সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরেই মামদানির উত্থান, মেয়র হিসেবেও কি পারবেন সেই গতি ধরে রাখতে?
জানুয়ারির হাড়কাঁপানো শীত। এর মধ্যেই কোনি আইল্যান্ডের বরফশীতল পানিতে ঝাঁপ দিলেন তিনি। উদ্দেশ্য হলো 'জমিয়ে ফেলা বাড়িভাড়া' নিয়ে এক দারুণ রসিকতা। আবার কখনো ফুড ট্রাকের সামনে দাঁড়িয়ে হালাল খাবারের দাম বৃদ্ধি বা 'হালালফ্লেশন' নিয়ে কথা বলছেন। কখনোবা ম্যানহাটনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। বুঝিয়ে দিচ্ছেন, এই শহরের মানুষ এমন এক মেয়র চায় যাকে দেখা যায়, ছোঁয়া যায়, এমনকি যার ওপর রাগও করা যায়।
এই সব সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিওই জোহরান মামদানিকে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র প্রাইমারিতে তার অপ্রত্যাশিত জয় এবং নভেম্বরের নির্বাচনে চূড়ান্ত বিজয়ের পেছনে ছিল এই নেতার ডিজিটাল কৌশল।
বিশেষজ্ঞরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট বা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী নিউইয়র্কবাসীকে মুগ্ধ করেছেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের, যারা দিনের অনেকটা সময় ফোলে স্ক্রল করেই কাটান। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে মামদানি নিজেকে একজন খাঁটি ও প্রাণবন্ত মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
গত ১ জানুয়ারি মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি। এখন তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ক্ষমতায় বসেও সমর্থকদের এই আগ্রহ ধরে রাখা এবং নির্বাচনী প্রচারণার সেই গতি বজায় রাখা।
নিউইয়র্কের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়
নিউইয়র্কের প্রথম মেয়র হিসেবে কোরআন ছুঁয়ে শপথ নিলেন মামদানি। হাড়কাঁপানো শীতে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল তার অভিষেক অনুষ্ঠানে। তাদের উদ্দেশে তিনি বললেন, তিনি এই শহরের সবার প্রতিনিধিত্ব করবেন।
তিনি বলেন, 'আমি একা নই। আমি আপনাদের পাশে আছি।' তিনি আরও কথা দিলেন, 'আপনারা যদি নিউইয়র্কবাসী হন, তবে আমিই আপনাদের মেয়র।'
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ভোট জরিপ বলছে, ৩০ বছরের কম বয়সী নিউইয়র্ক ভোটারদের প্রায় চার-তৃতীয়াংশই মামদানিকে ভোট দিয়েছেন।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির যোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক জেন হল বলেন, মামদানির সোশ্যাল মিডিয়া কৌশল ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি এমন এক রাজনৈতিক প্রার্থীর ভাবমূর্তি তুলে ধরেছেন, যা তরুণরা খুঁজছিল। প্রবীণ ও তথাকথিত প্রার্থীদের ওপর তারা বেশ বিরক্ত ছিল।
অধ্যাপক হল আরও বলেন, তরুণদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রার্থীকে তরুণ হতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। তবে তাকে খাঁটি হতে হবে। মানুষের মনের কথা এমনভাবে বলতে হবে যা আধুনিক এবং সবাই তার দলে ভিড়তে চাইবে।
রাটগার্স ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক জ্যাক ব্র্যাটিচ বলেন, মামদানি দেখিয়েছেন যে তিনি হাসিঠাট্টার সঙ্গে সিরিয়াস আলোচনাও চালিয়ে যেতে পারেন।
সিরাকিউস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেনিফার স্ট্রোমার-গ্যালি বিবিসিকে বলেন, মামদানির এই মজা করার ভঙ্গি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারণার ঠিক উল্টো।
ট্রাম্প ও মামদানি: দ্বন্দ্ব ও বাস্তবতা
নভেম্বরে এই দুই নেতার মধ্যে অপ্রত্যাশিতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ এক বৈঠক হয়। সেখানে তারা নিউইয়র্কের আবাসন সংকটসহ নানা বিষয়ে একমত হন। অথচ মেয়র নির্বাচনের দৌড়ে তাঁরা একে অপরের বিরুদ্ধে রীতিমতো শিং উঁচিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
