আমেরিকার বুকে হাজার বছর বেঁচে থেকেও যে জনগোষ্ঠী হারিয়ে গেল রহস্যে
মধ্য আর্জেন্টিনার মাটি খুঁড়ে পাওয়া প্রাচীন ডিএনএ এক অজানা মানবগোষ্ঠীর সন্ধান দিয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে এই জনপদ সেখানে টিকে ছিল, অথচ ইতিহাসের পাতায় তারা ছিল পুরোপুরি অনুপস্থিত।
গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য। হাজার হাজার বছর ধরে এই মানুষগুলো একই মাটিতে নিজেদের অস্তিত্ব আঁকড়ে ছিল। তাদের চোখের সামনে বদলেছে চারপাশের সংস্কৃতি, ভাষা, এমনকি প্রযুক্তিও। কিন্তু তারা তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে কোথাও নড়েনি।
প্রাচীন মানুষের দেহাবশেষ—যার মধ্যে ছিল ওই অঞ্চলের শিকারি, জেলে ও কৃষকদের হাড়গোড়—থেকে নেওয়া ডিএনএ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এই হারানো ইতিহাসের জট খুলেছেন। দক্ষিণ আমেরিকার জিনগত মানচিত্রের এক বিশাল শূন্যস্থান পূরণ করেছে এই গবেষণা।
আর্জেন্টিনায় আদিম মানুষের খোঁজে
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনতত্ত্ববিদ জ্যাভিয়ের মারভাল লোপেজ এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুরো আমেরিকাজুড়ে আদিবাসী মানুষের দীর্ঘমেয়াদি ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন।
ইতিহাসের গভীরে যেতে গবেষকরা নির্ভর করেছেন প্রাচীন ডিএনএর ওপর। পুরোনো হাড় ও দাঁতে সংরক্ষিত জিনগত উপাদান থেকেই মিলেছে এসব অমূল্য তথ্য। মূলত মধ্য ও উত্তর আর্জেন্টিনাকে কেন্দ্র করেই চলেছে এই অনুসন্ধান, কারণ আগের জিনগত গবেষণাগুলোতে এই অঞ্চলটি ছিল অনেকটাই উপেক্ষিত।
দক্ষিণ আমেরিকার জিনতত্ত্ব নিয়ে আগের গবেষণাগুলোতে মূলত তিনটি প্রধান বংশধারার খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল—আন্দিজ পর্বতমালা, আমাজন বনাঞ্চল এবং একেবারে দক্ষিণের অঞ্চল। মধ্য আর্জেন্টিনা ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চলগুলোর ঠিক মাঝখানে। তাই বিভিন্ন বংশোদ্ভূত মানুষ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে মিশেছে, সেই রহস্যভেদে এটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলেন, আধুনিক মানুষ পৃথিবীর যেসব জায়গায় সবশেষে বসতি গড়েছিল, দক্ষিণ আমেরিকার এই শেষ প্রান্ত তার অন্যতম। এখানে মানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল বেশ দেরিতে। তার ওপর ছিল ডিএনএ নমুনার অভাব। ফলে প্রাচীন জনপদের ইতিহাস পুনর্গঠনে এই অঞ্চলটি এত দিন 'অন্ধকার অধ্যায়' হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল।
ইতিহাসের একটি বিস্তারিত সময়রেখা তৈরির জন্য গবেষকরা মধ্য ও উত্তর আর্জেন্টিনাজুড়ে উদ্ধার করা শত শত মানুষের হাড় ও দাঁত পরীক্ষা করেছেন।
এই উপাদান থেকে ২৩৮ জন প্রাচীন মানুষের জেনোমের একটি ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রায় প্রতিটি ক্রোমোজোমের জিনগত তথ্য সংরক্ষিত। বিজ্ঞানীরা প্রতিটি নমুনাকে ১০ লাখেরও বেশি 'সিঙ্গেল নিউক্লিওটাইড পলিমরফিজম' বা এসএনপি দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। সহজ কথায়, এগুলো হলো ডিএনএর অতি ক্ষুদ্র পরিবর্তন, যা বংশপরিচয়ের গোপন সংকেত দেয়।
প্রাচীন ও বর্তমান সময়ের আদিবাসী আমেরিকানদের তথ্যের সঙ্গে এই চিহ্নগুলো মিলিয়ে দেখা হয়েছে। এর মাধ্যমেই বোঝা গেছে কোন গোষ্ঠীগুলো একে অপরের আত্মীয় ছিল এবং তাদের পূর্বপুরুষরা কোথায়, কীভাবে মিশেছিল।
দেহাবশেষগুলোর বয়স বের করতে ব্যবহার করা হয়েছে রেডিওকার্বন ডেটিং পদ্ধতি। এই অঞ্চলের প্রথম কবর দেওয়া মানুষ থেকে শুরু করে ইউরোপীয়দের আসার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই নমুনাগুলো। অর্থাৎ, এখানকার মানব ইতিহাসের পুরো সময়টাই উঠে এসেছে এই গবেষণায়।
গণিতের জটিল সব সূত্র ব্যবহার করে গবেষক দলটি সেই সময়ের জনসংখ্যার কাঠামো পুনর্গঠন করেছেন। একই সঙ্গে অতীতের সমাজ বা গোত্রের আকার কেমন ছিল, তা-ও অনুমান করেছেন। এমনকি তথ্যের ভেতর খুঁজে বের করেছেন নিকটাত্মীয়দের। এর মাধ্যমে জানা গেছে তাদের বিবাহপ্রথা ও সামাজিক নিয়মকানুন, যা শুধু পাথর বা মাটির পাত্র দেখে বোঝা সম্ভব ছিল না।
যে জনপদ কখনো জায়গা পরিবর্তন করেনি
