ভারতে ১০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছে পণ্য, কিন্তু সেবা দিতে দিতে ক্লান্ত ডেলিভারি কর্মীরা
ভারতে কয়েক হাজার অ্যাপভিত্তিক ডেলিভারি কর্মী নববর্ষের আগের রাতে ধর্মঘটে নেমেছেন। তারা এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন, যা তাদের মতে অবিরাম চাপের মধ্যে রাখে—এর মধ্যে ১০ মিনিটের কম সময়ে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার মতো শর্তও রয়েছে।
কর্মীরা 'ন্যায্য পারিশ্রমিক, মর্যাদা ও নিরাপত্তার' দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তারা একটি বিপণন কৌশল তাৎক্ষণিকভাবে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে প্রায় তিন কিলোমিটার (১.৮ মাইল) ব্যাসার্ধের মধ্যে যেকোনো ঠিকানায় ১০ মিনিটের মধ্যে বাজারসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়—ভারতের যানজটে ভরা শহরগুলোতে যা মোটেও সহজ কাজ নয়।
তারা সেই স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের বিরোধিতাও করছেন, যা ডেলিভারিতে বিলম্ব হলে কর্মীদের শাস্তি দেয় এবং তাদের রেটিং কমিয়ে দেয়। এছাড়া তারা স্বাস্থ্যবিমা এবং পেনশনসহ পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নিরাপত্তার দাবি তুলেছেন। ধর্মঘটে ২ লাখের বেশি কর্মী অংশগ্রহণ করেছেন, বলে জানিয়েছেন ধর্মঘটের আয়োজনকারী ইন্ডিয়ান ফেডারেশন অব অ্যাপ-বেসড ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কারস।
যদিও দ্রুত ডেলিভারির প্রবণতা বিশ্বব্যাপীই রয়েছে। ভারতের মতো ১৪০ কোটি মানুষের দেশেও—যেখানে প্রতি মাসে প্রায় এক মিলিয়ন নতুন চাকরিপ্রার্থী বাজারে প্রবেশ করে—এটি একটি নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতার মাঠে পরিণত হয়েছে। ক্রয়ক্ষমতাসম্পন্ন উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির কারণে, দ্রুত কোম্পানিগুলোর বাজার দখলের লড়াইয়ে একটি অপরিহার্য অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
বাজারটি বিশাল—বড় কোম্পানি সুইগি-এর বাজারমূল্য প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার, আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী জোমাটো -এর প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার।
সুইগির ইনস্টামার্ট, ব্লিঙ্কিট এবং জেপ্টোর মতো কিছু কোম্পানি '১০ মিনিটে ডেলিভারি'র প্রতিশ্রুতিকে তাদের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে ব্যবহার করে। তবে কর্মীদের মতে, এই কৌশলটি তাদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের বিনিময়ে বাস্তবায়ন করা হয়।
এর ওপর আবার অনেক প্ল্যাটফর্ম তাদের রাইডারদের (ডেলিভারি বয়) আনুষ্ঠানিক 'কর্মচারী' হিসেবে গণ্য করে না। ফলে কর্মীরা যেসব সুযোগ-সুবিধা দাবি করছেন, কোম্পানিগুলো আইনগত ভাবেই তা দিতে বাধ্য না।"
হায়দ্রাবাদ শহরের ৪১ বছর বয়সী একজন সুইগি ডেলিভারি চালক সিএনএন-কে জানান, প্রতিটি অর্ডারের জন্য তিনি মাত্র ৫ রুপি 'বেস রেট' বা মূল মজুরি পান। অবশ্য অর্ডারের সংখ্যা এবং দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে তার আয় কিছুটা বাড়ার সুযোগ থাকে। তিনি জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত তিনি কাজ করেন।
চাকরি হারানোর ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, 'আমাদের নিজেদের জ্বালানি খরচ এবং বাইক মেরামতের খরচ নিজেদেরই বহন করতে হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'এর ওপর প্রতিদিন খাওয়ার পেছনেই অন্তত ৫০ রুপি চলে যায়। আমি কখনো ভাবিনি যে ৪০ বছর বয়সে এসে আমাকে এই কাজ করতে হবে, কিন্তু আমার আর উপায়ই বা কী?
