মামদানির অভিষেক: ‘নিউ ইয়র্ক, নিউ ইয়ার, নিউ মেয়র’
নতুন বছরের প্রথম প্রহরেই নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে শপথ নিলেন জোহরান মামদানি। ঐতিহাসিক সিটি হল সাবওয়ে স্টেশনে স্ত্রী রামা দুওয়াজিকে পাশে নিয়ে শপথ গ্রহণ করেন তিনি।
তাকে শপথবাক্য পাঠ করান নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিটিয়া জেমস। শপথ অনুষ্ঠানে মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও নিউ ইয়র্কের আইন সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার করেন।
মাথার ওপরে খিলান করা ছাদে লেখা 'সিটি হল'। নিচে দাঁড়িয়ে মামদানি বললেন, 'এই সুড়ঙ্গের ভেতরে ও ওপরে থাকা সব নিউ ইয়র্কবাসীকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। এই দায়িত্ব পাওয়া আমার জীবনের অন্যতম বড় সম্মান ও সৌভাগ্য।'
নিউ ইয়র্কের ৮০ লাখ বাসিন্দার কাছে মামদানি একজন ব্যতিক্রমী রাজনীতিক। অনেকে তাকে নিয়ে যেমন আশাবাদী, তেমনি কারও কারও মনে শঙ্কাও রয়েছে। অনেকেরই ধারণা, মেয়র হিসেবে তিনি প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেন।
একজন ডেমোক্র্যাটিক সোস্যালিস্ট হিসেবে মামদানির রাজনীতি ও অগ্রাধিকারগুলো কিছুটা ভিন্ন। তবে শপথ অনুষ্ঠানে তিনি ঐতিহ্যের বাইরে যাননি। বৃহস্পতিবার বিকেলে বড় পরিসরে অনুষ্ঠানের আগে মধ্যরাতের অনাড়ম্বর আয়োজনে তিনি শপথ সেরেছেন।
নিউ ইয়র্কের আইন অনুযায়ী, নির্বাচনের পর ১ জানুয়ারি থেকেই মেয়রের চার বছরের মেয়াদ শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল এই শহরের নেতৃত্বে কে আছেন, তা নিয়ে যেন কোনো ধোঁয়াশা না থাকে, সে জন্য মধ্যরাতের পরপরই শপথ নেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে।
শপথের জন্য মামদানি বেছে নিয়েছিলেন পুরোনো সিটি হল সাবওয়ে স্টেশনটিকে। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্টেশনটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এখন বছরে মাত্র কয়েকবার গাইডেড ট্যুরের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা সেখানে যেতে পারেন।
মামদানির ট্রানজিশন টিম জানিয়েছে, শপথের জন্য সাবওয়ে স্টেশন বেছে নেওয়ার বিশেষ কারণ রয়েছে। যারা প্রতিদিন এই শহরকে সচল রাখেন, সেই শ্রমজীবী মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই মামদানি এই স্থানটি বেছে নিয়েছেন।
৩৪ বছর বয়সী সাবেক এই আইনপ্রণেতা তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি বাড়িভাড়া বৃদ্ধি আটকে দেওয়া, বাসে বিনা মূল্যে যাতায়াত এবং শিশুদের জন্য ফ্রি ডে-কেয়ার বা দিবাযত্ন কেন্দ্রের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সারা দেশে ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য এটি একটি পথ হতে পারে।
মামদানির কারণে এবার রেকর্ডসংখ্যক—২০ লাখের বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন। তিনি মোট ভোটের ৫০ শতাংশ পেয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুওমোর চেয়ে তিনি প্রায় ১০ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। আর রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া ছিলেন তার চেয়ে অনেক পিছিয়ে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের রসায়ন
নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস শুরু থেকেই মামদানির বড় সমর্থকদের একজন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জেমস তার (ট্রাম্পের) ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত শুরু করেছিলেন। এর জেরেই ২০২৪ সালে আদালত রায় দিয়েছিলেন যে ঋণদাতাদের ধোঁকা দিতে ট্রাম্প নিজের সম্পদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখিয়েছিলেন।
এখন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে জেমসকে লক্ষ্যবস্তু করেছে তাঁর প্রশাসন। জেমসের বিরুদ্ধে বন্ধকি ঋণে) জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
সিরাকিউস ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গ্রান্ট রিহার মনে করেন, শপথ অনুষ্ঠানে জেমসের উপস্থিতি মামদানির মূল সমর্থকদের কাছে একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছে। বার্তাটি হলো—মামদানি প্রেসিডেন্টের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবেই কাজ করবেন।
নিউ ইয়র্কে 'নতুন যুগের' সূচনা
উগান্ডায় জন্ম নেওয়া জোহরান মামদানি নিউ ইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়লেন। অভিবাসনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচক। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে তার একটি বৈঠক বেশ ইতিবাচক হলেও মামদানি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য অনেক।
তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে শপথ নেওয়ার বিষয়টি কেবল ট্রাম্প-বিরোধিতা নয়, বরং মামদানির রাজনৈতিক মেরুকরণেরও ইঙ্গিত দেয়। মামদানি তাঁর জীবদ্দশায় বিল ডি ব্লাজিওকে নিউ ইয়র্কের 'সেরা মেয়র' বলে মনে করেন।
২০১৪ সালে ব্লাজিও তার প্রথম মেয়াদের শুরুতে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল এরিক স্নাইডারম্যানের কাছে ঘরোয়াভাবে শপথ নিয়েছিলেন। মামদানিও সেই পথেই হাঁটলেন।
নিউ ইয়র্কের সিটি হল প্লাজায় মামদানির প্রকাশ্য অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন প্রগতিশীল সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। ব্রুকলিনে জন্ম নেওয়া ভারমন্টের এই সিনেটরকে মামদানি নিজের 'অনুপ্রেরণা' বলে মানেন। ২০১৮ সালে ডি ব্লাজিওর অভিষেক অনুষ্ঠানের মতো এবার মামদানির অনুষ্ঠানেও সভাপতিত্ব করবেন স্যান্ডার্স। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজেরও (এওস) থাকার কথা রয়েছে।
সিটি হলের সিঁড়িতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ৪ হাজার অতিথি উপস্থিত থাকবেন। থাকবে গান ও বক্তৃতার আয়োজন। মামদানির দল এই আয়োজনের নাম দিয়েছে—'নতুন যুগের সূচনা' (ইনোগ্রেশন অফ অ্যা নিউ এরা)। ব্রডওয়ে এলাকাজুড়ে বসানো বড় পর্দায় হাজার হাজার মানুষ সরাসরি এই অনুষ্ঠান দেখতে পারবেন।
অভিষেক অনুষ্ঠান ও আনুষঙ্গিক কাজের জন্য রেকর্ড পরিমাণ তহবিল সংগ্রহ করেছেন মামদানি। ৩০ হাজার অনুদানকারীর কাছ থেকে তিনি ২৬ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছেন। অফিশিয়াল ক্যাম্পেইন ডেটা বলছে, ২০০১ সালে মাইকেল ব্লুমবার্গের পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো মেয়র তহবিলে এত বিপুল অর্থ ও মানুষের সাড়া পাননি।
