ডেনমার্কের শেষ চিঠি: ডাকসেবা বন্ধের আগে যেকারণে ব্রিটিশ শিল্পীর কাছে লেখা হলো অজস্র চিঠি
কেউ লিখেছেন দূর-দূরান্ত থেকে চিঠি পাওয়ার সেই অনাবিল আনন্দের কথা। আবার কেউ বা বলেছেন, টেবিলে বসে ধীরস্থিরভাবে মনের ভাবনাগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে লেখার সেই বিশেষ অনুভূতির কথা। একজন লেখক জানিয়েছেন বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর একগাদা হৃদয়স্পর্শী চিঠি খুঁজে পাওয়ার গল্প। আরেকজন চিঠির সঙ্গে পাঠিয়েছেন তাঁর শহরের কোথায় কোথায় ডাকবাক্স ছিল, তার একটি মানচিত্র।
ঘটনাটি ডেনমার্কের। এক ব্রিটিশ শিল্পী ডেনমার্কের ৪০০ বছরের পুরোনো ডাক ব্যবস্থার মাধ্যমে পাঠানো শেষ কিছু চিঠি সংগ্রহ করছেন। কারণ, গত ৩০ ডিসেম্বর এই ডাক বিভাগ তাদের শেষ চিঠিটি বিলি করে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে।
পোস্টনর্ড নামের ওই ডাক সংস্থা সমাজের 'ক্রমবর্ধমান ডিজিটালাইজেশন' বা প্রযুক্তি নির্ভরতাকে এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা জানিয়েছে, পার্সেল বা প্যাকেট সরবরাহ চালু থাকবে। তবে চিঠি বিলি বন্ধ করার এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে।
শেষ ডাক ও স্মৃতির মানচিত্র
গিলিয়ান টেইলর একজন পেপার আর্টিস্ট বা কাগজের শিল্পী। ডাকসেবা বন্ধ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি ডেনমার্কের মানুষকে যুক্তরাজ্যের ডেভন কাউন্টির এক্সেটার শহরের একটি পোস্ট বক্সে চিঠি পাঠাতে অনুরোধ করেছিলেন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তিনি এই চিঠিগুলো দিয়ে একটি বিশেষ শিল্পকর্ম তৈরি করবেন।
টেইলর বলেন, 'পোস্টনর্ডের চিঠি বিলি বন্ধ করা এবং ডাকবাক্সগুলো সরিয়ে ফেলার ঘটনাটি আমার কাছে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে মনে হয়েছে। তাই শিল্পের মাধ্যমে আমি এই সময়টাকে ধরে রাখতে চেয়েছি।'
তিনি মানুষকে দীর্ঘ চিঠি, ছোট শুভেচ্ছা বার্তা, কার্ড, এমনকি বার্তা ছাড়া শুধু ঠিকানা লেখা খাম পাঠাতেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অনেকেই এত যত্ন করে চিঠি পাঠিয়েছেন যে তা দেখে তিনি অবাক ও রোমাঞ্চিত হয়েছেন।
টেইলর জানান, 'কেউ কেউ পুরোনো দিনের কেটে রাখা ছবি পাঠিয়েছেন, যা একসময় মানুষ সংগ্রহ করত এবং চিঠিতে পাঠাত। কেউ আবার নিজের হাতে ছবি এঁকেছেন বা কোলাজ তৈরি করেছেন। অনেকেই ডাকসেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ডাকবাক্স সরিয়ে ফেলার কারণে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন।'
একজন লেখক চিঠির সঙ্গে তার শহরের শেষ তিনটি ডাকবাক্স চিহ্নিত করে একটি মানচিত্র পাঠিয়েছেন। টেইলর বলেন, 'তিনি চিঠিতে তাঁর শৈশবের ছুটির দিনগুলোর কথা লিখেছেন—সঠিক পোস্টকার্ডটি খুঁজে বের করা, কী লিখবেন তা ভাবা এবং ডাকঘর খুঁজে স্ট্যাম্প কিনে কার্ডটি পোস্ট করার সেই প্রক্রিয়ার কথা।'
