অবতরণের সময় বিমান উল্টে আগুন, মৃত্যুর মুখ থেকে যেভাবে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেন সব যাত্রী
মিনেসোটার পিট কার্লটনের কাছে দিনটি ছিল আর দশটা সাধারণ বিজনেস ট্রিপের মতোই। নিরাপত্তা তল্লাশি পার হওয়া, বোতলে পানি ভরা আর গেটে দাঁড়িয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা—সবই ছিল বড্ড স্বাভাবিক। নিয়মিত বিমানে চড়া কার্লটনের মনে তখন ঘুণাক্ষরেও ছিল না, কিছুক্ষণ পরেই তার জীবন পুরোপুরি বদলে যেতে চলেছে।
ফেব্রুয়ারির সেই কনকনে শীতের দুপুরে তিনি টরন্টোগামী ডেল্টা কানেকশনের 'ফ্লাইট ৪৮১৯'-এ চড়ে বসেন। জানালার পাশে ৯-ডি সিটটি খুঁজে নিয়ে কানে গুঁজে দেন বিটস ইয়ারবাড। এরপর বাইরের কোলাহল থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে ছেড়ে দেন তার প্রিয় কানাডিয়ান রক ব্যান্ড 'দ্য ট্র্যাজিক্যালি হিপ'-এর গান।
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। প্রায় ৯০ মিনিটের ফ্লাইট তখন শেষ হওয়ার পথে। কিন্তু বিপত্তি বাধল অবতরণের ঠিক আগমুহূর্তে। কার্লটন বলেন, 'বিমানটি খুব কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা খুব দ্রুতগতিতে নামছি। কেমন যেন ঠিক ঠেকছিল না।'
হঠাৎ বিকট শব্দ। কার্লটনের ভাষায়, 'মনে হলো, এক দলা ইটের ওপর আছড়ে পড়লাম আমরা। জানালার দিকে তাকাতেই দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।'
মূলত বিমানটির প্রধান ল্যান্ডিং গিয়ার অকেজো হয়ে গিয়েছিল। ফলে রানওয়েতে আছড়ে পড়ে ঘষটে যেতে লাগল জেটের শরীর। জমে যাওয়া কংক্রিটের রানওয়েতে বিমানের ধাতব শরীর ঘষটে যাওয়ার সেই শব্দ ছিল ভয়ংকর। ধাক্কা লেগে ভেঙে গেল একটি ডানা, আলাদা হয়ে গেল বিমানের লেজ। ডান দিকের ডানাটি ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেই জানালার বাইরের আগুনটা অদৃশ্য হয়ে গেল।
এরপরই ঘষটে চলতে চলতে একসময় বিমানটি উল্টে যায়। মেঝে হয়ে যায় ছাদ, আর ছাদ হয়ে যায় মেঝে। কার্লটন বলেন, 'তখনই জানালার পাশে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেলাম। মনে হচ্ছিল, অনন্তকাল ধরে আমরা ঘষটে চলেছি। অবশেষে একসময় সব থামল।'
সব থামার পর চারপাশ তখন নিস্তব্ধ। শুধু যাত্রীদের হাতের অ্যাপল ওয়াচগুলো সংকেত দিচ্ছিল। প্রচণ্ড শব্দ আর আঘাতে ঘড়িগুলো বিপদ আঁচ করতে পেরে অ্যালার্ম বাজাচ্ছিল। কার্লটন দেখলেন, যাত্রীরা তখন সিটের বেল্টে আটকে বাদুড়ের মতো উল্টো হয়ে ঝুলছেন। রক্ত সব মাথায় উঠে আসছিল।
আগুন নেই দেখে কার্লটনের মাথায় তখন একটাই চিন্তা—যেকোনো মূল্যে বাঁচতে হবে। নিচে (উড়োজাহাজের ছাদ) তাকিয়ে কার্লটন পাশের সেই অচেনা যাত্রীর খোঁজ নিলেন, যাত্রার শুরুতে যার সঙ্গে তিনি একটি কথাও বলেননি। ওই যাত্রীও কার্লটনের খবর নিলেন। একে অপরকে সিটবেল্ট খুলতে ও নিচে নামতে সাহায্য করলেন।
সিটবেল্ট খুলতেই ধপ করে উড়োজাহাজের ছাদে (এখন যেটা মেঝে) পড়ে ব্যথা পেলেন কার্লটন। পড়ার সময় অনেকেই খেয়াল রাখছিলেন, যাতে অন্যের গায়ে আঘাত না লাগে। সবার মুখে তখন একটাই চিৎকার, 'দরজা খোলো! দরজা খোলো!' দরজা খোলার আগপর্যন্ত সেই কয়েক মিনিট যাত্রীরা একে অপরকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।
কেবিনের মেঝেতে তখন জেট ফুয়েল গড়াগড়ি খাচ্ছে। বিধ্বস্ত ও এলোমেলো অবস্থায় কার্লটন হামাগুড়ি দিয়ে বের হওয়ার পথের দিকে এগোচ্ছিলেন। উল্টে যাওয়া উড়োজাহাজের ওপরের তাক (ওভারহেড বিন) থেকে ছিটকে পড়া যাত্রীদের ব্যাগগুলো সরিয়ে তিনি সহযাত্রীদের যাওয়ার পথ করে দিচ্ছিলেন।
