‘সেলফ-হেল্প’ বইগুলো আমাদের সম্পর্কে আসলে কী বলে
আধুনিককালের 'সেলফ-হেল্প' বা আত্মউন্নয়নমূলক বইয়ের হালচাল বুঝতে চাইলে একটি বইয়ের ওপর চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক—'অলওয়েজ রিমেম্বার: দ্য বয়, দ্য মোল, দ্য ফক্স, দ্য হর্স অ্যান্ড দ্য স্টর্ম'। এটি বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয় বই 'দ্য বয়, দ্য মোল, দ্য ফক্স অ্যান্ড দ্য হর্স'-এর পরবর্তী খণ্ড। গত বড়দিনের ছুটিতে ব্রিটেনের বেস্টসেলার তালিকার শীর্ষে ছিল এই রূপকধর্মী প্রাণীদের গল্পের বইটি।
লাখ লাখ কপি বিক্রি হওয়া এই বইটিকে পাঠকেরা 'হৃদয়স্পর্শী' বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে সমালোচকদের মতে, কোনো বই যখন অবিশ্বাস্য পরিমাণে বিক্রি হয় এবং তাকে খুব বেশি 'হৃদয়স্পর্শী' বলা হয়, তখন ধরে নিতে হবে ভেতরে নতুন কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা আসলে কম।
বইটি খুললেই দেখা যাবে, বনের পশুরা জীবন ও ভালোবাসা নিয়ে চমৎকার সব কথা বলছে। তাদের এই গভীর জীবনদর্শন শিশুদের উদ্দেশ্যে লেখা হলেও বড়দের কাছে এর আবেদন ব্যাপক।
যেমন বইটির একটি অংশ ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল হয়েছে: 'কখনো কখনো তোমার মন তোমার সঙ্গে চালাকি করে। এটি তোমাকে বলতে পারে যে তুমি অযোগ্য, সবকিছুই আশাহীন। কিন্তু মনে রেখো, তুমি অনেক গুরুত্বপূর্ণ, তোমাকে সবাই ভালোবাসে এবং তুমি এই পৃথিবীতে এমন কিছু নিয়ে এসেছ যা অন্য কারও নেই। তাই হাল ছেড়ো না।'
এই লেখার সুর অনেকটা 'উইনি দ্য পু' গল্পের মতো শোনায়, তবে এর ভেতরে জীবনবোধের সেই অন্ধকার বা জটিল দিকগুলো নেই।
আজকালকার আত্মউন্নয়নমূলক বইয়ের জগৎটা বেশ বিশাল। এর মধ্যে যেমন সচিত্র বই আছে, আছে কবিতাও; আবার ক্যারিয়ারে সফল হওয়ার টিপস তো রয়েছেই। তবে প্রশ্ন হলো, এই বইগুলো কি আসলেই মানুষকে বদলে দেয়? স্টিফেন কোভির 'দ্য সেভেন হ্যাবিটস অব হাইলি ইফেক্টিভ পিপল' কিনলেই কি আপনি রাতারাতি একজন অত্যন্ত কার্যকর মানুষ হয়ে যাবেন? উত্তরটা সম্ভবত 'না'।
তাহলে মানুষ কেন এই বইগুলো কেনে? সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য এই বইগুলো এক একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এগুলো আমাদের জানায় আমরা আসলে কী হতে চাই, আর তার চেয়েও বেশি জানায় আমরা আসলে বর্তমানে কেমন আছি।
গত এক শতাব্দীর সেলফ-হেল্প বইগুলোর ওপর চোখ বুলালে একে 'দুশ্চিন্তার প্রত্নতত্ত্ব' (আর্কিওলজি অব অ্যাংজাইটি) বলা যেতে পারে। সময়ের সাথে সাথে মানুষের উদ্বেগের ধরণ বদলেছে, আর এই বইগুলো সেই উদ্বেগেরই প্রতিচ্ছবি।
ভিক্টোরিয়ান যুগে যখন সমাজ কঠোর শ্রেণিবিন্যাসে বন্দি, তখন স্যামুয়েল স্মাইলস তার 'সেলফ-হেল্প' বইয়ে লিখেছিলেন—সফল হওয়ার জন্য মানুষের শুধু 'ইচ্ছাশক্তি' আর 'মনোযোগের অভ্যাস' থাকলেই চলে। আবার ১৯৩৭ সালে মহামন্দার সময়ে নেপোলিয়ন হিলের 'থিংক অ্যান্ড গ্রো রিচ' বই অভাবগ্রস্ত মানুষকে শেখাল, ধনী হতে চাইলে আগে কল্পনা করতে হবে যে 'টাকাটা ইতিমধ্যেই আপনার হাতে আছে'।