গবেষণায় একটি বিষ্ময়কর ফলাফল পাওয়া গেছে। মধ্য আর্জেন্টিনায় এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবগোষ্ঠীর সন্ধান মিলেছে, যাদের বংশের প্রাচীনতম সদস্য প্রায় ৮ হাজার ৫০০ বছর আগে ঠিক এই অঞ্চলেই বসবাস করতেন।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ সেই একই বংশধারার ডিএনএ বহন করে চলেছে। হাজার বছর ধরে টিকে থাকার এমন নজির সচরাচর দেখা যায় না। এমনকি প্রায় ৬ হাজার থেকে ৪ হাজার বছর আগে যখন তীব্র খরা দেখা দিয়েছিল, সেই প্রতিকূল সময়েও এই বংশধারা হারিয়ে যায়নি।
পুরো অঞ্চলজুড়ে দেখা গেছে, মধ্য আর্জেন্টিনার এই বংশধারা ধীরে ধীরে প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিশেছে। লোপেজ বলেন, 'আমরা দেখেছি মধ্য আর্জেন্টিনার বংশধারাটি ভৌগোলিকভাবে দুটি ভিন্ন রেখায় বিভক্ত। এটি সম্পূর্ণ নতুন এক মানবগোষ্ঠী, যাদের সম্পর্কে আমরা আগে কিছুই জানতাম না।'
ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য
জিনগত সংকেতগুলো বেশ সাধারণ মনে হলেও প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড বলছে ভিন্ন কথা। মধ্য আর্জেন্টিনাজুড়ে ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জগাখিচুড়ি বা বৈচিত্র্যময় মিশ্রণ ছিল।
নতুন ফলাফল বলছে, এই বৈচিত্র্যের বেশির ভাগই তৈরি হয়েছে স্থানীয়ভাবে, একই বংশোদ্ভূত মানুষের মধ্যে। বাইরে থেকে আসা বড় কোনো দলের প্রভাবে এটি ঘটেনি।
গবেষণা এলাকার উত্তর-পশ্চিমে নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের হার বেশি দেখা গেছে। যেমন চাচাতো বা মামাতো ভাইবোনদের মধ্যে বিয়ে। আন্দিজ পর্বতমালার প্রাচীন মানুষদের নিয়ে করা অন্য একটি গবেষণাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ইউরোপীয়দের আসার ঠিক আগের শতাব্দীগুলোতে সেখানেও স্বজনদের মধ্যে বিয়ের প্রচলন বেড়েছিল।
স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক আমলের নথিপত্র এবং আধুনিক নৃবিজ্ঞানে 'আইলু' নামের এক প্রথার বর্ণনা পাওয়া যায়। এটি একটি আত্মীয়তা-ভিত্তিক সামাজিক প্রথা, যা সাধারণ বংশপরিচয়ের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে রাখত।
নৃবিজ্ঞানীরা 'আইলু'কে বর্ণনা করেন একটি বিস্তৃত সামাজিক গোষ্ঠী হিসেবে। জমি, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি আর রক্তের সম্পর্ক—এসবই ছিল এই গোষ্ঠীর ভিত্তি। ডিএনএ গবেষণা থেকে পাওয়া জিনগত মিল এবং উত্তর-পশ্চিম আর্জেন্টিনায় নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ধরন সেই 'আইলু' প্রথার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
কেন এই ইতিহাস আজ জরুরি
এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক সম্পর্ক স্থানীয় পরিচয়কে মুছে ফেলতে পারেনি। প্রাচীন ব্যক্তিদের মধ্যে পাম্পাস অঞ্চলের এক নারীর হদিস পাওয়া গেছে, যিনি প্রায় ১০ হাজার বছর আগে সেখানে বাস করতেন। তিনি এই অঞ্চলের একদম শুরুর দিকের বাসিন্দা।
উত্তরের প্রাচীন গোষ্ঠীগুলোর চেয়ে দক্ষিণের পরবর্তী মানুষদের সঙ্গে তার ডিএনএর মিল অনেক বেশি। এটি প্রমাণ করে, দক্ষিণ আমেরিকায় মানুষ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।
সেই প্রাথমিক বিস্তারের পর, অনেক জনগোষ্ঠী একই বিশাল অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে গিয়েছিল। ফলাফলগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—হাতিয়ার, কৃষি বা ভাষার বড় পরিবর্তন মানেই এই নয় যে নতুন কোনো জনসংখ্যা সেখানে এসেছে। মানুষ একই থাকতে পারে, শুধু তাদের ধারণা ও প্রযুক্তি বদলাতে পারে।
মধ্য আর্জেন্টিনায় মূল বংশধারা অনেকটা একই থাকলেও সংস্কৃতি বদলেছে। আজকের বংশধরদের জন্য এই জিনগত রেকর্ড একটি বড় প্রমাণ যে, এই মাটিতে তাদের শেকড় হাজার হাজার বছর গভীরে প্রোথিত।এই গবেষণা এমন এক ইতিহাসের ওপর আলো ফেলেছে, যা লিখিত দলিলে খুব কমই পাওয়া যায়। কারণ এই জেনোমগুলোর পেছনের বেশির ভাগ মানুষ কখনো সরকারি নথিপত্রে স্থান পাননি।
ভবিষ্যতের গবেষণায় আরও ঘনঘন নমুনা সংগ্রহের প্রয়োজন হবে, বিশেষ করে গ্রান চাকো এবং পাম্পাসের কিছু অংশ থেকে। তখন হয়তো জানা যাবে, খরা কিংবা নতুন ফসলের আগমনে এই মানুষগুলো কীভাবে সাড়া দিয়েছিল।