ওই লেখক টেইলরকে লিখেছেন, 'চিঠি পাওয়ার উত্তেজনা ছিল আরও বেশি, বিশেষ করে বিদেশ থেকে আসা ভিন্ন ভিন্ন স্ট্যাম্প ও সিলমোহরযুক্ত চিঠি। আমার খুব খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে, আগামী প্রজন্ম হয়তো কখনোই হাতে লেখা কার্ড বা চিঠি পাঠানো বা পাওয়ার আনন্দ অনুভব করতে পারবে না।'
কফির সুবাস আর হারানো দিনের গল্প
আরেকজন লেখক নরওয়েতে থাকা তাঁর খালার কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার উত্তেজনার কথা বর্ণনা করেছেন। টেইলর বলেন, 'পড়তে শেখার আগেই চিঠি এলে তিনি তাঁর খালার হাতের লেখা চিনতে পারতেন।'
টেইলর আরও বলেন, 'কফির সুবাসের মধ্যে পুরো পরিবার রান্নাঘরের টেবিলে গোল হয়ে বসত (তিনি এখানে ডেনিশ শব্দ 'হুগা' ব্যবহার করেছেন)। তাঁর মা তখন পরিবারের সবাইকে চিঠি পড়ে শোনাতেন। মায়ের কণ্ঠে ছিল উষ্ণতা এবং স্পষ্ট নরওয়েজিয়ান টান। এখন লেখক উপলব্ধি করেন, তাঁর মা নিশ্চয়ই নিজের বোন এবং জন্মভূমিকে কতটা মিস করতেন।'
একই লেখক তাঁর শৈশবের বাড়িটি খালি করার স্মৃতির কথা লিখেছেন, যেখানে তাঁর পরিবার ৬০ বছর ধরে বসবাস করেছে। সেখানে তিনি তাঁর মায়ের লেখা বাবার উদ্দেশে পাঠানো সযত্নে রাখা কিছু চিঠি খুঁজে পান। তিনি সেগুলো পড়েননি, কারণ তিনি মনে করেন সেগুলো একান্তই ব্যক্তিগত থাকা উচিত।
বাস্তব যখন গল্পের মতো
৬৭ বছর বয়সী এক নারী সারা জীবনে হাজার হাজার চিঠি পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। টেইলর বলেন, 'তিনি কিশোরী বয়সে ডাকপিয়নের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করার কথা লিখেছেন। সারা বিশ্বে তাঁর অনেক পত্রবন্ধু বা পেনপ্যাল ছিল এবং কয়েকজনের সঙ্গে তিনি সারা জীবন যোগাযোগ রেখেছেন। তিনি আমেরিকায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এক বন্দীকেও চিঠি লেখেন।'
আরেকজন চিঠিতে ডেনিশ লেখক ও দার্শনিক ভিলি সোরেনসেনের কথা উল্লেখ করেছেন। সোরেনসেন 'দ্য মিসিং লেটারস' নামে একটি ছোটগল্প লিখেছিলেন, যেখানে মানুষ চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছিল।
টেইলর বলেন, 'গল্পটি এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। ওই লেখক সর্বশেষ হাতে লেখা চিঠিটি পেয়েছিলেন বেশ কয়েক বছর আগে, স্কুলের এক পুরোনো বন্ধুর কাছ থেকে। তাঁর বাড়ির কাছের ডাকঘর এবং সব ডাকবাক্স এখন উধাও হয়ে গেছে।'
টেইলরের আগের কাজের মধ্যে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেমপত্র দিয়ে তৈরি ছোট ছোট খামের সেট এবং কাগজের পপি ফুলের বিশাল সব স্থাপনা।
ডেনমার্ক থেকে আসা এই চিঠি ও খামগুলো দিয়ে 'মেড ভেনলিগ হিলসেন' (যার অর্থ 'শুভেচ্ছান্তে') নামের একটি নতুন শিল্পকর্ম তৈরি করা হবে। টেইলর আশা করছেন, যুক্তরাজ্য এবং ডেনমার্ক—উভয় দেশেই এটি প্রদর্শিত হবে।