আর বর্তমান সময়ের কথাই ধরুন। ২০১৮ সালে বাজারে আসা তুমুল জনপ্রিয় 'অ্যাটমিক হ্যাবিটস' বই আধুনিক সময়ের কর্মব্যস্ত মানুষকে শেখাচ্ছে কীভাবে মাত্র চারটি সহজ সূত্রের মাধ্যমে অভ্যাসে পরিবর্তন আনা যায়।
অর্থাৎ, সময়ের প্রয়োজনে আমাদের দুশ্চিন্তার বিষয়গুলো বদলেছে, আর সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলেছে আত্মউন্নয়নমূলক বইয়ের ভাষা ও কৌশল। দিনশেষে এই বইগুলো আমাদের জীবন যতটা না বদলায়, তার চেয়ে বেশি আমাদের ভেতরের অস্থিরতা ও আকাঙ্ক্ষাকেই বারবার আয়নায় ফুটিয়ে তোলে।
সাম্প্রতিক বইগুলোতে অন্য এক প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। সাংস্কৃতিক জীবনে ধর্মের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেলফ-হেল্প বা আত্মউন্নয়নমূলক বইয়ের পাতাতেও এখন 'ঈশ্বর' জায়গা করে নিয়েছেন।
লিংকডইন-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান একবার বলেছিলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো তখনই সবচেয়ে সফল হয় যখন তারা মানুষের 'সাতটি মহাপাপের' (যেমন লোভ বা অহংকার) কোনো একটিকে উসকে দিতে পারে। বর্তমানের বেস্টসেলার বইগুলোর তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, একই সূত্র মেনেই সেখানে 'সম্পদের পাঁচ ধরন' কিংবা 'ওজন কমানোর ছোট ছোট অভ্যাস'-এর মতো বিষয়গুলো জায়গা করে নিচ্ছে। মানুষের এই আদি প্রবৃত্তিগুলোই এখন প্রকাশকদের পকেটে সাত অঙ্কের মুনাফা এনে দিচ্ছে।
এই ধারার অনেক বই নিজেরাই আবার একগুচ্ছ 'পাপ' বা ত্রুটি নিয়ে হাজির হয়। এর মধ্যে আছে অহেতুক বড় হাতের অক্ষরের (ক্যাপিটাল লেটার) ব্যবহার, তথ্যসূত্রহীন গ্রাফ কিংবা 'এলিভেট'-এর মতো গালভরা শব্দের অসংলগ্ন প্রয়োগ।
এমনকি কোনো কোনো বইয়ে নিম্নমানের কবিতাও জুড়ে দেওয়া হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত 'জয় চোজ ইউ' সংকলনের একটি কবিতায় বলা হয়েছে—'প্রতিদিন আমি নতুন যা দেখি, তাতে অবাক হই... নিজের জটিলতা দেখে অবাক হই'। এমন কবিতা পড়ে পাঠকদের মনে হতেই পারে, 'আনন্দ নয়, বরং বিরক্তিই আসলে আমাকে বেছে নিয়েছে!'
অনেক বইতে আবার একধরনের প্রাচীন গাম্ভীর্য আনার চেষ্টা দেখা যায়। বর্তমানে স্টোয়িসিজম' বা বৈরাগ্যবাদ বেশ জনপ্রিয়। আমাজনে রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের 'মেডিটেশনস' বইটির রেটিং এখন ৪.৭; সামনেই 'হাউ টু লিভ লাইক আ স্টোয়িক' নামে আরেকটি বই আসছে। তবে এসব বইয়ের ভাষা ও লক্ষ্য পুরোপুরি আধুনিক, বিশেষ করে সময়ের প্রতি মানুষের যে তীব্র আসক্তি, সেটিই এখানে বেশি গুরুত্ব পায়।
স্যামুয়েল স্মাইলস যখন ১৮৫৯ সালে তাঁর 'সেলফ-হেল্প' লিখেছিলেন, ব্রিটেন তখন গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে। ঋতুভেদে চাষাবাদ বা ঘুমের অভ্যাস ছেড়ে মানুষ তখন ঘড়ির কাঁটার তালে জীবন কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।
সময়ের এই তাড়া আধুনিক সেলফ-হেল্প বইগুলোতেও স্পষ্ট। সম্রাট অরেলিয়াস যখন অনন্তকালের প্রেক্ষাপটে মানুষের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার কথা ভাবতেন, আধুনিক যুগের লেখকেরা সেখানে অনেক বেশি বাস্তববাদী।
