১০০ বছরের বেশি সময় পর সৌদি আরবে ফিরছে সিংহ, ছাড়া হবে অভয়ারণ্যে
বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় ২৩টি প্রজাতির প্রাণী ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে দেশের সবচেয়ে বড় বন্য প্রাণী শিকারি সিংহগুলোকে গহীন বনে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সৌদি আরব।
প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান রয়্যাল রিজার্ভের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু জালুমিস জানান, আরব উপদ্বীপে আবারও এশীয় সিংহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। অবাধ শিকারের কারণে প্রায় এক শতাব্দী আগে এই অঞ্চল থেকে সিংহগুলো বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
প্রাচীন পাথরের খোদাই করা চিত্র বা শিলালিপি থেকে জানা যায়, বিলুপ্ত হওয়ার আগে অন্তত ১০ হাজার বছর ধরে এই অঞ্চলে সিংহরা মুক্তভাবে বিচরণ করত।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভারতের পর সৌদি আরব হবে বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ, যেখানে বন্য এশীয় সিংহ রয়েছে। বর্তমানে ভারতের গুজরাটের গির অরণ্যে প্রায় ৯০০টি এশীয় সিংহ আছে।
সৌদি আরবের এই রাজকীয় অভয়ারণ্যটি আয়তনে লেবাননের চেয়েও দ্বিগুণের বেশি বড়। ২৪ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এই পার্কটি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েলোস্টোন, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার কিংবা তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্কের চেয়েও বিশাল।
হিজাজ পর্বতমালার ২ কিলোমিটার উঁচু চূড়া থেকে শুরু করে লোহিত সাগরের ১ হাজার মিটার গভীর প্রবাল প্রাচীর—সবই আছে এখানে। হাররাত মালভূমির আগ্নেয়গিরির লাভা ক্ষেত্রসহ এই অভয়ারণ্যে রয়েছে ১৫টি ভিন্ন ভিন্ন বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম।
উপকূলীয় ছোট শহর আল ওয়াজ ও দুবা বাদে এই বিশাল এলাকায় মাত্র ২০ হাজার মানুষের বাস। তবে জীববৈচিত্র্যে এটি বেশ সমৃদ্ধ। ৩০০ প্রজাতির পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং ৩০০ প্রজাতির উদ্ভিদের আবাসস্থল এই অভয়ারণ্য।
এরই মধ্যে এখানে বেশ কিছু প্রাণী মুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে 'পার্সিয়ান ওনাজার'। দেখতে গাধার মতো হলেও এটি ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে। গত বছর এই প্রাণীটি এখানে ছাড়া হয়, যা ১০০ বছরের বেশি সময় আগে এখান থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
২০২২ সালে ছাড়া 'অরিক্স' বা বিশেষ একধরনের হরিণের সংখ্যা বেড়ে এখন ৮৬টিতে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া চিতাবাঘ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে, যার প্রজনন কার্যক্রম বর্তমানে তায়েফে চলছে।
জালুমিস জানিয়েছেন, সিংহগুলোকে কবে নাগাদ ছাড়া হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো ঠিক করা হয়নি। তবে এই পরিকল্পনাটি কিছুটা বিতর্কিত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
জালুমিস বলেন, 'মানুষ স্বভাবতই সিংহকে ভয় পায়। বাইরে থেকে কোনো মাংসাশী বন্য প্রাণী লোকালয়ের কাছে নিয়ে আসা অনেক সময় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।'
তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। তবে পার্কের বোর্ড সদস্যদের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো আপত্তি আসেনি। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এই বোর্ডের চেয়ারম্যান। জালুমিস বলেন, 'যুবরাজ এ বিষয়ে বেশ ভালো ধারণা রাখেন।'
মানুষের ভীতি কাটাতে পার্ক কর্তৃপক্ষ স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছে। সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে পার্কের ভেতরে ও আশপাশে বসবাসরত স্থানীয় মানুষকে কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
আফ্রিকান সিংহের তুলনায় বন্য এশীয় সিংহ আকারে কিছুটা ছোট হয়। এদের কেশর ছোট ও গাঢ় রঙের এবং লেজের ডগার লোম বেশ বড় হয়। আফ্রিকান সিংহরা বড় দল বেঁধে থাকলেও এশীয় সিংহরা অপেক্ষাকৃত ছোট দলে থাকতে পছন্দ করে।
সৌদি আরবের আটটি রাজকীয় অভয়ারণ্যের মধ্যে এটি অন্যতম। পার্কের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু জালুমিস বলেন, তাদের লক্ষ্য হলো এটিকে 'বিশ্বের সেরা মরু-অভয়ারণ্য' হিসেবে গড়ে তোলা।
এর আগে জালুমিস ২০ বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান 'আইসিমঙ্গলিসো ওয়েটল্যান্ড পার্ক' পরিচালনা করেছেন। তিনি মনে করেন, সৌদি আরবের এই পার্কটিকে বন্য পরিবেশে ফিরিয়ে আনা গেলে তা দেশটির পর্যটন খাতের বড় লক্ষ্য পূরণে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
জালুমিস বলেন, 'বিশ্বের সেরা সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, পর্যটকরা ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কে হয়তো চার দিন কাটান, কিন্তু দেশটিতে থাকেন দুই সপ্তাহ।'
দক্ষিণ আফ্রিকায় বন্য প্রাণী দেখতে যাওয়া ৯০ শতাংশ পর্যটকই আসেন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে। সৌদি আরবও এখন এই পর্যটকদেরই টানতে চাইছে, যদিও এখনো কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আইসিমঙ্গলিসো পার্কে বছরে প্রায় আড়াই লাখ পর্যটক আসেন। বিশ্বব্যাংকের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার জিডিপিতে এই পার্কের অবদান প্রায় ২৩ কোটি ডলার।
এই অভয়ারণ্যটি সৌদি আরবের উত্তরাঞ্চলের বিশাল প্রকল্প 'রেড সি গ্লোবাল', 'আল-উলা' এবং 'নিওম'-এর মাঝামাঝি অবস্থিত। দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব প্রকল্পের সঙ্গে অভয়ারণ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করার ওপর জোর দিচ্ছেন জালুমিস।
২০৩০ সালের মধ্যে এখানে ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পসাইট তৈরি ও পর্যটক বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে জালুমিস জানান, পর্যটনের চেয়ে এখন তারা বন্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ওপরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, 'পর্যটন তো আসবেই, কিন্তু আমাদের প্রধান কাজ এখন আবাসস্থল পুনরুদ্ধার করা। মরুভূমিকে দেখে শূন্য মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে তা নয়। এখানে যা দেখা যায় তা দুর্লভ, আর এটাই মরুভূমিকে বিশেষ করে তোলে।'