কোভিড-১৯ মহামারির সময় তার বইয়ের দোকানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি ডেলিভারি চালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি জানান, বর্তমানে মাসে তিনি প্রায় ২০ হাজার রুপি (২২২ ডলার) আয় করেন। এই রুপির অর্ধেকের বেশি চলে যায় তার বাসা ভাড়া এবং পাঁচ সন্তানের স্কুলের বেতন দিতে। এর ফলে তার পুরো পরিবারকে প্রতিদিনের খরচের জন্য হিমশিম খেতে হয় (অর্থাৎ মাস শেষে হাতে কোনো জমানো টাকা থাকে না)।
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য সিএনএন সুইগি, জোমাটো, ব্লিঙ্কিট, জেপ্টো এবং ভারতের শ্রম মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করেছে।
এদিকে, জোমাটোর সহ-প্রতিষ্ঠাতা দীপেন্দর গয়াল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে লেখেন, ধর্মঘটের ডাক সত্ত্বেও বুধবার জোমাটো এবং ব্লিঙ্কিট উভয়ই 'রেকর্ড গতিতে' ডেলিভারি সম্পন্ন করেছে এবং এই ধর্মঘটের প্রভাব তাদের ওপর পড়েনি।
তিনি লেখেন, 'স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমর্থনে সামান্য সংখ্যক শিষ্টভঙ্গকারীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে,' এবং আরও বলেন, 'যদি এই ব্যবস্থাটি মৌলিকভাবেই অন্যায় হতো, তবে এটি ক্রমাগত এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে আকর্ষণ করত না এবং তারা এখানে কাজ করতে চাইত না।'
এর জবাবে, তেলেঙ্গানা গিগ ও প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন জানিয়েছে, এক্স-এ পোস্টে, প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন অর্ডার "ডেলিভারি হয়েছে কারণ কর্মীরা লগ আউট করতে সক্ষম নয়, সিস্টেম তাদের ন্যায়সংগতভাবে আচরণ করছে বলে নয়।"
রেড লাইট অতিক্রম করা
বুধবারের ধর্মঘট শহরের গ্রাহকদের সুবিধা ও সেই সুবিধা প্রদানকারী মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যে গভীর ফাঁক দেখিয়ে দিয়েছে।
একদিকে, বিশাল কর্মক্ষম জনসংখ্যার এই দেশটিতে সুইগি এবং জোমাটোর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি করেছে এবং তাদের দক্ষতার জন্য প্রশংসিত হয়েছে। সরকারি গবেষণা সংস্থা নীতি আয়োগের ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের এই 'গিগ' (অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক) শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে ২ কোটি ৩৫ লাখে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সমালোচকরা যুক্তি দিচ্ছেন যে, এই ব্যবসায়িক মডেলটি শোষণের একটি নতুন রূপ তৈরি করছে।
দক্ষিণ এশিয়ার 'গিগ ইকোনমি' বা চুক্তিভিত্তিক শ্রম বাজার নিয়ে গবেষণারত স্বাধীন নীতি পরামর্শক রিয়া কাসলিওয়াল বলেন, 'যখন এটি (এই ডেলিভারি সেবা) প্রথম শুরু হয়েছিল, তখন নিজের অধীনে নিজেই কাজ করা এবং নিজের ইচ্ছামতো অর্থ উপার্জনের বিষয়টি মানুষকে ব্যাপকভাবে আকর্ষণ করেছিল।'
গবেষক রিয়া কাসলিওয়াল আরও বলেন, 'আসলে এই সিস্টেমটি মূলত যা করেছে তা হলো—শ্রমিকদের অনিশ্চিত শ্রম ব্যবস্থাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।'
অন্য কথায়, এই ব্যবস্থাটি অসংগঠিত খাতের কাজের সব অস্থিরতা—যেমন চাকরির কোনো নিরাপত্তা না থাকা, নির্দিষ্ট বেতন না থাকা এবং কোনো সুযোগ-সুবিধা না থাকা—সেগুলোকে একটি নিয়ন্ত্রিত করপোরেট কাঠামোর ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের ৩০ বছর বয়সী সুইগি রাইডার মোহাম্মদ নুমানের জন্য এই আর্থিক অনিশ্চয়তা এতটাই তীব্র যে, তিনি ধর্মঘটে যোগ দিয়ে একদিনের আয় হারানোর ঝুঁকি নিতে পারেননি।
তিনি বলেন, 'কাজটি কঠিন, কিন্তু কোনো উপায় নেই। টাকা উপার্জনের জন্য আমাকে এটি করতেই হবে।'
তিনি তার এক অত্যন্ত কঠোর ও ক্লান্তিকর রুটিনের বর্ণনা দিয়েছেন; সুইগির লক্ষ্যমাত্রা (টার্গেট) পূরণ করতে তাকে দিনে প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়, যাতে ৩৫ থেকে ৪০টি অর্ডার সম্পন্ন করা যায়। তিনি জানান, জ্বালানি এবং অন্যান্য খরচ মেটানোর পর দিন শেষে তাঁর হাতে থাকে মাত্র ৭০০ রুপির (৭.৭০ ডলার) মতো।
