ফ্লিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব তেলের চেয়ে ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবহারে এই শোধনাগারগুলো বেশি কর্মক্ষম থাকে।
ফ্লিন আরও বলেন, 'সবকিছু যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে, তবে তা বিশ্ব তেলের বাজারের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে ।'
এদিকে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল খাতকে 'সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত' বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, 'সম্ভাবনার তুলনায় তাদের উৎপাদন ছিল নগণ্য। এখন আমাদের বড় বড় কোম্পানি সেখানে যাবে। শত শত কোটি ডলার খরচ করে তেল অবকাঠামো ঠিক করবে এবং দেশটির জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।'
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের ফলে জ্বালানি তেলের দামে ঠিক কী প্রভাব পড়বে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালি সিএনএনকে বলেন, তেলের দামে এর প্রভাব হবে 'সামান্য'। তবে ভেনেজুয়েলায় যদি বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়, তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। আর পরিস্থিতি যদি শান্ত থাকে, তবে মূল দেখার বিষয় হলো—যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হয়ে ভেনেজুয়েলা কত দ্রুত তেল উৎপাদন বাড়াতে পারে।
ম্যাকনালি বলেন, 'মানুষ হয়তো ভাববে ভেনেজুয়েলা খুব দ্রুত তেল উৎপাদন বাড়াবে, কিন্তু বাস্তবতা হবে ভিন্ন। ভেনেজুয়েলা তেলের বাজারে বড় ফ্যাক্টর হতে পারে ঠিকই, তবে সে জন্য ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে।'
রোববার রাতেই বিশ্ববাজারে তেলের লেনদেন শুরু হবে। আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের কৌশলগত প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, সবকিছু নির্ভর করছে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল খাতকে আসলে কতটা বদলে দিতে পারবেন, তার ওপর।
হেলিমা ক্রফট বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র আবারও 'দেশ পুনর্গঠনের' মেজাজে ফিরেছে। মার্কিন কোম্পানিগুলো সেখানে বিনিয়োগ করবে বলে জানানো হয়েছে। তবে এখনই 'মিশন অ্যাকমপ্লিশড' বা আমরা সফল হয়েছি বলে ঘোষণা করার আগে আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ দরকার।'
