নিউইয়র্কের ইতিহাসে প্রথম কোরআন ছুঁয়ে মেয়রের শপথ নিলেন জোহরান মামদানি
নিউ ইয়র্ক সিটির ১১২তম মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন জোহরান মামদানি। আজ বৃহস্পতিবার ভোরে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ম্যানহাটনের একটি ঐতিহাসিক ও পরিত্যক্ত সাবওয়ে স্টেশনে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অনুযায়ী জোহরান মামদানি পবিত্র কোরআনের ওপর হাত রেখে শপথ নেন।
আমেরিকার অন্যতম ব্যয়বহুল এই শহরে সাধারণ মানুষের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
৩৪ বছর বয়সী মামদানি উগান্ডা থেকে আসা একজন অভিবাসী। এই শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি নিউ ইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়লেন। এছাড়া গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে তিনিই শহরটির সর্বকনিষ্ঠ মেয়র।
শপথ নেওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মামদানি বলেন, 'এটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্মান এবং বিশেষ পাওয়া।'
একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে শপথ বাক্য পাঠ করান নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল এবং মামদানির রাজনৈতিক মিত্র লেটিশিয়া জেমস। শপথ গ্রহণের জন্য বেছে নেওয়া হয় পুরনো 'সিটি হল' স্টেশনটি। এটি নিউ ইয়র্কের অন্যতম প্রাচীন একটি সাবওয়ে স্টেশন, যা তার চমৎকার খিলান আকৃতির ছাদের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার ভোরে অনুষ্ঠিত ব্যক্তিগত শপথ অনুষ্ঠানে মামদানি ব্যবহার করবেন তার দাদার ব্যবহৃত একটি কোরআন এবং খ্যাতনামা কৃষ্ণাঙ্গ লেখক ও ঐতিহাসিক আর্তুরো শমবার্গের একটি কোরআন। শমবার্গের এই বিশেষ কোরআনটি নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি থেকে তাকে ধার দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, সিটি হলে আয়োজিত প্রকাশ্য শপথ অনুষ্ঠানে তিনি তার দাদা ও দাদি—উভয়ের ব্যবহৃত কোরআন ব্যবহার করবেন।
বৃহস্পতিবার শপথ নেওয়ার সময় মামদানির সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী শিল্পী রামা দুয়াজি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তার বাবা, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি এবং মা, প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার।
শপথ অনুষ্ঠানের স্থানটি ছিল বিশেষভাবে প্রতীকী। ম্যানহাটনের সিটি হল পার্কের নিচে থাকা পরিত্যক্ত 'সিটি হল' সাবওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এই আয়োজন করা হয়। ১৯০৪ সালে চালু হওয়া এই স্টেশনটি নিউ ইয়র্কের প্রথম ২৮টি সাবওয়ে স্টেশনের একটি, যা ১৯৪৫ সাল থেকে জনসাধারণের জন্য বন্ধ রয়েছে। চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর এই ঐতিহাসিক স্থানটি শহরের উন্নয়ন ও অগ্রগতির এক অনন্য সাক্ষী।
শপথ নেওয়ার পর মামদানি এই স্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, 'শহরের প্রাণশক্তি, জনস্বাস্থ্য ও ঐতিহ্যের জন্য গণপরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।' তিনি অভিজ্ঞ নগর পরিকল্পনাবিদ মাইকেল ফ্লিনকে শহরের পরবর্তী পরিবহন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দেন।
গণপরিবহন ব্যবস্থা তার কর্মপরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকবে জানিয়ে মামদানি ঘোষণা করেন, শহরের বাস চলাচল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি তিনি বাইসাইকেল লেনের নেটওয়ার্ক বাড়ানো এবং রাস্তাগুলোকে পথচারীদের জন্য আরও নিরাপদ ও উপযোগী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে তার এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কিছুটা সংশয় রয়েছে। এসব ব্যয় মেটাতে তিনি ধনীদের ওপর বাড়তি কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা বাস্তবায়নের জন্য রাজ্য আইনসভা ও গভর্নরের সমর্থন প্রয়োজন হবে। যদিও নিউ ইয়র্কের অর্থনীতি বর্তমানে স্থিতিশীল, জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয় সাধারণ মানুষকে চাপের মধ্যে ফেলছে।
মামদানির এই জয় ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় পর্যায়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, দলটি কি আরও বামপন্থার দিকে ঝুঁকবে এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টিকে প্রধান ইস্যু হিসেবে সামনে আনবে কি না।
