ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের সমালোচনা করায় জার্মান চ্যান্সেলরের ওপর চটলেন ট্রাম্প
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের সমালোচনা করায় জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের ওপর চড়াও হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে আটকাতে এই সংঘাত প্রয়োজনীয় ছিল।
মঙ্গলবার ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকে ইউরোপীয় এবং ন্যাটো মিত্রদের প্রতি তার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কারণ তারা এই যুদ্ধে পুরোপুরি সমর্থন দিতে বা অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করে আসছে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে লিখেছেন, 'জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস মনে করেন ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকাটা ঠিক আছে। তিনি জানেন না তিনি কী বলছেন! ইরানের কাছে যদি পারমাণবিক অস্ত্র থাকত, তবে পুরো বিশ্ব তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ত।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি বর্তমানে ইরানের সাথে এমন কিছু করছি যা অন্যান্য দেশ বা প্রেসিডেন্টদের অনেক আগেই করা উচিত ছিল। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে জার্মানি বর্তমানে অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য সব দিক দিয়ে এত খারাপ করছে!'
যদিও জার্মানি এতদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অন্যতম অনুগত মিত্র হিসেবে বিবেচিত ছিল, তবে মের্ৎস ইরান যুদ্ধ সম্পর্কে এক কঠোর মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। তিনি এই সামরিক অভিযানকে 'অবিবেচনাপ্রসূত' বলে অভিহিত করেছেন।
মের্ৎস বলেন, 'এই ধরনের সংঘাতের সমস্যা হলো আপনি কেবল এতে প্রবেশ করলেই হয় না—আপনাকে আবার এখান থেকে বের হয়েও আসতে হয়। আমরা ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে এবং পরে ইরাকে অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে তা দেখেছি।'
জার্মান এই নেতা আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরানের আলোচনার কৌশলের কাছে ওয়াশিংটন 'অপমানিত' হচ্ছে। কারণ ইরান তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার আগে মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করতে প্রতিনিধি পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মের্ৎসের এই সমালোচনা তার পূর্বের কট্টর ইসরায়েলপন্থি নীতি থেকে এক বড় ধরনের বিচ্যুতি। গত বছর যখন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বিনা প্ররোচনায় ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করেছিল, তখন এই জার্মান চ্যান্সেলরই বলেছিলেন যে ইসরায়েল 'আমাদের সবার হয়ে নোংরা কাজগুলো করে দিচ্ছে'। উল্লেখ্য, জার্মানি ইসরায়েলের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ।
যাইহোক, ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এমন এক সময়ে এটি ঘটেছে যখন জার্মানি ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো এখনো কোভিড-১৯ মহামারী এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার লড়াই চালাচ্ছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছেন যে, তারা সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ নিতে বা বলপ্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সহায়তা করতে অস্বীকার করছে।
গত মাসে মের্ৎস যখন হোয়াইট হাউস সফর করেছিলেন, তখন ট্রাম্প স্পেনের যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কারণে দেশটির সাথে বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন ওই ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশটির সমালোচনা করছিলেন, তখন মের্ৎস নীরব ছিলেন। সেই বৈঠকে ট্রাম্প জার্মানির প্রশংসাও করেছিলেন।
ট্রাম্প বলেছিলেন, 'তারা একটি সম্মানিত দেশ। ওই দেশের সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে—বিশেষ করে এখন, এই নেতার (মের্ৎস) সাথে।'
মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, ইরানের সাথে যুদ্ধের লক্ষ্য হলো দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানো। কিন্তু ট্রাম্পের নিজস্ব গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড গত বছর কংগ্রেসকে বলেছিলেন যে তেহরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করার কয়েক মাস আগেও ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, ২০২৫ সালের জুনে ইরানি স্থাপনাগুলোতে মার্কিন হামলায় তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি 'বিধ্বস্ত' হয়ে গেছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই যুদ্ধের একটি আইনি ন্যায্যতা প্রকাশ করে বলেছে যে, ওয়াশিংটন 'তার মিত্র ইসরায়েলের অনুরোধে এবং সম্মিলিত আত্মরক্ষার খাতিরে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সহজাত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের জন্য এই যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে'।
তবে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েল তাকে এই যুদ্ধ শুরু করার জন্য ফুসলিয়ে রাজি করায়নি।