জ্বালানিতে ভেজা শরীর নিয়ে অবশেষে বিমান থেকে বেরিয়ে আসেন কার্লটন। কয়েক কদম এগিয়ে তিনি পেছনে তাকান। টারমাকে দাঁড়িয়ে দেখেন, উড়োজাহাজের ধ্বংসস্তূপের একটি অংশে বিস্ফোরণ ঘটার ঠিক আগমুহূর্তে দুজন দমকলকর্মী লাফিয়ে নামলেন। কার্লটন কিছুক্ষণ আগে যে জরুরি নির্গমন পথ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন, তারাও সেখান দিয়েই লাফ দিয়েছেন।
সেখান থেকে কার্লটন ফিরেছেন একেবারে শূন্য হাতে। তার মুঠোফোন, ওষুধপত্র আর ব্যাগ—সবই রয়ে গেছে সেই ধ্বংসস্তূপে।
টারমাকে দাঁড়িয়ে কার্লটনের কান ভোঁ ভোঁ করছিল। তিনি দেখছিলেন, শ্বাসকষ্টে ভোগা এক ব্যক্তি এবং একটি শিশুকে নিয়ে এক পরিবারকে হেলিকপ্টারে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরপর বাকি যাত্রীদের টার্মিনালে নেওয়ার জন্য দুটি বাস এল। যাত্রীদের গায়ে লেগে থাকা জেট ফুয়েলের গন্ধ এতটাই তীব্র ছিল যে বাসের জানালা খুলে দিতে হয়েছিল। বাসের ভেতরের পরিবেশ ছিল মিশ্র আবেগে ভরা। কেউ কাঁদছিলেন, কেউবা আতঙ্কে পাথর হয়ে ছিলেন।
হোটেলে ফিরে শরীর থেকে জেট ফুয়েলের উৎকট গন্ধ দূর করতে কার্লটন বারবার গোসল করতে থাকেন। প্রতিবার গোসল শেষে বের হতেন, আবার গায়ের গন্ধ শুঁকে বাথরুমে ঢুকতেন।
অলৌকিক বিষয় হলো, কার্লটনসহ ওই ফ্লাইটের প্রতিটি মানুষ প্রাণে বেঁচে গেছেন। কার্লটন বলেন, 'আমি ভীষণ ভাগ্যবান যে এ যাত্রায় বেঁচে ফিরেছি।' তবে ১০ মাস আগে বিমানের ভেতর তিনি যা দেখেছেন, তা আজও তাকে তাড়া করে ফেরে।
রাতে ঘুমানোর সময় নিজেকে শান্ত রাখতে এখন কার্লটন 'হোয়াইট নয়েজ' ছেড়ে রাখেন। ট্রমা বা মানসিক আঘাত তার দৈনন্দিন জীবনেও গভীর ছাপ ফেলেছে। তার শ্রবণশক্তি কমে গেছে, বদলে গেছে কথা বলার ধরনও।
দুর্ঘটনার ঠিক পরপরই স্ত্রী ক্যারোলিন বিষয়টি লক্ষ করেছিলেন। ক্যারোলিন বলেন, 'সে হুটহাট উঠে দাঁড়িয়ে বলত, 'আমি কে? আমি কোথায় যাচ্ছি? আমি কী করছি?' সময়টা খুব কঠিন ছিল। সে আমার কথা শোনে, কিন্তু আসলে যেন শোনে না। জবাব দেয়, কিন্তু আসলে দেয় না।'
কার্লটন এখন কাজ করছেন, তবে আগের মতো ব্যবসায়িক ভ্রমণে যান না। কাজ তাকে কিছুটা স্বাভাবিক হতে সাহায্য করছে বটে, কিন্তু তিনি স্বীকার করেন—সবকিছু আর আগের মতো নেই। কার্লটন বলেন, 'মানসিকভাবে গুছিয়ে নিতে আমি সময় নিয়েছি...তবে হ্যাঁ, আমি আর আগের সেই মানুষটি নেই।'
এখন বিমানে চড়া তার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্ঘটনার পর মাত্র কয়েকবার তিনি বিমানে চড়েছেন, তা–ও কখনো একা নয়। একবার তো পুরোটা পথ স্ত্রীর হাত শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছিলেন। শীতকালে আর কখনোই বিমানে চড়বেন না বলে ঠিক করেছেন।
আতঙ্ক আর ভয় থাকলেও কার্লটন এখন নতুন করে বাঁচার রসদ খুঁজে পেয়েছেন। র্যাপ্টর তার খুব পছন্দ। মিনিয়াপোলিসের একটি র্যাপ্টর সেন্টারে এখন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সময় দিচ্ছেন। তিনি মনে করেন, জীবন তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছে। সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চান তিনি।
কার্লটন জানেন, টরন্টোর সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজীবন তাকে তাড়া করে ফিরবে। প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞ ঠিকই, কিন্তু প্রায়ই নিজেকে প্রশ্ন করেন, 'কেন? আমি কেন এখনো বেঁচে আছি? আমার এখন কী করা উচিত?'
