২০২৪ সালের রেকর্ডকেও ছাড়াল তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাতের রপ্তানি
তুরস্ক ২০২৫ সালের নভেম্বরেই প্রতিরক্ষা ও বিমান শিল্পের রপ্তানিতে ২০২৪ সালের মোট রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে—যা প্রমাণ করে বিশ্বব্যাপী তুর্কি সামরিক প্রযুক্তির চাহিদা ক্রমে বেড়েই চলেছে। একই সঙ্গে বিদেশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা আরও কমাতে স্থানীয় উৎপাদন জোরদার করেছে আঙ্কারা।
গত বৃহস্পতিবার দেশটির প্রেসিডেন্সি অব ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ (এসএসবি) জানায়, গেল নভেম্বর মাসে প্রতিরক্ষা রপ্তানি ২২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৭৪৭ মিলিয়ন ডলারে। এনিয়ে চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭.৪৫ বিলিয়ন ডলারে।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৩০ শতাংশ বেড়েছে, এবং ইতোমধ্যেই ২০২৪ সালের সর্বোচ্চ ৭.২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
এসএসবি প্রধান হালুক গোরগুন বলেন, "নভেম্বরে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পুরো বছরে যে অগ্রগতি দেখা গেছে, তা এ খাতে নতুন রেকর্ড গড়েছে। মাত্র ১১ মাসেই আমাদের রপ্তানি যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তা ঐতিহাসিক।"
তিনি আরও বলেন, এই ধারাবাহিক অগ্রগতি মূলত উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী সামরিক পণ্যের উৎপাদন, রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাতের প্রতিযোগী সক্ষমতা বৃদ্ধির ফল।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, চলতি বছর শেষ হতে হতে রপ্তানি ৮ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে। তুর্কি কর্মকর্তাদের মতে, যা "সহজেই অর্জন সম্ভব"। রপ্তানির এই লক্ষ্য পূরণ হলে ২০২০ সালের ২.২৮ বিলিয়ন ডলার থেকে পাঁচ বছরে তুর্কি প্রতিরক্ষা খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হবে ২৫০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ ২০২০ থেকে ২০২৫—এই সময়ে বার্ষিক গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক বিনিয়োগ তুরস্ককে বৈদেশিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিনির্ভর দেশ থেকে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে। এখন দেশটির সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বেশিরভাগ সরঞ্জামের চাহিদা স্থানীয়ভাবে তৈরি প্ল্যাটফর্ম দিয়ে পূরণ হচ্ছে।
এর আগে দীর্ঘ দুই দশক ধরে আঙ্কারা ন্যাটো মিত্রদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে আসছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ২০০০ সালের পর থেকে দেশটি নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার কৌশলে জোর দেয়।
এই রূপান্তরই দেশটিকে ড্রোন-নির্ভর যুদ্ধক্ষমতা, আকাশ–স্থল–সমুদ্রভিত্তিক প্ল্যাটফর্মসহ বিস্তৃত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক অগ্রগতি এনে দিয়েছে। বিশেষ করে সশস্ত্র ড্রোন রপ্তানি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ককে কয়েক বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি চুক্তি এনে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক রপ্তানি তথ্য প্রকাশের সময়ই স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) জানায়, বিশ্বের শীর্ষ ১০০ অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় তুরস্কের আরেকটি কোম্পানি যুক্ত হয়েছে। মেকানিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখন সিপ্রির এ তালিকায় তুর্কি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পাঁচটিতে উন্নীত হলো, আর আগেই যুক্ত হয়েছিল আসেলসান, টিএআই, বাইকার, রকেটসান এর নাম। ২০২৪ সালে এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আয় ১১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১০.১ বিলিয়ন ডলারে।
বর্তমানে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে ৩,৫০০–এর বেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে এবং এই খাতে কর্মীসংখ্যা প্রায় এক লাখ।
গোরগুন বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো আরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত করা; তুরস্কের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা সরবরাহ শৃঙ্খলে অন্তর্ভুক্ত করা এবং একটি টেকসই ও উচ্চমূল্য সংযোজনধর্মী রপ্তানি মডেল গড়ে তোলা।
তার মতে, ২০২৪ সালে প্রতিরক্ষা রপ্তানির ইউনিট ভ্যালু ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ৬৭ ডলার, আর কিছু উচ্চ-প্রযুক্তি পণ্যে এটি ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। বিপরীতে তুরস্কের বেসামরিক খাতের রপ্তানির ইউনিট ভ্যালু গড়ে ১.৫০ ডলার প্রতি কেজি।
গোরগুন বলেন, "একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর ইকোসিস্টেমের ওপর ভর করে প্রতিরক্ষা শিল্পে উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং রপ্তানিতে তুরস্ক ধারাবাহিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে।"