ট্রাম্প মামদানিকে চরমপন্থী 'পাগল' হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। হুমকি দিয়েছিলেন, মামদানি জিতলে শহরের কেন্দ্রীয় তহবিল আটকে দেবেন। এমনকি অভিবাসন অভিযানে বাধা দিলে তাকে গ্রেপ্তারের হুমকিও দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
নির্বাচনের রাতে বিজয়ী ভাষণে মামদানি এর কড়া জবাব দেন। প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, 'আমাদের কারোর গায়ে হাত দিতে হলে, আগে আমাদের সবার ওপর দিয়ে যেতে হবে।'
সেই সময় সমর্থকরা উল্লাস করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার চালানোর বাস্তবতা ভিন্ন। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে হয়তো বাস্তববাদী হয়েই চলতে হবে। নভেম্বরের সেই উষ্ণ বৈঠক হয়তো তারই আগাম ইঙ্গিত।
হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তিনি কীভাবে কাজ করবেন এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক গড়বেন, তার ওপর তার এজেন্ডা বাস্তবায়ন নির্ভর করবে।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইওয়ানা লিটারেট বলেন, ভিডিওতে বড় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ। কিন্তু বৈরী প্রশাসনের অধীনে দেশ বা শহর চালানো অনেক কঠিন। তিনি সতর্ক করে বলেন, 'সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্টে যদি সীমাবদ্ধতার কথা সততার সঙ্গে না বলা হয়, তবে যে তরুণরা তাঁকে ভাইরাল করেছে, তারাই হতাশ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।'
চ্যালেঞ্জ যখন সরকার পরিচালনা
এনওয়াইইউ-এর সেন্টার ফর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যান্ড পলিটিক্সের সহ-পরিচালক জোনাথন নাগলার বিবিসিকে বলেন, সফল হতে হলে মামদানিকে দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে সমর্থকদের যুক্ত রাখতে হবে। কিন্তু সরকার চালানোর প্রাত্যহিক কাজ নির্বাচনের মতো উত্তেজনাকর নয়।
নাগলার বলেন, 'নিউইয়র্কের ভোটাররা এমনিতেই ট্রাম্পের অনেক বিষয়ে একমত নন। তাই ট্রাম্পের বিরোধিতায় মানুষকে জড়ো করা সহজ। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে এটা বলা কঠিন যে—সিটি কাউন্সিল আমার কাজে বাধা দিচ্ছে, আপনারা কাউন্সিলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন।' শহরের সরকার কীভাবে কাজ করে, তা ভোটারদের বোঝানো বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
রাটগার্সের অধ্যাপক ব্র্যাটিচ বলেন, প্রচারণার গতি ধরে রাখার একটা কৌশল হতে পারে সোশ্যাল মিডিয়া অনুসারীদের মাঠপর্যায়ের সংগঠকে পরিণত করা। মামদানি তাঁর প্রচারণার সময় অনুসারীদের প্রতিবাদ সমাবেশ বা প্রচারণায় অংশ নিতে বলতেন। এর ফলেই এক লাখেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক তৈরি হয়েছিল।
অধ্যাপক লিটারেট বলেন, 'কিন্তু প্রশাসন যদি হোঁচট খায় এবং ফিডে শুধু প্রতিশ্রুতিই আসতে থাকে, তবে তরুণরা ভাবতে পারে—ইন্টারনেটের মেয়রও কিছু বদলাতে পারলেন না। এই ঝুঁকির কারণেই ক্ষমতায় থাকাকালীন তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।'
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বিবিসির অনুরোধে মামদানির ট্রানজিশন টিম সাড়া দেয়নি।
তবে মামদানির তৃণমূল পর্যায়ের গতি যে অব্যাহত থাকবে, তার বড় লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। নভেম্বরে তার মিত্ররা 'আওয়ার টাইম ফর এন অ্যাফোর্ডেবল এনওয়াইসি' নামের একটি নতুন অলাভজনক সংস্থা ঘোষণা করেছে। স্বেচ্ছাসেবকদের কাজে লাগিয়ে তারা তহবিল সংগ্রহ করবে এবং মেয়রের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করবে।
গত বৃহস্পতিবার সিটি হলের পুরোনো সাবওয়ে স্টেশনে মামদানির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়। স্টেশনটি এখন পরিত্যক্ত। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, 'এটি আমার জীবনের সেরা সম্মান ও সৌভাগ্য। আগামীকাল সবার সঙ্গে দেখা করার জন্য এবং আমাদের কাজ শুরু করার জন্য আমি আর তর সইতে পারছি না।'
