ওয়ার্নার ব্রাদার্সের মেগা-চুক্তি: নেটফ্লিক্স ও প্যারামাউন্টের লড়াইয়ে মধ্যস্থতাকারী ট্রাম্প
নভেম্বরে নেটফ্লিক্সের সহ–প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টেড সারান্ডোস হঠাৎ করেই হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে যান এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন। সেই সময় তার প্রতিষ্ঠান ওয়ার্নার ব্রাদার্স ও এইচবিও কেনার এক সাহসী প্রস্তাবের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
সাক্ষাৎকারটি এতটাই ভালো হয় যে পরে ট্রাম্প সারান্ডোসকে 'চমৎকার' বলে প্রশংসা করেন এবং তাকে কিংবদন্তি হলিউড মোগল লুই বি. মেয়ারের সঙ্গে তুলনা করেন।
রোববার রাতে প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের চেয়ারম্যান ডেভিড এলিসন—যিনি নেটফ্লিক্সের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিড করছেন—স্বশরীরে তার বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পান। ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টার অনার্স অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট বক্সে ট্রাম্পের সঙ্গে তাকে দেখা যায়।
কয়েক ঘণ্টা পর এলিসন নেটফ্লিক্সের অধিগ্রহণ ঠেকাতে একটি 'হোস্টাইল বিড' ঘোষণা করেন। আর সেই নথির সূক্ষ্ম অংশে তিনি তার 'ট্রাম্প কার্ড' প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম এই চুক্তিতে বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত রয়েছে।
বড় ধরনের করপোরেট চুক্তি পর্যালোচনার দায়িত্বে থাকা নিয়ন্ত্রকদের কাজে প্রেসিডেন্টদের প্রভাব বিস্তার করার কথা নয়। কারণ এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত রাজনীতিবিদদের খেয়ালখুশি থেকে দূরে থেকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়।
কিন্তু সংবাদ ও বিনোদন শিল্পের ভবিষ্যৎ যখন ঝুঁকিতে, তখন চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের একনিষ্ঠ অনুরাগী হিসেবে ট্রাম্প নিজেই সেই প্রথা ভেঙেছেন। তিনি সরাসরি যুক্ত হয়েছেন ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি বিক্রির প্রক্রিয়ায়—যা এই দশকের সবচেয়ে বড় মিডিয়া চুক্তি। আর নেটফ্লিক্স এবং প্যারামাউন্ট উভয়েই এই বিষয়টি মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে।
রোববার কেনেডি সেন্টার অনার্সের লাল গালিচায় ছবি তোলার সময় স্যুট পরিহিত ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, "আমি এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকব।"
ট্রাম্প প্রায়ই তার 'অ্যাপরেন্টিস' টিভি অনুষ্ঠানের বোর্ডের কক্ষ থেকে শুরু করে হোয়াইট হাউস পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের একে অপরের বিরুদ্ধে নামিয়ে দিতে পছন্দ করেন। তবে এবার তিনি কোন পক্ষকে সমর্থন করছেন, সেই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কৌশলগতভাবে নীরবতা বজায় রাখছেন। (হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।)
রোববার লাল গালিচায় প্রেসিডেন্ট নেটফ্লিক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সারান্ডোসের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে সতর্ক করে এও বলেন যে নেটফ্লিক্স যদি এই চুক্তি জিতে যায়, তবে তা "সমস্যা তৈরি করতে পারে।"
ট্রাম্প আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে চুক্তিটি নেটফ্লিক্সের জন্য বাজারে অতিরিক্ত অংশীদারিত্ব তৈরি করতে পারে। এই আশঙ্কাটি ঠিক সেই যুক্তির প্রতিফলন, যা প্যারামাউন্ট এখন প্রকাশ্যে তুলে ধরছে।
পরদিন সোমবার সকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি চমক দেন, প্যারামাউন্টের কড়া সমালোচনা করেন। তার ক্ষোভের কারণ ছিল রোববার সিবিএস-এ (যা এই কোম্পানির মালিকানাধীন) প্রচারিত '৬০ মিনিটস' অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি মার্জরি টেলর গ্রিনের সাক্ষাৎকার।
ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া একটি পোস্টে মি. ট্রাম্প প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্স (এলিসন-এর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, যা এই গ্রীষ্মে এক বড় চুক্তির মাধ্যমে রেডস্টোন পরিবারের কাছ থেকে সিবিএস ও প্যারামাউন্টকে নিজেদের করে নিয়েছে) সম্পর্কে লিখেছেন, "তারা পুরোনো মালিকদের থেকে একটুও ভালো নয়।"
সেই চুক্তির জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল এবং রেডস্টোনদের মালিকানাধীন প্যারামাউন্ট একটি মামলা নিষ্পত্তির জন্য ১৬ মিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়েছিল। মামলাটি ট্রাম্প গত বছর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের একটি সাক্ষাৎকারের সম্পাদনার অভিযোগে 'সিক্সটি মিনিটস'-এর বিরুদ্ধে করেছিলেন।
ট্রাম্প তার পোস্টে আরও লেখেন, প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্স এটি কিনার পর থেকে '৬০ মিনিটস আসলে আরও খারাপ হয়ে গেছে!' মন্তব্যের জন্য সিবিএসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
তবে এটি পরিষ্কার নয় যে ট্রাম্প ওয়ার্নার ব্রাদার্স বিক্রির কথা মাথায় রেখে এই পোস্ট করেছিলেন কি না। তবে তার সমালোচনা ডেভিড এলিসনের সঙ্গে তার সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ এলিসনের বাবা প্রযুক্তি সংস্থা ওরাকল-এর সিইও ল্যারি এলিসন প্রেসিডেন্টের বন্ধু।
গত কয়েক মাসে এলিসনদের ট্রাম্পের সঙ্গে জনসমক্ষে দেখা গেছে। ডেভিড এলিসন প্রেসিডেন্টের প্রিয় বিনোদনগুলির মধ্যে অন্যতম ইউএফসি ম্যাচের সময় তার পাশে বসেছিলেন এবং পরে তিনি রেসলিং লিগের সম্প্রচার স্বত্বের জন্য ৭.৭ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছিলেন। এছাড়াও, ট্রাম্প ল্যারি এলিসনকে জানান যে তিনি 'রাশ আওয়ার' ফ্র্যাঞ্চাইজির ভক্ত, এরপরই প্যারামাউন্ট নতুন 'রাশ আওয়ার' সিনেমার পরিবেশনার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের প্রেসিডেন্ট জেফ শেল এবং কোম্পানির টেলিভিশন প্রধান জর্জ চীকস-ও কেনেডি সেন্টার অনার্সের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সিবিএস-এর সঙ্গে এই অনুষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, এবং চ্যানেলটি ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠানটির সম্পাদনা করা অংশ প্রচার করবে। সিবিএস নিউজের প্রধান সম্পাদক বারি ওয়েইস অবশ্য সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না।
যদিও নেটফ্লিক্সের ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি অধিগ্রহণের প্রস্তাবে সিএনএন অন্তর্ভুক্ত নেই, প্যারামাউন্ট ২৪ ঘণ্টার এই সংবাদ চ্যানেলটি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সোমবার সিএনবিসিতে ডেভিড এলিসনকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ট্রাম্প কি তার সিএনএন মালিকানার ধারণা পছন্দ করবেন কি না। এলিসন নিজের ভদ্র স্বর বজায় রেখে জানান, 'আমরা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এ নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছি, তবে আমি কোনোভাবেই তার পক্ষে কথা বলতে চাই না।'
