স্বামীকে কেড়েছে বাঘ, এখন সেই বাঘের বন বাঁচাতে লড়ছেন এই নারীরা
এক দশক আগের কথা। ম্যানগ্রোভের গহীনে ছোট্ট ভেলা ভাসিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন মালতী মন্ডলের স্বামী। আর ফেরেননি। বাঘের পেটে গেছে তাঁর জীবন। সুন্দরবনের জনপদে এমন মর্মান্তিক গল্প এখন ঘরে ঘরে।
ভারত ও বাংলাদেশের বুকে ছড়িয়ে থাকা এই বিশাল বন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ। ইউনেস্কো ঘোষিত এই বিশ্ব ঐতিহ্য যেন নদী, কাদা আর দ্বীপের এক গোলকধাঁধা। এখানে বাস করে বিপন্ন ডলফিন, অজগর আর অবশ্যই—রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
সুন্দরবনের বাঘেরা কিন্তু অন্য দশটা বাঘের মতো নয়। এরা জলেও রাজা। মাছ আর কাঁকড়া শিকারের লোভে এরা মাইলের পর মাইল সাঁতরাতে পারে। বন কমছে, মানুষ বাড়ছে—তাই বাড়ছে সংঘাত। পেটের দায়ে জেলেরা যখন বনের গভীরে যায়, তখন বাঘের থাবায় প্রাণ হারায় তারাই বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাঘ-মানুষের দ্বন্দ্বে অন্তত ৩০০ মানুষ ও ৪৬টি বাঘ প্রাণ হারিয়েছে।
সরকারি খাতায় সব মৃত্যুর হিসাব হয়তো থাকে না, কিন্তু গ্রামের ধুলোমাখা পথে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য 'বাঘ-বিধবা'ই এই করুণ পরিণতির জীবন্ত সাক্ষী। মালতীর মতো নারীদের জীবন কাটে এক নিদারুণ অভিশাপে। সমাজ তাদের ডাকে 'স্বামী খেকো' বলে। অপয়া অপবাদে তারা একঘরে। মাছ ধরা বা কৃষিকাজে তাদের প্রবেশ নিষেধ। বেআইনিভাবে বনে ঢুকে স্বামী মারা গেছে বলে জুটছে না সরকারি ক্ষতিপূরণও। সন্তান কোলে নিয়ে অনাহারে দিন কাটানোই যেন তাদের নিয়তি।
তবে অন্ধকারের পরেই আসে আলো। এই অবহেলিত নারীদের জন্যই নেওয়া হয়েছে এক অভিনব সংরক্ষণ উদ্যোগ। যে বন তাদের স্বামীকে কেড়েছে, সেই বনকে বাঁচিয়েই এখন তারা নিজেদের জীবন সাজাচ্ছেন। আয়ের পথ যেমন খুলছে, তেমনি রক্ষা পাচ্ছে বাঘ ও মানুষের যৌথ এই আবাসস্থল।
ভারতের সুন্দরবন অংশের ঝাড়খালি অঞ্চলে আশার আলো দেখাচ্ছেন ২৬ বছরের তরুণ শাহিফ আলি। 'আই-বিহাইন্ড দ্য ইংক' নামের প্রতিষ্ঠানের হয়ে তিনি বাঘ-বিধবা ও স্থানীয় নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন এক সবুজ বাহিনী। লক্ষ্য—১০০ হেক্টর বন ফিরিয়ে আনা। লস্করপুর ও বিবেকানন্দ পল্লীর উপকূলে এখন চলছে ১ লাখ চারা রোপণের মহোৎসব।
গ্রামগুলো যেন প্রকৃতির রুদ্ররোষের মুখে দাঁড়িয়ে। সামান্য একটি বাঁধই জলোচ্ছ্বাস থেকে তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। বাঁধ ভাঙলেই সর্বনাশ।
নারীরা গত ছয় মাস ধরে সন্তানের মতো যত্ন করে ম্যানগ্রোভের চারা বড় করেছেন। এখন সেগুলোই বাঁধের সামনে রোপণ করা হচ্ছে। লোনা পানির আগ্রাসন আর সাইক্লোনের ছোবল থেকে জনপদকে বাঁচাতে এই গাছগুলোই হবে প্রথম ঢাল। বন ফিরলে মাছ বাড়বে, বাঘেরও খাবারের অভাব হবে না। ফলে লোকালয়ে বাঘের হানা কমবে—এমনটাই আশা।
মালতীসহ ৫৯ জন নারী এখন এই যুদ্ধের সৈনিক। এই মাসের শেষে যোগ দেবেন আরও ২০ জন। কাজের বিনিময়ে মিলছে দিনে ৩০০ রুপি (প্রায় ৩.৩০ ডলার)। টাকার অঙ্কটা হয়তো আহামরি নয়, কিন্তু আলির মতে, এটাই তাদের জীবনে আসল পরিবর্তন আনছে।
তিনি বলেন, "এই টাকায় কেউ হয়তো নিজের চিকিৎসা করাচ্ছেন, কেউবা সন্তানের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিচ্ছেন। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের তফাৎটা গড়ে দিচ্ছে এই সামান্য অর্থ।"
কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের সৌরভ মালহোত্রা মনে করেন, এটি শুধু গাছ লাগানো নয়, এটি এক ধরণের পুনরুত্থান। তিনি বলেন, "আমাদের মূল লক্ষ্য ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনা। জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় এর চেয়ে বড় হাতিয়ার আর নেই।"
সবচেয়ে বড় কথা, যে ঘটনার কারণে এই নারীদের জীবন তছনছ হয়ে গেছে, এখন তারা সেই কারণটি সমাধানেই কাজ করছেন। সৌরভ বলেন, "এটি তাদের হারানো সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই। তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াচ্ছে, সমাজকেও রক্ষা করছে।"
তরুণ আলির স্বপ্নও আকাশছোঁয়া। তিনি সুন্দরবনের দুর্গম কোণেও পৌঁছে যেতে চান। তিনি বলেন, "আমি চাই এই নারীরা নিজেদের নিরাপদ ও সম্মানিত ভাবুক। তারা যখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, তখন অন্যরাও এই মহৎ কাজে যোগ দিতে সাহস পাবে।"