এর ওপর দ্রুত ডেলিভারি দেওয়ার প্রচণ্ড চাপ তো আছেই। নুমান বলেন, '১ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য আমাদের ৩-৪ মিনিটের মধ্যে এবং ৪ কিলোমিটারের জন্য প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে ডেলিভারি দেওয়ার লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়।'
তিনি বলেন, 'এই সময়ের মধ্যে ডেলিভারি দিতে আমাদের খুব দ্রুত বাইক চালাতে হয়। যদি আমরা দ্রুত না চালাই, তবে লক্ষ্যমাত্রা (টার্গেট) পূরণ করতে পারব না। যখন আমি কোনো অর্ডার পাই, তখন আমার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা থাকে—কীভাবে এটি দ্রুত পৌঁছে দেওয়া যায়, যাতে আমি আরও বেশি অর্ডার নিতে পারি।"
মুম্বাইয়েরই আরেকজন রাইডার জানান, সময়মতো ডেলিভারি নিশ্চিত করতে তাঁকে "অধিকাংশ সময় ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য (লাল বাতি অমান্য) করে বাইক চালাতে হয়।
"নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক (চাকরি হারানোর ভয়ে) জেপ্টোর একজন কর্মী বলেন, 'আমরা যদি দ্রুত ডেলিভারি না দিই তবে আমাদের জরিমানা করা হয়। আবার ট্রাফিক আইন ভেঙে ধরা পড়লে সেই জরিমানাও আমাদের নিজেদের পকেট থেকেই দিতে হয়; তাই আমরা সবদিক থেকেই চাপে আছি।'
এদিকে, দীপেন্দর গয়াল এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে '১০ মিনিটে ডেলিভারি'র এই প্রতিশ্রুতির পক্ষে কথা বলেন। তিনি বলেন, গ্রাহকদের বাড়ির আশেপাশে ডেলিভারি সেন্টারের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণেই এটি সম্ভব হচ্ছে।
তিনি আরও লেখেন, 'ব্লিঙ্কিট অর্ডার দেওয়ার পর মাত্র আড়াই মিনিটের মধ্যে সেটি গুছিয়ে প্যাকেট করা হয়। এরপর রাইডার গড়ে ২ কিলোমিটারেরও কম পথ পাড়ি দেন প্রায় ৮ মিনিটে। এর মানে হলো রাইডারকে গড়ে মাত্র ১৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে বাইক চালাতে হয়।'
ভয়ের মধ্যে কাজ করা
২০২০ সালে ভারত সরকার একটি শ্রম সংস্কার আইন প্রবর্তন করে, যেখানে সকল গিগ শ্রমিকের (চুক্তিভিত্তিক কর্মী) জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশজুড়ে এই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে।
২০২৩ সালে রাজস্থান ভারতের প্রথম রাজ্য হিসেবে গিগ ইকোনমি নিয়ন্ত্রণে আইন পাস করে। তারা একটি বিশেষ 'কল্যাণ বোর্ড' গঠন করেছে, যার কাজ হলো শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল গঠন করা এবং তাদের অভিযোগগুলোর প্রতিকার করা।
ভারতের প্রযুক্তি কেন্দ্র বেঙ্গালুরু যেখানে অবস্থিত, সেই কর্ণাটক এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্যও গত বছর নিজস্ব আইন পাস করেছে। পাশাপাশি তেলেঙ্গানা রাজ্যও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
এছাড়া, গিগ ইকোনমি বা এই নতুন ধারার কর্মসংস্থান নারীদের কর্মক্ষেত্রে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও প্রশংসিত হয়েছে। অন্যদিকে জনরোষ ও চাপের মুখে পড়ে কিছু প্ল্যাটফর্ম এখন দুর্ঘটনার বিমা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিমার মতো কিছু সুবিধা চালু করতে শুরু করেছে।
তবে কিছু গিগ শ্রমিক বলছেন, কোম্পানিগুলো যেসব সুবিধার কথা বলে সেগুলো পাওয়া অনেক সময়ই বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হওয়া একের পর এক প্রতিবাদ বিক্ষোভ এটাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, এখন আরও স্বচ্ছতা এবং বড় ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন।
মনোজ খারাডে—যিনি বাড়িতে এসে সেলুন সেবা দেয় এমন একটি অ্যাপে কাজ করেন—বলেন, তিনি একটি নির্দিষ্ট বেতন এবং সামাজিক নিরাপত্তার দাবিতে ধর্মঘটে যোগ দিয়েছেন।
তিনি জানান, যদি তিনি কোম্পানির বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা (টার্গেট) পূরণ করতে না পারেন, তবে তার আইডি বা অ্যাকাউন্টটি 'ব্লক' (বন্ধ) করে দেওয়া হয়, যা সরাসরি তার উপার্জনের ওপর আঘাত হানে। খারাডে বলেন, তিনি দিনে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন এবং মাসে প্রায় ২৫ হাজার রুপির (২৭৭ ডলার) মতো আয় করেন।
তিনি আরও বলেন, 'আমরা সব সময় এক ধরনের ভয়ের মধ্যে কাজ করি। কারণ যদি আমি টার্গেট পূরণ করতে না পারি... তবে তা সরাসরি আমার পরিবারকে সংকটে ফেলবে। আর আমাদের যদি কোনো আয় না থাকে, তবে আমরা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাব।'
