হঠাৎ কেন ভেনেজুয়েলার মাদুরোর ওপর ক্ষেপেছেন ট্রাম্প?
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর চাপ ক্রমেই বাড়িয়ে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মাদুরোকে ধরিয়ে দিতে পারলে যে পুরস্কারের ঘোষণা ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন তা দ্বিগুণ করেছে। এমনকি মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো এখন ভেনেজুয়েলার খুব কাছে, বলা যায় হামলার আওতার মধ্যেই অবস্থান করছে। মাদক পাচারের অভিযোগে ওই অঞ্চলের নৌকাগুলোর ওপর হামলায় ইতিমধ্যে বহু মানুষ নিহত হয়েছে।
শোনা যাচ্ছে, গত ২১ নভেম্বর ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোনে মাদুরোকে সোজা জানিয়ে দিয়েছেন—ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে চলে যেতে। যাকে বলে একেবারে 'আল্টিমেটাম'।
কে এই নিকোলাস মাদুরো?
বামপন্থী নেতা হুগো শ্যাভেজের হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন নিকোলাস মাদুরো। একসময় তিনি বাস চালাতেন, ছিলেন শ্রমিক নেতা। শ্যাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হন। শ্যাভেজ ও মাদুরো মিলে গত ২৬ বছর ধরে দেশটি শাসন করছেন। দেশটির পার্লামেন্ট, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশন—সবই তাদের দলের দখলে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধীরা দাবি করেছিল তাদের প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ বিপুল ভোটে জিতেছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন মাদুরোকেই বিজয়ী ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ এই নির্বাচন মেনে নেয়নি। তারা গঞ্জালেজকেই 'নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু সেনাবাহিনী ও পুলিশ মাদুরোর হাতে থাকায় তিনি ক্ষমতা ছাড়েননি। ওদিকে গ্রেপ্তারের ভয়ে গঞ্জালেজ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
ট্রাম্প কেন হঠাৎ ভেনেজুয়েলার দিকে নজর দিলেন?
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প অভিবাসন বন্ধ করাকে তার প্রধান কাজ হিসেবে নিয়েছেন। তিনি মনে করেন, ভেনেজুয়েলা থেকে দলে দলে মানুষ আমেরিকায় ঢুকছে, আর এর জন্য দায়ী মাদুরো।
২০১৩ সালের পর থেকে ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক দমনের কারণে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দেশটি ছেড়ে পালিয়েছে। এদের বড় অংশ লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে গেলেও লাখ লাখ মানুষ আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে। কোনো প্রমাণ না দিলেও ট্রাম্পের অভিযোগ, মাদুরো তার দেশের জেলখানা আর পাগলা গারদ খালি করে অপরাধীদের আমেরিকায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
আরেকটা কারণ হলো মাদক। ট্রাম্প ফেন্টানিল ও কোকেনের প্রবেশ ঠেকাতে চান। তিনি ভেনেজুয়েলার দুটি অপরাধী দলকে 'সন্ত্রাসী' ঘোষণা করেছেন। তার দাবি, এর একটির নেতা খোদ মাদুরো। মাদুরো অবশ্য এসব অস্বীকার করে বলেন, "আমেরিকা মাদক যুদ্ধের বাহানায় আসলে আমাকে সরিয়ে ভেনেজুয়েলার তেলের খনি দখল করতে চায়।"
ক্যারিবিয়ান সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ
১৯৮৯ সালে পানামায় হামলার পর এই প্রথম ওই অঞ্চলে এত বড় সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৫,০০০ মার্কিন সেনা, বিমানবাহী রণতরী, মিসাইল ছুড়তে সক্ষম জাহাজ এবং উভচর জাহাজ সেখানে পাঠানো হয়েছে।
তাদের লক্ষ্য নাকি মাদক পাচার ঠেকানো। সেপ্টেম্বর থেকে তারা আন্তর্জাতিক জলসীমায় সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌকায় ২০টির বেশি হামলা চালিয়েছে। এতে ৮০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছে। আমেরিকা এদের 'মাদক সন্ত্রাসী' বললেও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে এই হামলাগুলো অবৈধ। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এক সাবেক আইনজীবী বিবিসিকে বলেছেন, শান্তিকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের ওপর এমন হামলা পরিকল্পিত অপরাধের শামিল। তবে হোয়াইট হাউস বলছে, আমেরিকার মানুষকে বাঁচাতে ট্রাম্প যুদ্ধের নিয়ম মেনেই কাজ করছেন।
মাদক বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, বিশ্বজুড়ে মাদক পাচারে ভেনেজুয়েলার ভূমিকা খুবই কম। এটি মূলত একটি রুট বা পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোকেনের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী হলো প্রতিবেশী কলম্বিয়া। কিন্তু সেই মাদক ভেনেজুয়েলা দিয়ে নয়, অন্য পথে আমেরিকায় যায়।
২০২০ সালের মার্কিন এক রিপোর্ট বলছে, আমেরিকায় ঢোকা কোকেনের বেশিরভাগই আসে প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে। ক্যারিবিয়ান সাগর দিয়ে আসে খুব সামান্য। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন হামলা চালাচ্ছে ক্যারিবিয়ান সাগরেই। ট্রাম্প দাবি করছেন নৌকাগুলো ফেন্টানিলে বোঝাই। কিন্তু ফেন্টানিল মূলত তৈরি হয় মেক্সিকোতে এবং তা স্থলপথে সীমান্ত দিয়ে আমেরিকায় ঢোকে।
ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন যে ২১ নভেম্বর তিনি মাদুরোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প মাদুরোকে পরিবারসহ দেশ ছাড়ার জন্য এক সপ্তাহ সময় দিয়েছিলেন। মাদুরো সেই নিরাপদ প্রস্থান বা সেইফ প্যাসেজের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
সময়সীমা শেষ হওয়ার এক দিন পর ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি ভেনেজুয়েলার মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে 'স্থলপথে' ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, তবে সেটা কীভাবে হবে তা বলেননি।
ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, "প্রেসিডেন্টের হাতে সব অপশনই খোলা আছে।" তিনি বিস্তারিত না বললেও সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্যারিবিয়ান সাগরে আমেরিকার যে বিশাল প্রস্তুতি, তা শুধু মাদক ধরার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি।