সাম্প্রতিক বেস্টসেলার '৪,০০০ উইকস' মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের আয়ু গড়ে মাত্র চার হাজার সপ্তাহ! আবার 'অ্যাটমিক হ্যাবিটস' শেখাচ্ছে কর্মদক্ষতা বাড়াতে মাত্র 'দুই মিনিটের নিয়ম'।
সেলফ-হেল্প ঘরানাটি একদিকে যেমন প্রাপ্তবয়স্কদের দুশ্চিন্তার ভারে নুয়ে পড়া, অন্যদিকে এগুলো অদ্ভুতভাবে শিশুতোষও বটে। বেস্টসেলার তালিকার 'হোয়াই হ্যাজ নোবডি টোল্ড মি দিস বিফোর?' কিংবা 'কান্ট হার্ট মি'—এর মতো বইগুলোর নাম পড়লে মনে হতে পারে এগুলো প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নয়, বরং কোনো বায়না ধরা শিশুর কথা। এমনকি লেখকেরা যখন আধুনিক শব্দ ব্যবহার করেন, তখনও সেখানে একধরনের জেদি ও রূঢ় ভঙ্গি প্রকাশ পায়। এর বড় উদাহরণ 'দ্য সাটল আর্ট অব নট গিভিং আ ফ*ক' নামের জনপ্রিয় বইটি।
ডেনমার্কের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং 'স্ট্যান্ড ফার্ম' বইয়ের লেখক সভেন্দ ব্রিঙ্কম্যান মনে করেন, আধুনিক আত্মউন্নয়নমূলক বইগুলোর একটি বড় সমস্যা হলো এগুলোর 'শিশুতোষ' ভঙ্গি। অধিকাংশ বই পাঠককে প্ররোচিত করে নিজের সব আবেগ-অনুভূতিকে কোনো বাছবিচার ছাড়াই প্রকাশ করতে। তারা বলে, তথাকথিত 'মিথ্যা খোলস' ভেঙে বেরিয়ে আসাই নাকি আসল বা 'অথেনটিক' হওয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব চিন্তা ও অনুভূতিকে এভাবে লাগামহীন প্রশ্রয় দেওয়া আসলে বর্তমানের ব্যক্তিকেন্দ্রিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যুগেরই একটি কুফল।
বর্তমানে স্টোয়িসিজম নিয়ে অনেক বই লেখা হচ্ছে, কিন্তু সেগুলোর উদ্দেশ্য আসলে প্রাচীন দর্শনের ঠিক উল্টো। অনেক বইয়ের উপশিরোনাম থাকে—'সুখের হাতবই'। কিন্তু প্রাচীন দার্শনিকদের কাছে 'সুখ' বা হ্যাপিনেস কোনো চিরস্থায়ী লক্ষ্য ছিল না। অথচ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস ওয়ারেন বলছেন, 'সুখ' কোনো স্থায়ী বিষয় নয়; এটি আসে আর যায়। প্রাচীন দার্শনিকরা কেবল এমন কোনো ক্ষণস্থায়ী অনুভূতির পেছনে ছুটতেন না, বরং তারা একটি 'ভালো জীবন' কাটানোর ওপর জোর দিতেন। আর তাদের মতে, কেবল বই পড়ে একটি আদর্শ ও ভালো জীবন কাটানো অসম্ভব।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এসব বই কি আসলে মানুষের কোনো উপকারে আসে? গবেষণায় দেখা গেছে, এর প্রভাব খুবই নগণ্য। প্রকৃত সুখের জন্য বরং দার্শনিক ও ঔপন্যাসিক আইরিস মারডকের দেওয়া 'আনসেলফিং' ধারণাটি বেশি কার্যকর। এর অর্থ হলো নিজের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসা।
প্রকৃত তৃপ্তি বা সার্থকতা আসলে নিজেকে নিয়ে দিনরাত পড়ে থাকার মধ্যে নেই। অধ্যাপক ব্রিঙ্কম্যানের মতে, যখন আপনি নিজের ওপর থেকে মনোযোগ সরিয়ে বাইরের জগতের দিকে তাকাবেন, তখনই প্রকৃত সার্থকতা খুঁজে পাবেন। যেমন, পোষা প্রাণীর সঙ্গে সময় কাটানো, শিশুদের সঙ্গে খেলা করা, প্রকৃতির মাঝে হাঁটতে যাওয়া কিংবা মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করার মাধ্যমেই প্রকৃত তৃপ্তি পাওয়া যায়।
তাই এই জানুয়ারিতে নিজের উন্নতির দাওয়াই দেওয়া বইয়ের বদলে অন্য কোনো বই পড়ার কথা ভাবতেই পারেন।
